শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭, ১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

সুফি সান্টু


নাটোরের জননন্দিত নেতা,সাবেক সংসদ সদস্য, পৌর, চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্নর বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর আজ ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জননন্দিত এই নেতার মৃত্যু হয়। জীবদ্দশায় তাঁর রাজনৈতিক মেধা ও প্রজ্ঞায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন নাটোরের গণমানুষের কাছে কিংবদন্তী নেতা হিসেবে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও পারিবারিক, সামাজিক এবং দলীয় ভাবে নানা আয়োজনে মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি।
শংকর চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
ছাত্রজীবন থেকে বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় এক বছর কারাবাসে থাকতে হয় তাকে। ১৯৫৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে এমপিএ নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি দুইবার নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সনে নাটোর জেলার গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি আমৃত্যু নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা, ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের জাতির পিতার সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পরের আন্দোলন এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি জনগণকে সাথে নিয়ে সামনের সারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কোনো প্রলোভন বা হুমকি তাঁকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। এর মধ্যে বনলতা বালিকা বিদ্যালয়, বড়গাছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নাটোর সুগার মিল, শিশু সদন, ছিন্নমূল নারীদের জন্য সংস্থাÑ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাসহ নাটোরের সকল খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর দীপ্ত পদক্ষেপের কথা নাটোরবাসী এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
নাটোর পৌরসভার প্রথম নারী মেয়র বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর মেয়ে ঊমা চৌধুরী বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে তারা তেমন করে কাছে পাননি। কারণ সে সময় তিনি রাজনীতি, সাধারণ মানুষ ও তাদের সমস্যাÑএসব নিয়েই দিন পার করতেন। জমিদার বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান হিসাবে তিনি যে বিলাসিতায় জীবনযাপন করতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি কখনোই করেননি এবং আমাদেরকেও করতে দেননি। একবার আমি বাবাকে বলেছিলামÑ বাবুজি, আমাদের তো একটা সুন্দর বাড়ি করতে পারো। বাবুজি আমাকে তখন বলেছিলেনÑ ‘‘মা, আমি যাদের জন্য রাজনীতি করি তারা অনেকেই দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না; তাদের জন্য রাজনীতি করে আমি বিলাসিতার জীবনযাপন করতে পারি না। আমার মৃত্যুর পর তোমরা করো।’’ এই কারণে তিনি তাঁর অনেক জায়গা জমি সাধারণ দুঃখী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্দুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা ছিল অপরিসীম।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসাবে ৭নং সেক্টরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালের পরপরই দেশপ্রেমিক নাটোরবাসী বঙ্গবন্ধুকে ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ এমপিএ ও ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০-এ এমএলএ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় দেশের অন্যান্য স্থানের জনগণের মত নাটোরের জনসাধারণের মধ্যেও তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে মিছিল, আন্দোলন ও প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ এর প্রথম দিকেই শুরু হয়েছিল। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণ নাটোরের জনগণের মাঝেও গণজাগরণের সৃষ্টি করেছিল এবং তা ক্রমে ক্রমে তীব্র হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী ৯ মার্চ থেকে নাটোরে তাঁর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন শুরু হয়।
শিক্ষা জীবন
শংকর গোবিন্দ ১৯৪৫ সালে আদমজি হাই-স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশান পাশ করার পর কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াশুনা করেন। সেখান ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর দেশ বিভক্তি হওয়ার কারণে বিএসসি অধ্যয়নরত অবস্থায় নানা প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত ঘটে।
জন্ম ও মৃত্যু
শংকর গোবিন্দ চৌধুরী ১৯২৬ সনের ৪ মার্চ নাটোরের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন নাটোরে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
শংকর গোবিন্দ চৌধুরী স্মরণে নানা প্রতিষ্ঠান
সম্প্রতি নাটোর শহরের বড়হরিশপুর বাইপাশ চত্বরে দৃষ্টিনন্দন হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে শংকর গোকিন্দ চৌধুরী চত্বর। এর আগে নাটোর শংকর গোবিন্দ চৌধুরী স্টেডিয়াম তার নামে নামকরণ করা হয়। এছারাও শহরের নিচা বাজার রাস্তার এবং চন্দ্রকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রয়াত এই নেতার নামে নামকরণ করা হয়েছে।
বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর রাজনৈতিক সহকর্মিরা জানান, আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর নিখাদ ও অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ ছিল সকলের অনুশীলনযোগ্য। তাঁর ভালোবাসা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর যে মমত্ববোধ তা আমরা বুঝতে পারি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা হত্যা পরবর্তী বছরগুলোতে। প্রতি বছরই ১৫ আগস্ট জাতির জনকের স্মরণে শংকর চৌধুরীর বাড়িতে রান্না খাবারের জন্য চুলা জ্বলতো না। এযেন হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধানে আপন কোনো ব্যক্তির মৃত্যুজনিত অশৌচ পালন; শোক পালনের মতো তাঁর জীবদ্দশায় সব সময় তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেখে যাবার আকাক্সক্ষা পোষণ করে গেছেন। এমনকী তাঁর ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না দেখে তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না।
চিত্তরঞ্জন সাহা জানান, সিএমএইচ-এ চিকিৎসারত থাকাবস্থায় তাই হয়তো আমার এবং প্রয়াত নেতা হানিফ আলীর শেখের কাছে একটি চিরকুটে লিখেছিলেনÑ ‘আমি এত সহজে মরব না, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেখেই আমি মরব। শ্রদ্ধেয় শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর অদম্য সাহস, বিচক্ষণ রাজনৈতিক আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা জনমানুষের কাছে এমন বিশ্বাস স্থাপন করেছিল যে, মানুষ কোনোরকম বিপদ, অসুস্থতা, মামলা বা সামাজিক সমস্যা বা অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লে মনে করত যে, বাবু শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর কাছে গেলেই এ সমস্যার নিষ্পত্তি ঘটবে। শুধু তাই নয় রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল তাঁর ভিতরে অপরিসীম। তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল সহকর্মির মত। বিপদে আপদে তারা পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়েছেন যা এখনকার রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেখা যায় না। একারণেই তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন গণমানুষের নেতা।
নেতার প্রয়াণ দিবসে নেতাকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সাংবাদিক