রোহিঙ্গা টালবাহানা নয়, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই কাম্য

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশে পাড়ি দেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে এ সংখ্যাটি বেড়ে এখন হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ। এদের আশ্রয় হয় কক্সবাজারের কুতুপালং-এ। মানবিক কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আশ্রয় দেন। ১২৩টি প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত রয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যাদের ২১টি আন্তর্জাতিক, স্থানীয় ৫টি, জাতীয় ৯৭টি। বাংলাদেশ গত দুই বছরে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকটিতে ভালো ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমার থেকে আসা মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তার দায় সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রশ্নে যে ভূমিকা পালন করেছে তা বিশ^জুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। আয়তনে ছোট বাংলাদেশে বিপুল জনসংখ্যার চাপের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ বহন করা প্রায় অসম্ভব। এ সংকট যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় তাহলে চট্টগ্রামসহ কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। এ সংকট সমাধানে সরকারকে যেমন আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি এনজিওগুলোকে মানবিক সংকটের দিকে আরো মনোযোগ দিতে হবে। গভীর উদ্বেগের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রকৃতঅর্থে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। বাংলাদেশ সরকার এ সমস্যা সমাধানে বিশ^ জনমত তৈরির চেষ্টা করেছে। কিন্তু কেউই বিষয়টির সমাধানে ততটা আন্তরিকতার পরিচয় দেয়নি।
অনেক আলোচনা বৈঠক শেষে অবশেষে ২২শে আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দিন নির্ধারিত হয়। কিন্তু এতে টনক নড়ে স্বার্থানেষী মহলের। রোহিঙ্গাদের সাহায্যের নাম করে বিভিন্ন জায়গা থেকে যে অর্থ বা সাহায্য আনা হয় তার সিংহভাগই ব্যয় হয় সহযোগিতা করার নামে যেসব এনজিও কর্মরত আছে তাদের কর্মকর্তাদের পেছনে। প্রত্যাবাসন হলে তাদের মধু খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে- তাই প্রকারান্তরে তারা প্রত্যাবাসন বন্ধ করে দিয়েছেন। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এনজিও কর্মীরা রোহিঙ্গাদের উসকানি দিয়েছে এবং দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা এ সুযোগে দাবী তুলেছে তাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা না দিলে তারা এদেশ ছেড়ে যাবে না।
বিভিন্ন এনজিও কর্মী যারা রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার নামে অর্থ এনে এ অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় করছে কর্মকর্তাদের গাড়ি, উচ্চ বেতনে চাকরি, ফাইভ স্টার হোটেলে থাকা সহ বিলাসীজীবন যাপনের জন্য। পর্যটন মৌসুম না হওয়া সত্ত্বেও কক্সবাজার, টেননাফ ও উখিয়ায় কোনো হোটেলে জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। দামী হোটেলগুলো এখন এনজিও কর্মকর্তাদের দখলে। মাসের পর মাস তারা পুরো হোটেল ব্যবহার করেন। রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে অর্থের পরিমাণ কমে আসলেও এনজিও কর্মীদের বিলাসিতা একটুও কমেনি। এনজিওগুলোর বিষয়ে নানা অভিযোগ পাওয়ায় গত বছরের মার্চ মাসে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ৪১টি এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। এসব এনজিওগুলো কোনো অনুদান না পেলেও তারা নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক মন্ত্রিসভার বৈঠকে এনজিওদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে সে কমিটি বলেছে, রোহিঙ্গা শরণার্থিদের জন্য বিদেশি এনজিওগুলোর বরাদ্দের ৪ ভাগের ৩ ভাগই তাদের কর্মীদের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে। ছয় মাসেই এনজিও কর্মকর্তাদের হোটেল বিল ১৫০ কোটি টাকা এবং ফ্ল্যাট ভাড়ায় ৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সম্পর্কে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি জানিয়েছে কিছু এনজিওর তৎপরতা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও কিছু নিষিদ্ধ এনজিও গোপনে এখানে কাজ করছে এবং তারা উগ্রতা ছড়ানোর অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে শুধু এনজিও নয়- রোহিঙ্গা নেতাসহ স্থানীয় প্রতাবশালী ব্যক্তিরাও গড়ে তুলেছে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট। রোহিঙ্গাদের একটা অংশ ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানা কাজের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের একটা অংশের যেমন বেড়েছে আর্থিক সামর্থ্য, তেমনি গড়ে উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে সখ্যতা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে শুধু এনজিও নয়, তাদের ভিত্তি করে যারা বৈধ-অবৈধ নানাভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে তুলছে তারাও চায় না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হোক। প্রত্যাবাসন হলে তাদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তারাও রোহিঙ্গাদের প্ররোচিত করছে এদেশ ছেড়ে না যাবার জন্য। পত্রিকান্তরে এটাও প্রকাশিত হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শুধু স্থানীয় নয়- আন্তর্জাতিক মহলও যুক্ত রয়েছে যারা তাদের (রোহিঙ্গাদের) উসকানি দিচ্ছে।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে সেজন্য বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। ২০১৮ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের। কিন্তু তখন রাখাইনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শরণার্থীরা দেশে ফিরতে আপত্তি জানায়। রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে প্রথমবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ স্থগিত করা হয়। এর পরে দীর্ঘ আলোচনা, নানা বৈঠক করে আবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সম্প্রতি মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে এবং রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে কিন্তু তাদের নাগরিকত্ব দেবার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট মতামত দেয়নি। ফলে মিয়ানমার সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের যে অনাস্থা ও অবিশ^াস সেটা দূর হয়নি। কিন্তু ওই প্রতিনিধিদল নানা যাচাই-বাছাইরে মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয় যেটিকে বাংলাদেশ একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারই ধারাবাহিকতা ২২শে আগস্ট সকাল থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবার কথা ছিল কিন্তু এ প্রত্যাবাসন নিয়ে ছিল নানা শঙ্কা, সন্দেহ, উৎকন্ঠা ও অনিশ্চয়তা, গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ২০শে আগস্ট হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাবার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধের অনুরোধ করা হয়। সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের উপর চালানো নির্মম ও বর্বর নির্যাতন ও সহিংসতার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান এখনও কারতে পারেনি। এছাড়া রাখাইন রোহিঙ্গাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। শুধু তাই নয়, মিয়ানমার সরকারের আশ^াসে রোহিঙ্গাদের খুব একটা আস্থা নেই। একারণে প্রত্যাবাসন বিষয়ে তাদের তীব্র অনীহা রয়েছে।
প্রত্যাবাসনের জন্য সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়েছে যেখানে তারা নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছে। শর্তগুলোর ভেতরে অন্যতম শর্ত হচ্ছে মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া কিন্তু এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সুস্পষ্ট কোনো অঙ্গীকার করেনি। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের সদিচ্ছার বিন্দুমাত্র অবকাশ না থাকলেও মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ প্রক্রিয়া শুরু করতে চাচ্ছে। মিয়ানমার তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে তারা বিশ^দরবারে খানিকটা মুখ দেখাতে পারবে। বাংলাদেশ চাচ্ছে এ প্রক্রিয়া শুরু হলে তাকে বেগবান করা যাবে। প্রত্যাবাসন যখনই শুরু হোক না কেন রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, আইনগত স্বীকৃতি ও মানবিক মর্যাদার বিষয়টি যেন গুরুত্ব পায়। তাদের প্রত্যাবাসন হোক স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ।