শিক্ষার ভারসাম্যহীনতা

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


যে কোনো বিষয়ে যদি ভারসাম্য না থাকে তাহলে সেখানে সামঞ্জস্যহীনতা পরিলক্ষিত হয়। অর্থনীতি শাস্ত্রে যেমন চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যের বিষয়টি আলোচিত হয় এভাবে-
চাহিদা বাড়লে জোগান কমে, দ্রব্যমূল্য বাড়ে।
চাহিদা কমলে জোগান বাড়ে, দ্রব্যমূল্য কমে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য। আমাদের দেশে নানামুখি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। শিক্ষায় ভারসাম্য নানামুখি শিক্ষার কারণে খানিকটা হলেও হারিয়েছে। কারণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের এখানে বোর্ডের অধীনে স্কুল-কলেজের শিক্ষা, কিন্ডার গার্টেনে শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষা, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় শিক্ষা, প্রাইভেট ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা- এসব শিক্ষার ভেতরে বিস্তর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। আমরা জানি, শিক্ষার অধিকার তথা চাহিদা রয়েছে আপামর মানুষের। কিন্তু সামর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকক্ষেত্রে শিক্ষা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের নাগালের ভেতরেই থাকে এবং একটা বৃহৎ অংশ থাকে সুবিধাবঞ্চিত। এ অবস্থা যেমন কোনোভাবেই কাম্য নয়, তেমনি একথাও সত্যি- “শিক্ষাকে পণ্য করা যাবে না।” তাহলে শিক্ষার মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। শিক্ষা কোনো হাটে-বাজারে বিক্রির জিনিস নয়, যে চাইবে সেই পাবে। শিক্ষাকে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনের ভেতর দিয়ে আয়ত্ব করতে হয়। কিন্তু দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করি আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার ফলে অনেক সময়ই শিক্ষা ব্যবস্থা অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে এবং তখনকার শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়েছে নানাভাবে। শুধু তাই নয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা না থাকায় একটা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হয়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় তারা শিক্ষা পদ্ধতি ও মাধ্যমের ভিন্নতার কারণে সমস্যার সম্মুখিন হয়।
এটি গেলো একটা দিক। অন্যদিকে আমরা দেখি ব্যাঙের ছাতার মতো আমাদের দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকের সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। এটি খুব সংগত এবং স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ১০টি। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে এ সংখ্যা ৪১টি। এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় তদুপরি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন বিষয় চালু করার ফলে হাতে গোনা ও কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের জোগান দেওয়া অসম্ভব। শুধুমাত্র তাই নয়, এসব প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে কাজ করে। ফলে তাঁদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম দেওয়া প্রয়োজন তা বিঘিœত হচ্ছে দু’টো কারণে-
১) অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ফলে তাঁদের হাতে অতিরিক্ত সময় থাকে না।
২) মানুষের সামর্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে তাঁরা নবংঃ ড়ঁঃঢ়ঁঃ দিতে পারে না নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ কলসালটেন্সিতে এতো বেশি ব্যস্ত থাকেন যে, তাঁরা নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দানে অবহেলা করে থাকেন। এমনও শোনা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে কষ্ট করে আসা শিক্ষার্থীরা দিন শেষে কোনো ক্লাশ না করেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এহেন পরিস্থিতি অনাকাক্সিক্ষত- শিক্ষার ভারসাম্যতাহীনতার জন্য এ পরিস্থিতিও কম দায়ী নয়।
শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত আছেন যারা অথবা এ মহান পেশায় যুক্ত হতে চান তাদের চাওয়া-পাওয়াকে অবশ্যই গ-িবদ্ধ করতে হবে। অন্য পেশার চেয়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এ কারণে, তাঁরাই মানুষ তৈরির কারিগর। সুতরাং, নিজেরা যদি নির্লোভ না হন, দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা করেন, মিথ্যাচার করেন, তাহলে যতই বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা তাঁরা বলুন না কেন তা মানুষের চরিত্র গঠনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করবে না। এ সহজ সত্যি কথাগুলো মনে রেখে তাঁরা বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি করার নামে অযথা সময় ক্ষেপণ না করে যথাসময়ে ফিরে এসে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন তাহলে সকলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। অনেকে বিদেশে গিয়ে আর ফেরেন না। যে প্রতিষ্ঠানের বদৌলতে তিনি বিদেশে গেলেন সে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থাকা উচিৎ।
অনেকে দেশে বসে দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করেন। নিষ্পাপ শিক্ষার্থীদের নিয়ে নেশা করে, এমনকি তার ব্যবসায়ে নিজেরা তো বটেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যক্কারজনক কাজের সাথে যুক্ত করেন। দেশকে সৃষ্টিশীল কিছু দেবার পরিবর্তে সৃষ্টিশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করছেন- তাঁদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়া উচিৎ। প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের উপযুক্ত বিচার হওয়া জরুরি দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে।
শিক্ষকরা জাতির বিবেক। সুতরাং, তাঁদের চারিত্রিক গুণাবলি, নীতি, আদর্শ ও সর্বোপরি মূল্যবোধ সব শ্রেণির নাগরিকের তুলনায় উন্নতমানের হবে এটাই সকলের কাম্য। কিন্তু এটি খানিকটা হলেও ভূ-লুন্ঠিত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের লোভ-লালসার কারণে। লোভ শুধু অর্থের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না থেকে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানির সীমায় পৌঁছে গেছে। নানা কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষক না হয়ে বিসিএসের মাধ্যমে অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছে। এটাও ভারসাম্যহীনতার কারণ। শিক্ষা ক্ষেত্রের ভারসাম্যহীনতা সে যে কারণেই হোক- সেটি একটি দেশের জন্য অশনিসংকেত। সুতরাং, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষক, অভিভাবক, সুশীল সমাজ তথা রাষ্ট্রের আশু মনোযোগ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ একান্তভাবে কাম্য।