শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে বুয়েট ভিসি

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৯, ৯:৪৩ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


তোপের মুখে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম-সোনার দেশ

আবরার ফাহাদ হত্যার দুদিন পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তোপের মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে তিনি ‘নীতিগতভাবে’ একমত। কিন্তু সাত দফা দাবি সুনির্দিষ্টভাবে মেনে নেয়ার কথা তিনি না বলায় উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
দাবি পূরণ করা না হলে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়াও ঘোষণা রয়েছে তাদের।
রোববার গভীর রাতে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধারের পর সোমবার সারাদিন সিসিটিভি ফুটেজের দাবিতে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা।
সেই ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা করেন আবরারের বাবা, পুলিশ বুয়েট ছাত্রলীগের দশ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বুয়েট শহিদ মিনার এলাকায় সমবেত হন। সেখানে সাত দফা দাবিনামা তুলে ধরেন তারা।
তার মধ্যে উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বিকাল সোয়া ৪টার পর ক্যাম্পাসে এলেও শহিদ মিনারে বিক্ষোভস্থলে না গিয়ে নিজের কার্যালয়ে চলে যান।
দিনভর শহিদ মিনার চত্বরে বিক্ষোভের পর শিক্ষার্থীরা বিকাল ৫টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে ভিসির অফিসের নিচে অবস্থান নেন।
শ তিনেক শিক্ষার্থীর ওই অবস্থান থেকে স্লোগান ওঠে- ‘ভিসি স্যর নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’, ‘আমার ভাই কবরে, ভিসি কেন ভেতরে’, ‘প্রশাসন নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’।
সেই সঙ্গে চলতে তাদের মূল স্লোগান- ‘আবরারের খুনিদের, ফাঁসি চাই দিতে হবে’।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টার পর উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম দোতলা থেকে নেমে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সামনে এলে শুরু হয় হট্টগোল।
উপাচার্য দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করার কথা জানালেও শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট ঘোষণার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। ঘটনাস্থলে ভিসির অনুপস্থিতি নিয়েও একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন তারা।
প্রায় আধা ঘণ্টা এ অবস্থা চলার পর আলোচনা অমীমাংসিত রেখেই উপাচার্য আবার উপরে তার কার্যালয়ে চলে যান। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিচে হাতে তালি আর স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকেন।
শিক্ষার্থীদের ৭ দফা
>> খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
>> ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে তাদের আজীবন বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
>> দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে
>> বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে। ছাত্রকল্যাণ শিক্ষককেও (ডিএসডব্লিউ) বিকাল ৫ টার মধ্যে সবার সামনে জবাবদিহি করতে হবে।
>> আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। আহসানউল্লা হল ও সোহরাওয়ার্দী হলে ঘটা আগের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে বাতিল করতে হবে।
>> রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।
>> মামলার খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে।
বুয়েট শিক্ষার্থীরা সকালে শহিদ মিনার এলাকায় বিক্ষোভ শুরুর পর একদল সাবেক শিক্ষার্থীও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল মিছিল করে এসে বেলা পৌনে ১২টার দিকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয়।
পরে বুয়েট শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিরা সমাবেশস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। আবরার ফাহাদের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ।
তিনি বলেন, “আমরা অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা- শিক্ষকরা বলি, প্রশাসন বলি, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।”
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহিদ মিনার থেকে পলাশী হয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে যায়। সেখান থেকে বুয়েটের পূর্ব প্রান্তে খেলার মাঠ হয়ে তারা আবার বুয়েট শহিদ মিনারে ফিরে আসে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবরারের জন্য গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হয়।
গায়েবানা জানাজার পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, “ভারতের সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তির বিরোধিতা করায় আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। আবরারের রক্তস্নাত দেশবিরোধী চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।”
ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েকটি চুক্তি নিয়ে ফেইসবুকে মন্তব্যের সূত্র ধরে শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।
ওই ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ গ্রেপ্তার দশজনকে মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। আর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সাংগঠনিক তদন্তের ভিত্তিতে আগের রাতেই বুয়েট ছাত্রলীগের ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার কথা জানিয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ