শিবগঞ্জের বধ্যভূমি সংরক্ষনের দাবি মুক্তিযোদ্ধাদের

আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ


শিবগঞ্জে মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ির অসংরক্ষিত বধ্যভূমি-সোনার দেশ

১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক শহীদ সেতাউর রহমান ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুুল কুদ্দুসকে হত্যা করে তাদের লাশ গাছে ঝুলিয়ে আগুনের পুড়ানোর বিভৎস দৃশ্যের কথা বর্ননা করতে গিয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন মোবারকপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ৬৫ বছরের বৃদ্ধ সাদিকুল আলম বিশ্বাস। অঝরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন যুদ্ধের সময় আমি কানসাট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর বুধবার আমার বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা আবদুুল কুদ্দুস গোপনে কলাবাড়িতে পাক বাহিনীর আস্তানায় হামলা করার জন্য দুটি গ্রেনেডসহ বাড়িতে আসে। দেশীয় রাজাকাররা টের পেয়ে পাকবাহিনীকে সংবাদ দিলে তারা সেদিনই বিকেল তিনটার দিকে আমার ভাইকে বাড়ি থেকে ধরে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার কিছুক্ষন পরেই আবারো তারা আমার আব্বাকে বাড়ি থেকে ধরে ফেলে এবং আমাকে ধরার চেষ্টা করলে আমি পালিয়ে যাই। ২৭ নভেম্বর রোববার আমি গোপনে দূর থেকে দেখার চেষ্টা করি। সে সময় দেখি তারা আমার আব্বা ও বড় ভাইকে বেঁধে কয়েকটি গুলি করে হত্যা করে। এরপর লাশ দুটিকে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পরে মাটিতে পুঁতে ফেল্।ে আমি সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে আসি এবং নাচোলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আশ্রয় নিই । তিনি আরো জানান, দেশ স্বাধীনের পর সেখানে গিয়ে দেখি দুটি গর্তে প্রায় ৫০ থেকে ৬০জনের কঙ্কাল। তাছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো আনেকের মৃত দেহের কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেছি। কান্নাজড়িত কন্ঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, দীর্ঘ ৪৭ বছরের মধ্যে কেবল মাত্র সাবেক সাংসদ মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার মইন উদ্দিনে আহমেদ মুন্টু ডাক্তারের আমলে দুই ব্যন্ডিল টিন পেয়েছিলাম। তারপর আর কেউ কোনদিন খোঁজ নেয় নি। উপজেলার মোরারকপুর ইউনিয়নের কান্তিনগর গ্রামে নিজ বাড়িতে কথা হয় তার সঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের চাওয়া পাওয়া কিছুই নেই। পাকবাহিনীর হাতে নিহত শহীদরা এ গড়ে চিরশায়িত আছেন। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদদের রাষ্ট্রীয় মযর্দা ও জীবিত রাজাকারদের বিচার ও মৃত রাজাকারদের সম্পত্তি বাজাায়াপ্ত করা জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি।
ধোবপুকুর বাজার তরুন উন্নয়ন ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতায় গত শুক্রবার উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি মৌজায় ৪৪১, ৪৪২ ও ৪৪৩নং দাগের জমিতে যাওয়া মাত্র জমির মালিক মৃত ইদ্রিশ বিশ্বাসের ছেলে দুরুল হোদা বললেন, যুদ্ধের সময় আমি ১২বছরের ছেলে। পাকবাহিনী আমাকে দিয়ে তাদের সমস্ত কাজ করাতো। এ সময় অনেকের পোষা গরু ছাগল মুরগী লুট করে নিয়ে আসতো। আমাকে তাদের আস্তানায় থাকতে বাধ্য করতো। সে সময় আমি দেখেছি কানসাট, শ্যামপুর, মোবারকপুর, শাহাবাজপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে গর্তে পুতে ফেলতে। এখানে শতাধিক ব্যক্তি শায়িত আছেন। তিনি আরো জানান, তাদের আস্তানাটি ছিল আমার জমির উপর। স্বাধীনতার পর আমি সমস্ত লাশের মাথা, খুলি, দাঁত, হাত পায়ের হাড় বিভিন্ন স্থান থেকে কুড়িয়ে এক জায়গায় করে সংরক্ষন কর্।ি পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই সাদিকুল আলম বিশ্বাস আমার কাছে জমিটুকু ক্রয় করতে চাইল আমি বিক্রী না করে স্বেচ্ছায় দানপত্র দলিল করে দিয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখেরে বিষয় আজ অবধি জায়গাটি সংরক্ষন হয়নি। আমার শেষ আশা রাজাকারদের বিচার ও জায়গাটি সংরক্ষিত দেখা।
মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি গ্রামের মৃত ওয়াজেদ আলির ছেলে এহিয়া হোসেন (৬৫) বলেন, নিজ চোখে দেখেছি ও জেনেছি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা করায় পাকবাহিনী দেশীয় রাজাকার গফুর, আহাদ, রউফ, মেনু জোলা, মনজুর, সেতাউর ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞার সহযোগিতায় কান্তিনগর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুুল কুদ্দুস ও তার পিতা সেতাউর রহমান ও কয়লায় দিয়াড় গ্রামের ৭-৮জনসহ মোট ২০জন নিরহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে তাদের আস্তানার পাশে পুঁতে ফেলতে। তিনি আরো জানান, স্থানটিতে এতদিন জঙ্গল ছিল। সাপের ভয়ে কেউ সেখানে যেতো না। এলাকার কয়েক যুবক জঙ্গল পরিস্কার করেছে।
মোবারকপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসহাক মিঞা বলেন, ১৯৭১সালে জুন মাসের প্রথম সপ্তায় মোবারকপুর গ্রামে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞার নেতৃতে এলাকার ২০জন নিরহ মানুষকে ধরে বেঁধে নির্যাতন করার দৃশ্য দেখে আমি আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি থেকে পলিয়ে যাই এবং জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তায় মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করি। যুদ্ধে শেষে বাড়ি ফিরে এসে জানতে পারি রাজাকার গফুর, মনজুর, চান্দু, মেনু, আলফাজ আহাদ হুমায়ুন মাস্টার আলমগীর ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞাসহ ৫০-৬০ জন রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী, কানসাট, শ্যামপুর, মোবারকপুর, শাহাবাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার রিপন আলি, আবদুুল ক্দ্দুুস, আবু আলি ও বিসু আলি এ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ও সেতাউর রহমান, বজলার রহমান,লালমোহাম্মদ,মোজাম্মেল হক, মহিউদ্দিনসহ শতাধিক নিরহ মানুষকে ধরে এনে কলাবাড়ি আস্তানায় এনে গুলি করে হত্য করে লাশ গুলো আগুনে পুড়িয়ে কঙ্কাল করে গর্তে পুঁতে ফেলেছে। শুধু তাই নয় তারা এলাকার শত শত মা-বোনদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে এ বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ, রাজাকারদের বিচার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদের রাষ্ট্রীয় মর্যদা দেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
শিবগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বজলার রহমান সোনু জানান, শুধু মোবারকপুরেই নয় উপজেলার সমস্ত বধ্যভূমিকে সংরক্ষন, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদদের রাষ্ট্রূীয় মর্যদা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের কাছে আমাদের দাবি অব্যহত থাকবে। তবে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সেরাজুল হক কোন মন্তব্য না দিয়ে বলেন ্এগুলো আমাদের দায়িত্বের বাইরে।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। জরুরী ভিত্তিতে সকল ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।