শাকিবের ব্যবহারে আমি তার ফ্যান হয়ে গিয়েছি : সব্যসাচী

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯, ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


১৯৯২ থেকে বর্তমান; তিন দশকের অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী। ‘তেরো পার্বণ’ সিরিয়াল থেকেই তিনি পশ্চিমবাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ‘রুদ্র সেনের ডায়েরি’ টেলিসিরিয়ালে প্রথম গোয়েন্দা চরিত্রে আবির্ভাব তার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, বাংলাদেশেও তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান একটি চরিত্র করে। ফেলুদা। পর্দায় সত্যজিৎ রায়ের এই বিখ্যাত ফেলুদা এখন ঢাকায়। কাজ করছেন ফাখরুল আরেফিন খানের চলচ্চিত্র ‘গণ্ডি’-তে। ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার আলাপচারিতায় উঠে আসে চরিত্র ও চরিত্রের বাইরের সব্যসাচী-
বাংলা ট্রিবিউন: এ দেশের মানুষের কাছে আপনি যতটা সব্যসাচী, তারচেয়েও বেশি ফেলুদা। এমনটা নিশ্চয়ই কলকাতাতেও। একটি চরিত্রের কারণে নিজের পরিচয় আড়াল হয়ে গেছে। আলাপের শুরুতে একটু কাটখোট্টা প্রশ্ন হয়ে গেলো। আপনার কাছে বিষয়টি কেমন লাগে!
সব্যসাচী: না, প্রশ্ন ঠিকই আছে (হাসি)। এটি একমাত্র চরিত্র যে, এটি আমি নিজে থেকে করতে চেয়েছিলাম। আর কোনও চরিত্র আমি নিজে থেকে চাইনি। অন্যগুলো আমার কাছে এসেছে। ‘ফেলুদা’ হচ্ছে একমাত্র চরিত্র, যা আমি চেয়েছিলাম। তাই এটি আমার প্রিয় চরিত্র। আর সবচেয়ে যেটা জনপ্রিয় হয়েছে সেটাও ‘ফেলুদা’।এছাড়া অনেক চরিত্র আছে, সেগুলোও আমার প্রিয়। তবে ফেলুদার মাঝে হয়তো আমি নিজেই হারাতে চেয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকায় এলেন। সবাই হই-হুল্লোড় করে জন্মদিন করলেন। কিন্তু আমরা যতদূর জানি এ দিনটি (৮ সেপ্টেম্বর) ঘিরে আপনার তেমন উচ্ছ্বাস নেই।
সব্যসাচী: দেখুন আমাকে যারা জন্ম দিলেন, তারাই তো পৃথিবীতে নেই। আমার বাবা-মা বেঁচে নেই। আমার পুরনো চেনা মানুষগুলো আমার চারপাশে নেই। আসলে পৃথিবী স্থির নেই। আমি যেদিন জন্মেছিলাম, সেদিনের পর থেকে চাঁদ-সূর্যও তো এক জায়গায় নেই। তাই সেই দিন তো ফিরে আসা সম্ভব নয়। তবে আমরা একটি গণ্ডি তৈরি করেছি। ৩৬৫ দিনের গণ্ডি। এটা মানুষের তৈরি। যার উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যবসায়িক। একটা জন্মদিন এলেই হয় কেক বিক্রি হবে, নয় কার্ড। গিফট বিক্রি হবে কিংবা পার্টি হবে। তার মধ্যে সবই একটা না একটা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য আছে। কাজেই ওসব নিয়ে ভাবার কোনও কারণ নেই। জন্মদিন হচ্ছে আমদের তৈরি গণ্ডি। প্রতিবছর আমরা সেই গণ্ডিটা পেরুচ্ছি। এর বেশি কিছু নেই। তবে এখানকার মানুষের আতিথেয়তা ও আপন করে নেওয়ার ক্ষমতায় আমি হতভম্ব বা অভিভূত বলা যায়। আমার জন্মদিন ৮ সেপ্টেম্বর। তার আগেই তারা কেক কেটে পার্টি দিয়ে যে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তা ভোলার নয়।
বাংলা ট্রিবিউন: জন্মদিনের গণ্ডি নিয়ে কথা বলছিলেন। আপনি যে কারণে এসেছেন সেই ছবির নামও ‘গণ্ডি’। আর এখানে এমন এক বন্ধুত্বের কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের সমাজে বিরল। অনেকাংশ অনাকাঙ্ক্ষিত। ‘গণ্ডি’ ছবি নিয়ে যদি বলতেন।
সব্যসাচী: এই ছবির ট্যাগ লাইন হচ্ছে ‘ফ্রেন্ডশিপ উইদাউট বাউন্ডারি’। বন্ধুত্ব সবরকম হতে পারে, বয়স, লিঙ্গ, সীমানা কোনও বাধাতেই তাকে আটকানো যায় না। আমারও কিন্তু অনেক ধরনের বন্ধু আছে। এ ছবির গল্পটি তেমনই এক গল্প। ‘গণ্ডি’ ছবির মূল বিষয়বস্তু আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি কয়েকটি কারণে ছবিতে কাজ করতে রাজি হই। ছবিতে আমার চরিত্র কী, আমার এক্সপোজার কতটুকু কিংবা কত টাকা পাবো− এগুলো নয়। আমি এসব বিচার করি, গল্প-নির্মাতা কতটুকু সৎভাবে, নিষ্ঠার সঙ্গে ছবিটি করবেন এবং আমাকে কতটুকু চাইছেন, ব্যস। তার (ফাখরুল আরেফিন খান) সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগলে, আমি ‘হ্যাঁ’ বলে দেই।
বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশি অভিনেতার সঙ্গে আপনার আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষ করে বর্তমানে ঢাকাই ছবির শীর্ষ নায়ক শাকিব খান ও আপনি একই ছবিতে কাজ করেছিলেন। কেমন অভিজ্ঞতা ছিল আপনার?
সব্যসাচী: শাকিব ও আমি ‘শিকারী’ ছবিতে কাজ করেছিলাম। সে ভীষণ ভালো ছেলে। ছবিটি শুরু করার আগেই আমি তার প্রসঙ্গে শুনেছিলাম। এ দেশের ছবিতে তার ভূমিকার কথা জেনেছিলাম। কিন্তু ওই ছবির আগে কোনও দিন ওর সঙ্গে আলাপ হয়নি। আমরা প্রথম দেখা করি ‘শিকারী’ ছবিটির সময়। এত ভালো ছেলেটা, এত ভালো ব্যবহার! আমি মুগ্ধ। তার বিনয়ী ব্যবহার দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছি। সত্যিকারের বিগস্টারদের এমনই হওয়া উচিত। আমি ওর খুব বড় ফ্যান হয়ে যাই!
বাংলা ট্রিবিউন: দুই বাংলায় আপনার অনেক ভক্ত। বিশেষ করে বাংলাভাষী মানুষের শৈশবের প্রিয় অভিনেতা আপনি। নিজের বিষয়ে বলবেন কি, আপনি কার ভক্ত?
সব্যসাচী: সব্যসাচী অনেকের ভক্ত। প্রথমত আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য। তারপর তার শিক্ষাগুরুর ভক্ত। তারপর আরও মহাপুরুষরা আছেন, তাদের ভক্ত। অভিনয়ের জগতে যারা আছেন তাদের আমি ভক্ত বলবো না, পছন্দ করি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ বচ্চন, তুলসী চক্রবর্তী, উৎপল দত্ত এরকম অনেকেই আছে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কথায় ছোটবেলার ঘ্রাণ আছে। বাবা-মা, ছোটবেলায় আপনি প্রায় ফিরে যান। ছোটবেলার দিনগুলো কেমন ছিল। কীভাবে অভিনয়ে যুক্ত হলেন?
সব্যসাচী: ছোটবেলায় আমি বাবার সঙ্গে ফ্যাক্টরিতে কাজ করতাম। আমি একজন টেকনিশিয়ান ছিলাম। আমার বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাই বাবার পেশাটাই আমাকে বেশি টানতো। আমি হতে চেয়েছিলাম অনেক কিছু। কিছুই হতে পারিনি। এখন অভিনেতা হয়ে সবকিছুই হতে হচ্ছে। নাটকের পরিবারে আমার জন্ম। সবাইকে দেখতাম নাটক করছেন, আমার বাবা-মা, পিসেমশাই, পিসি, মামা, মেজো কাকা সবাই নাটকের মধ্যে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। রোজ সন্ধ্যাবেলায় রিহার্সেল হচ্ছে। আমি দেখলাম, যারা আসছেন, তারা সবাই আমার বাবা-মায়ের বন্ধু। এভাবে তাদের সঙ্গেও আমার সুসম্পর্ক হয়ে ওঠে। তারা যখন নাটক করতে যেতেন, তাদের সঙ্গেও যেতাম। মূল আকর্ষণ ছিল মঞ্চের পেছনে কাজ করা। ভেবেছিলাম, ওটাই করবো। কিন্তু আমার পিসেমশাই আমাকে জোর করে ঢুকিয়ে দিলেন অভিনয়ে। আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, লোকে যাতে আমাকে বর্জন করে দেয়, ভালো নয় বলে। হলো উল্টো। লোকের পছন্দ হয়ে গেলো। কাজেই আমি আটকে গেলাম।
বাংলা ট্রিবিউন: আমরা ফেলুদা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এটা দিয়েই শেষ করতে চাইছি। সন্দীপ রায়ের ‘বাক্স রহস্য’ ও ফেলুদার ওপর টেলিফিল্ম সিরিজে অভিনয় করার পর ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ সিনেমায় অভিনয় করেন। ফেলুদা নিয়ে টিভি সিরিজগুলোতে একসময় টানা অভিনয় করলেন। তারপর বিরতি। পর্দায় নতুন ফেলুদা এলেন। এরপর ফেলুদার ৫০-এ আবার চরিত্রটি করলেন। ‘ডাবল ফেলুদা’ করতে গিয়ে মনে হয়নি ৬০ বছর বয়সে চরিত্রটার জন্য বেশি চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেললেন?
সব্যসাচী: বাবু (সন্দীপ রায়) যখন নতুন করে ফেলুদা খুঁজতে শুরু করলেন তখন তাকে আমি অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কথা বলি। তাকে পছন্দ করেন বাবু। কিন্তু বললেন, ফেলুদার জন্য আরেক একটু ম্যাচিউরড কাউকে চাই। আবীর চট্টোপাধ্যায়ের কথাও প্রসঙ্গক্রমে আসে। কিন্তু সমস্যা হলো আবীর তখন ব্যোমকেশও করে। এটা একটু সমস্যার। হঠাৎ বাবু একদিন বললো এটা ফেলুদার ট্রিবিউট। তোমাকেই করতে হবে। আর উপায় নাই। ব্যস, রাজি হয়ে যাই। অন্যদিকে বাড়িতে ফিরে ঘটনাটা বলাতে আমার স্ত্রী মিঠু কেমন একটা চোখমুখ করে বললো, ‘আবার!’
বাংলা ট্রিবিউন: আচ্ছা, আর একটা প্রশ্ন করি। সৌমিত্র থেকে হালের আবীর, অনেকেই চরিত্রটি করেছেন। আপনার মতে সেরা ফেলুদা কে?
সব্যসাচী: এটা বলা মুশকিল। এটা এমন একটা চরিত্র, যতদূর আমি জানি সত্যজিৎ রায়ও তার মনের মতো ফেলুদা খুঁজে পাননি। সত্যজিৎ রায় চেয়েছিলেন−বরুণ চন্দের মতো উচ্চতা, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের চেহারা আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় থাকবে ফেলুদা চরিত্রের মধ্যে। নামগুলো দেখেছেন! কীভাবে সম্ভব! তবে আমি যতজনকে ফেলুদা দেখেছি তার মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ই সেরা। আর একটা কথা, সন্দীপও (সত্যজিৎ রায়ের ছেলে) মানেন ফেলুদা আর কেউ নন, সত্যজিৎ রায় স্বয়ং। আমিও সেটা বিশ্বাস করি।