শহিদ কামারুজ্জামানের জন্মদিন

আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে রেসকোর্স ময়দানের সংবর্ধনায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আইউব খানের গোল টেবিল বৈঠকে যোগদানের পূর্বে বঙ্গবন্ধু কামারুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে একটি কমান্ড গঠন করেন যাঁদের নিয়ে তিনি আইউব খানের গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন-
ইয়াহিয়া খান পূর্ব ও পশ্চিমের বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে মোট ৩১৩ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানকে ১৬৯টি আসন দেবার ঘোষণা করেন। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ১৬৯টি আসনে জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধু সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানান। ইয়াহিয়া ভুট্টোর সাথে আঁতাত করে জাতীয় পরিষদের সভা ডাকা থেকে বিরত থাকলেন। শুধু তাই নয়, ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন হলেও ইয়াহিয়া খান জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি এ দু’মাস নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করছিলেন। ভুট্টো ও মুজিব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে কয়েক দফা আলোচনায় বসেন। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়।
৬ মার্চ বিকেলে বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া ঘোষণা দেন- টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের মার্শাল অ্যাডমিস্ট্রেটর এবং তাঁর আদেশেই প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে এবং একইসাথে ১০ মার্চ আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় বসার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু এএইচএম কামারুজ্জামানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে তাৎক্ষাণিকভাবে আলোচনায় বসে ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এএইচএম কামারুজ্জামান, কামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সে রাতে আলোচনা অব্যাহত রাখেন।
ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মী সম্মেলন করে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক জনসভায় এএইচএম কামারুজ্জামান প্রায় ৫ হাজার নেতাকর্মীর সামনে ঘোষণা করেছিলেন শাসকগোষ্ঠি যদি ৬ দফা ও ১১ দফা মেনে না নেয় তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করা হবে।
৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রকারান্তরে স্বাধীনতার ঘোষণাসহ বাঙালি জাতিকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিলেন। ইতোমধ্যে নানা পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে। ২৪ মার্চ নেতৃবৃন্দ সারাদিনই ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠকে বসার অপেক্ষায় ছিলেন কিন্তু ইয়াহিয়ার দিক থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় পরিস্থিতি যে সামরিক সমাধানের দিকে যাচ্ছে সে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়। ২৫ মার্চে এএইচএম কামারুজ্জামান বঙ্গবন্ধুর সাথে শেষ সাক্ষাৎ করেন। সে রাতেই “অপারেশন সার্চ লাইট’ এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়ে যায়। একইসাথে শুরু হয় ছাত্র জনতা, পুলিশ, ইপিআর ও বাঙালি সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে। এএইচএম কামারুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় একজন দক্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাংলাদেশের সর্বত্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় এএইচএম কামারুজ্জামান উত্তরবঙ্গসহ অন্যান্য অঞ্চলের ৫০ জনের বেশি এমপি ও শত শত আওয়ামী লীগ নেতার সাথে যোগাযোগ স্থাপন, একদিকে করণীয় নির্ধারণ এবং অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংগঠিত করে আক্রমণ প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করেন। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাত ১:৩০ মিনিটে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে গ্রেফতার হন। তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রবাসী সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ দেখা দেয়। কামারুজ্জামান ছিলেন খুবই সুবিবেচক’ তিনি ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেবার কথা বলেছিলেন। তিনি ছিলেন নির্লোভী, দেশপ্রেমিক ও উদার দৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতা। তিনি জানতেন এবং বুঝতেন রাজনৈতিক কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিলে জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে।
এএইচএম কামারুজ্জামান মন্ত্রিত্বকে গুরুত্ব দেননি বরং মনে-প্রাণে একজন নিবোদিত প্রাণ কর্মী হতে পারাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যে কারণে ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছিলেন। পাকিস্তান আইন পরিষদের এমএনএ পদ থেকে পদত্যাগ করেও তিনি ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ আছে, যা প্রমাণ করে কামারুজ্জামানের উদ্যোগ ও উদারতা ছাড়া মুজিবনগর সরকার গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব ছিল। কামারুজ্জামান নিজেই নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে (সাধারণ সম্পাদক-কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (সাধারণ সম্পাদক পাকিস্তান আওয়ামী লীগ) নামকরণ করে তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে প্রবাসী সরকার গঠন প্রক্রিয়া ও সরকার পরিচালনাসহ যুদ্ধকালীন করণীয় নির্ধারণ সহজ হয়।
প্রবাসী সরকার গঠন নিয়ে যখন কোলকাতায় মতদ্বৈততা চলছে তখন বাংলার মানুষের উপর চলেছে অমানবিক নির্যাতন। খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, জালাওগোড়াও- এক শ্মশানপুরীতে পরিণত হচ্ছিল সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলা মা। আর তার নিষ্পাপ সন্তানেরা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিচ্ছিল বাংলা মা’র শৃঙ্খল মুক্তির জন্য। বাস্তবতার কঠিন নিষ্পেশনে দিশেহারা কামারুজ্জামান তখন ব্যস্ত শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য। সব ভেদাভেদ ভুলে তিনি সবাইকে যুদ্ধের জন্য উজ্জীবিত করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কামারুজ্জামানের পরিবার কোলকাতা পৌঁছলে তিনি কিছুটা স্বস্তিবোধ করেন এবং বিপুল উদ্যমের সঙ্গে কাজ আরম্ভ করেন।
১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগর সরকার শপথগ্রহণ করে। এ সরকারে এএইচএম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধকালীন রসদ সরবরাহ থেকে সব রকম কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। যুদ্ধের নয় মাস তিনি বিশ্রামহীন ও বিরামহীন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ছুটে বেড়িয়েছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট ও প্রশিক্ষণের তদারকি করাই নয়Ñ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা ও শহিদদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থাও করতেন। এএইচএম কামারুজ্জামানকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠিন চ্যালেঞ্জে গ্রহণ করতে হয়েছে। একদিকে নিয়মিত সামরিক বাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যদিকে যুবনেতাদের পরিচালিত করতে অনেক সমন্বয় সাধন করতে হতো। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি যুব শিবিরের কার্যক্রম ও মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতেন, তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতেন।
তিনি শরণার্থীদের আশ্রয়, ত্রাণকাজ পরিচালনায় কাজগুলো নিবিড় ও আন্তরিকভাবে তত্ত্বাবধান করতেন। যুদ্ধকালীন প্রায় ৭৪ লক্ষ শরণার্থীর নয় মাস ধরে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা প্রদানে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি নিজেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং পরবর্তীকালে দেশ পরিচালনায় তাঁর অবদান অপরিসীম। মহান এই নেতা ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর জেলখানায় আততায়ীর হাতে নিহত হন অন্য ৩ জাতীয় নেতার সাথে। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করি।