শবে কদরের মাহাত্ম্য

আপডেট: জুন ১২, ২০১৮, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানুল মুবারকের পরিচয় দিয়েছেন- রমজান এমন মাস যে মাসে একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চাইতেও উত্তম। সেই রাতটিকে কুরআনের ভাষায় বলা হয়, লাইলাতুল কদর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর তালাশ কর। ইতোমধ্যে ২১, ২৩ ও ২৫ বেজোড় রাত্রি চলে গেছে। আজ ২৭শে রাত। ২৭শে রাত শবে কদর হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তবে বিভিন্ন সাহাবির বক্তব্য অনুযায়ী ও বহু মনীষীর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তারা ২৭শে রাতকেই শবে কদর নির্দিষ্ট করেছেন। এ হিসেবে সর্বসাধারণে প্রচলিত ২৭শে রাত শবে কদর। শবে কদর উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার বৈশিষ্ট্য। অন্য কোন উম্মতকে এই রাত প্রদান করা হয়নি। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকেই শবে কদর দান করেছেন। তাদের পূর্ববর্তী কোনো উম্মত এই রাত প্রাপ্ত হয়নি।
উম্মতে মুহাম্মাদীকে শবে কদর দানের প্রেক্ষাপট হিসেবে অনেক তথ্যই পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- হযরত আলী রা. এবং হযরত উরওয়া রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাইলের চারজন মহান ব্যক্তি যথা, হযরত আইউব আ., হযরত জাকারিয়্যা আ., হযরত হিজকিল আ. এবং হযরত ইউশা ইবনে নুন আ. প্রমুখের আলোচনা করতে গিয়ে বললেন যে, এই মহান ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকেই আশি বছর করে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করেছেন, চোখের পলক ফেল সময় পরিমাণও তারা নাফরমানি করেননি। এ কথা শ্রবণ করে সাহাবায়ে কেরাম আশ্চার্যান্বিত হলেন। তৎক্ষণাৎ হযরত জিবরাইল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট তাশরিফ এনে বললেন, আপনার উম্মত এই সকল মহান ব্যক্তিবর্গের আশি বছর ইবাদত করার কারণে আশ্চর্যবোধ করছে। আল্লাহ তায়ালা এর চেয়ে উত্তম জিনিস পাঠিয়েছেন। এই বলে তিনি সূরা কদর পাঠ করে শুনালেন এবং বললেন, এটাতো তদপেক্ষা শ্রেয় যার উপর আপনি ও আপনার উম্মত আশ্চর্যবোধ করছিলেন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবায়ে কেরাম আনন্দিত হলেন।
শবে কদরের তিনটি ফজিলত রয়েছে। ১. শবে কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ হাজার মাসে ইবাদত করলে যত সওয়াব ও যত মর্যাদা পাওয়া যায় এই এক রাতে ইবাদত করলে তার চেয়ে বেশি সওয়াব ও মর্যাদা পাওয়া যায়।
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমানের সাথে সওয়াব অর্জন করার নিয়তে ইবাদত করবে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন শবে কদর হয়, তখন জিবরাইল আ. তাঁর বাহিনীসহ অর্থাৎ তার অধীনস্থ ফেরেশতাসহ দলবলে সারা দুনিয়ায় ঘুরতে থাকেন। আর যারা এই রাতে ইবাদত করে ও জিকিরে লিপ্ত থাকে তাদের জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন।
শবে কদরের আলামত বলতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সেই রাতটি উজ্জ্বল ও পরিষ্কার হবে, চাঁদটা উজ্জ্বল ও মধ্যম ধরনের হবে। না শীত না গরম। এই রাতে সকাল পর্যন্ত আকাশের তারকা শয়তানের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয় না। আর একটি নিদর্শন হল, প্রভাতে সূর্য কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়, একেবারে সমতল মসৃণ মনে হয় কেমন যেন পূর্ণিমার চাঁদ। এই দিন শয়তানদের জন্য সূর্যের সাথে বের হওয়া সম্ভব হয় না।
এ রাতে নফল ইবাদতের পাশাপাশি গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে হয়। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, শবে কদরে কী দোয়া পড়ব? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্না পড়বে। অর্থাৎ হে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ কর, সুতরাং তুমি আমাদের ক্ষমা কর।
যেহেতু আল্লাহ নিজেই ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং এই দোয়া আমলের মাধ্যমে আমাদের অবশ্যই গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে হবে। আল্লাহ আমাদের শবে কদর দান করুন এবং আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতিব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী