শস্যের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে বিষের ব্যবহার বাড়ছে

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৮, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


অনেক দিন ধরেই শস্যের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। এ প্রবৃদ্ধিতে গতি আনতে বাড়ানো হচ্ছে শস্যের নিবিড়তা। যদিও উৎপাদন নির্বিঘœ করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। বাড়ছে ফসলে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ। এসব নিয়ন্ত্রণে ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। দানাদার শস্যের পাশাপাশি কীটনাশকের প্রয়োগ হচ্ছে শাকসবজিতেও। এতে সার্বিকভাবে বাড়ছে ফসলে বিষের ব্যবহার। বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিষের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ, পরিমাণে যা সাড়ে পাঁচ হাজার টন।
চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও জার্মানি থেকেই আমদানি হয় পাঁচ ধরনের বালাইনাশক ও কীটনাশক। ইনসেকটিসাইড, ফাঙ্গিসাইড, হারবিসাইড, মিটিসাইড ও রোডেনটিসাইড বালাইনাশক আমদানি করা হয় মূলত দুভাবেÍ ফরমুলেটেড ও অ্যাকটিভ হিসেবে।
বিসিপিএর তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বালাইনাশক ও কীটনাশক ব্যবহার হয় ৪৬ হাজার ৭৪৯ টন। এর মধ্যে ফরমুলেটেড ৩৩ হাজার ৩৭১ ও অ্যাকটিভ ১৩ হাজার ৩৭৮ টন। পরের বছর থেকে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। ২০১৬ সালে বালাইনাশক ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৫৫১ টন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ১৩৫ টন ছিল ফরমুলেটেড। বাকি ১৪ হাজার ৪১৬ টন অ্যাকটিভ। গত বছর এর ব্যবহার আরো বেড়ে যায়। ২০১৭ সালে কৃষকরা ফসলে বালাইনাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করেন ৫২ হাজার ২৯৩ টন। এর মধ্যে ফরমুলেটেড ছিল ৩৭ হাজার ১৮৭ ও অ্যাকটিভ ১৫ হাজার ১০৬ টন।
কীটনাশকের ব্যবহার বাড়লেও এখনো তা সহনীয় পর্যায়ে আছে বলে মনে করেন বিসিপিএর সভাপতি কৃষিবিদ এ কে এম আজাদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশে শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে। একই জমিতে এখন তিন বা চার ফসল ফলছে। এছাড়া আগে দানাদার শস্যে বালাইনাশক ও কীটনাশক ব্যবহার হলেও এখন প্রায় সব ধরনের সবজিতেই এটি ব্যবহার করছেন কৃষক। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মাঝেমধ্যেই ফসলে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকার আক্রমণ হচ্ছে। এসব মোকাবেলায় বালাইনাশক প্রয়োগের বিকল্প থাকছে না। গত বছর দেশে ব্লাস্টের যে আক্রমণ হয়, সেটিও বালাইনাশকের মাধ্যমে কমানো সম্ভব হয়েছে। দেশে কীটনাশকের যে ব্যবহার তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এটি ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম ও বিধি মেনে কীটনাশক বিপণন করা হচ্ছে। সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে কৃষকদের মধ্যেও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি। কীটনাশকের মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকা দমন করতে গিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে উপকারী পোকাও। সব ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে তাই প্রয়োজন সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি। কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন এর আমদানিতেও।
শস্যের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে শস্যকে অনিরাপদ করা যাবে না বলে মত দেন সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আবাদ বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে। এটা দমনে কীটনাশক ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। তবে এর প্রয়োগ যাতে সঠিক মাত্রায় ও সময়মতো হয়, সেজন্য কৃষককে প্রশিক্ষণ সহায়তা দিতে হবে। আরো বেশি কার্যকর করতে হবে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা।
কীটনাশকের ব্যবহার বাড়তে থাকলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা কমার ধারায়। বিসিপিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে কীটনাশক ব্যবহার হয় ৫৫ হাজার ২৫৯ টন। পরের বছর তা চার হাজার টন বেড়ে ৫৯ হাজার ২৭০ টনে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে কীটনাশকের ব্যবহার আরো বেড়ে হয় ৫৬ হাজার ২৮ টন। ২০১৩ সালে অবশ্য কিছুটা কমেছিল কীটনাশকের ব্যবহার। সে বছর দেশে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার হয় ৫৩ হাজার ১৬২ টন। আর ২০১৪ সালে ফসল রক্ষায় কৃষক কীটনাশক প্রয়োগ করেছিলেন ৫০ হাজার ৩৪৬ টন। সব মিলিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৭Í এ আট বছরে দেশে কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৬৬ টন। এর মধ্যে ফরমুলেটেড ৩ লাখ ৬ হাজার ৭২১ ও অ্যাকটিভ ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৩৭ টন।
বালাইনাশক ও কীটনাশক বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিসিপিএর তথ্যমতে, আমদানিকৃত বালাইনাশক ও কীটনাশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে সালফার ফাঙ্গিসাইড। গত আট বছরে এটি ব্যবহার হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪২ টন। এর পরেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ইনসেকটিসাইড গ্রানুলার ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৩১ টন। একই সময়ে জেনারেল ফাঙ্গিসাইডের ব্যবহারের পরিমাণ ৪৯ হাজার ৭১১, হার্বিসাইড ৩৮ হাজার ৭১১, লিকুইড ইনসেকটিসাইড ৩৬ হাজার ৯০৯, পাউডার ইনসেকটিসাইড ৯ হাজার ৪৯৫, মিটিসাইড ৮২৫ ও রোডেনটিসাইড ৬৩৮ টন।
বালাইনাশক ও কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কয়েক বছর ধরে শস্যের প্রবৃদ্ধিও কিছুটা বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর শস্য খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশে। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও এ খাতে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে আরেকটু বেশি শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ।
কীটনাশকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হচ্ছে না জানিয়ে শীর্ষস্থানীয় বিপণন কোম্পানি সেতু করপোরেশনের নির্বাহী পরিচালক রুমান হাফিজ বলেন, কীটনাশকের গুণগত মান উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব কীটনাশক উৎপাদন, অপব্যবহার ও জমিতে সঠিক মাত্রায়, সঠিক পরিমাণে ব্যবহারে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি কীটনাশকের প্যাকেটে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও থাকছে। কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতেও কর্মসূচি নিচ্ছে কোম্পানিগুলো।
উল্লেখ্য, দেশের শস্যক্ষেতে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির ৬০৭টি পোকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৩২টি বা ৩৮ শতাংশ পোকা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। বাকি ৬২ শতাংশ পোকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ফসলের উপকার করছে। এর মধ্যে ১৮৩টি বা ৩০ শতাংশ পোকা সরাসরি ফসলের জন্য উপকারী। আর ১৯২টি বা প্রায় ৩২ শতাংশ পোকা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে অথবা পরজীবী ও পরভোজী হিসেবে ফসলের উপকারে আসে। কিন্তু কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার উপকারী এসব পোকাও ধ্বংস হচ্ছে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা