শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের অংশগ্রহণ বাড়ছে

আপডেট: ডিসেম্বর ১১, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ব্যাংকিং খাতে দেশের প্রচলিত ধারার (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলোর অংশ কমলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ। শুধু গ্রাহক নয়, আমানত বৃদ্ধি, শাখা বৃদ্ধি ও ঋণ বিতরণেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রান্তিকের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৪ ডিসেম্বর এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আগের প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) সঙ্গে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তুলনামূলক একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতের অংশ প্রায় এক শতাংশ কমলেও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানতের অংশ বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, গত এক বছরে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪.৫২ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে পুরো ব্যাংকখাতের মোট আমানতের মধ্যে ২২.৭২ শতাংশ ছিল শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর। তিন মাস পর অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে এটি হয়েছে ২২.৭৯ শতাংশ। ২০১৬ সালের জুন শেষে আমানতের ২২.১০ শতাংশ ছিল শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর। এছাড়া রেমিট্যান্স আহরণে এখন ৩৬.১৪ শতাংশই ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর অবদান। তিন মাস আগে জুন শেষে শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স আহরণে অংশ ছিল ৩০.৮৮ শতাংশ।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রাহককে সেবা দেওয়াকে ঈমানি দায়িত্ব মনে করে থাকে। এ কারণে ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। আর গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যাংকিং খাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হচ্ছে।’
গ্রাহকের চাহিদা বাড়ার কারণে ব্যাংক খাতে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অবদানও বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা প্রচলিত ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে লেনদেন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আবার ইসলামি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দেয়।’
বর্তমানে দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে আটটি পূর্ণাঙ্গ ধারার শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংক। এছাড়া দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংক চালু করেছে ইসলামি ব্যাংকিং শাখা, আটটি ব্যাংক চালু করেছে ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো। দেশের ব্যাংকিং খাতের এক-পঞ্চমাংশই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ইসলামি ধারার এ ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার কার্যক্রম চালানো ব্যাংকগুলো হলো- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ঋণ বিতরণেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশ বেড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের ২৪.২২ শতাংশ বিতরণ করেছে ইসলামি ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের জুনে ছিল ২৩.৯৮ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বিতরণ করে ইসলামি ব্যাংকগুলো।
এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণের অংশ এক শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মোট শাখার ১১.৫২ শতাংশ এখন ইসলামি ব্যাংকিং করছে। তিন মাস আগে জুনে ইসলামি ব্যাংকের অংশ ছিল ১১.৪৪ শতাংশ। গত বছরের জুনে এই হার ছিল ১১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ রেমিট্যান্স, ঋণ ও আমানতের মতো শাখার ক্ষেত্রেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্বও বেড়েছে।
গত একবছরে ব্যাংক খাতে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্বও বাড়লেও এটা কোনও দোষের কিছু নয় বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত একবছর ধরে প্রচলিত ব্যাংকের সুদ হার কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই ইসলামি ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোর কিছু স্কিম হয়ত সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, কৃষি ঋণ বিতরণেও অংশ বাড়ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর। জুন শেষে ব্যাংক খাতের ৩.৯৭ শতাংশ কৃষি ঋণ বিতরণ করেছিল ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। সেপ্টেম্বরে এই হার বেড়ে হয়েছে ৮.৮৭ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংকখাতে শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ব্যাংকগুলোর অংশ বাড়ার পেছনে গ্রাহকের অবদান বেশি। এই ব্যাংকগুলোতে যারা আমানত রাখেন, তারা বিশ্বাস করে রাখেন। আবার জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষই ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে লেনদেনকে নিরাপদ মনে করে। শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ইসলামি ধারার ব্যাংকের কর্মকর্তারাও তাদের চাকরিকে পবিত্র ইবাদত মনে করে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত তারল্য ধারণ করার ক্ষেত্রেও অংশ বাড়ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর। জুন শেষে ব্যাংক খাতের ১১.৪৪ শতাংশ অতিরিক্ত তারল্য ধারণ করেছিল ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। এই হার বেড়ে এখন হয়েছে ১১.৫২ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর কাছে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল আট লাখ ৯৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুনে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল এক লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা।
এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব ব্যাংক মিলে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী সব ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭৪টি। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকের শাখা আছে এক হাজার ১২৬টি। এসব শাখার মধ্যে পুরোদমে ইসলামি ধারার ব্যাংকিং আছে এক হাজার ৮২টি। এর বাইরে প্রচলিত ধারার বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ১৯টি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। আর ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো খুলে কাজ করছে ২৫টি শাখা।-বাংলা ট্রিবিউন