বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

শহীদদের মেলে নি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ।। সংরক্ষণ করা হয় নি গণকবর

আপডেট: December 22, 2016, 12:04 am

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি



১৭ এপ্রীল ১৯৭১। দুপুর ১২টা হবে। এক সথে ১৬ জন যুবককে লাইনে দাঁড় করানো হয়। বাঁধা হয় ওদের চোখ ও হাত। এরপর চলে পাক হানাদার বাহিনীর গুলি। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ওই ১৬ জওয়ান। ঘটনার পর নিহতদের বাড়ি-ঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সুনীল কুমার গুহ জানাচ্ছিলেন সেদিনের নির্মমতার এই গল্প। নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর সদরের উত্তরনাড়ীবাড়ি এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর চালানো তা-বে নিহত হওয়া ওই ১৬ যুবকের কেউ পায় নি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। সংরক্ষণ করা হয় নি এসব শহীদদের গনকবর। এখন দুঃখ-দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ওই দিনে পাকসেনারা চোখ ও হাত বেঁধে লাইনে গুলি করে শীতানাথ হালদার, বলরাম হালদার, নীল রতন সরকার, নবরাম মজুমদার, ডা. মনিন্দ্র নাথ সরকার, দিলীপ কুমার সরকার, সুরেশ চন্দ্র মালাকার, মানিকচন্দ্র মালাকার, বিষ্টপদ ঘোষ, সুধীর চন্দ্র হালদার, সুবোধ চন্দ্র হালদার, যদুনাথ কর্মকার, দুখুরাম হালদার, দুলাল মালাকার, গেদু মালাকার ও বাদল চৌধুরীকে হত্যা করে।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, সেদিন নিহত ব্যক্তিরা দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ‘গুরুদাসপুর-নাটোর সড়কের’ নারিবাড়ি এলাকায় একটি গাছের ছাঁয়ায় বসে আলোচনা করছিলেন। দুপুর ১২ হবে। পাকসেনারা নাটোর থেকে গুরুদাসপুরে ঢুকছিল। এক সঙ্গে বেশ কিছু মানুষের জটলা দেখে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পাক হানাদার বাহিনী। ঘটনাস্থলেই ওই ১৬ জন ব্যক্তি নিহত হন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ও সুনীল কুমার গুহ।
গণহত্যার শিকার শহীদ বিষ্ণুপদ ঘোষের স্ত্রী সূনীতি ঘোষ (৬৬) জানান, পাকসেনারা তার স্বামীকে হত্যার পর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। তারপর থেকে সংসারে অভাব শুরু। সেসময় তার ছেলে কৃষ্ণপদ ঘোষ ও বলরাম ঘোষ ছোট ছিল। তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করেন সুনীতি। বড় ছেলে কৃষ্ণপদ ঘোষ প্রতিবন্ধী। আর ছোট ছেলে বলরাম ঘোষ সাইকেল মেকার। বয়স বেশি হলেও একমুঠো অন্নের জন্য এখনও খেত খামারে ১শ টাকা দিন কাজ করছেন ওই শহীদের স্ত্রী।
সুনীতি ঘোষ বলেন, শেখ মুজিব বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে কিছু সাহায্য পেয়েছেন। এখন কেউ কোন খোঁজ খবর রাখে না। ২০০৯ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিশেষ দিবসে ডেকে নিয়ে একটা মেডেল ও ব্যাচ দিয়েছেন। কিন্তু শহীদ পরিবার হিসেবে পরিচয় দেবে এমন কোন কাগজ তিনি পান নি।
গণহত্যার শিকার সুরেশ চন্দ্র মালাকারের ছেলে সুবল চন্দ্র মালাকার বলেন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা কেড়ে নিয়েছে তার বাবাকে। তাদের দোতালা বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীনের ৪৫ বছরেও গণহত্যায় নিহতদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। দেয়া হয় নি সরকারি কোন অনুদানও। দেশের জন্য জীবন দেয়া এসব শহীদের গণকবরও পড়ে আছে অযত্মে-অবহেলায়।
শহীদ পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেদিনের শহীদ হওয়া দিলীপ কুমার সরকারের বাবা সুধীরচন্দ্র সরকার নিজ খরচে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার তৈরী করেন। ওই শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি ভাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি।
এ ব্যাপারে গুরুদাসপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগাযোগ করা হলে বর্তমান ডেপুটি কমান্ডার ফারুক আহম্মেদ বলেন, নিহতরা গণহত্যার শিকার। তাই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাদের নাম নেই।
এ ব্যাপারে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ইয়াছমিন আক্তার বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ