শিবগঞ্জে বন্যার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি || ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

আপডেট: অক্টোবর ৪, ২০১৯, ১:২৯ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


আকস্মিক বন্যায় এভাবে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শিবগঞ্জের ৬ ইউনিয়নের মানুষ-সোনার দেশ

উজান থেকে বয়ে আসা পানিতে আকস্মিক বন্যায় শিবগঞ্জের পদ্মা ও পাগলা নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় ৪টি ইউনিয়নের প্রায় সম্পূর্ণ ও ২টি ইউনিয়নের আংশিক ক্ষতির পরিমান আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬ টি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মাষকলাইসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কয়েকটি পাকা রাস্তা কেটে গিয়ে যাতায়াতের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশুদ্ধ পানিসহ খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া গোবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছে সহস্রাধীক পরিবার।
শিবগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন পাকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, প্রায় ১ হাজার পরিবার পানির নিচে, আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সবগুলো রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কিছু কিছু রাস্তা কেটে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যাতায়াত। প্রায় ৩ শ হেক্টর জমির মাষকলাই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ৩ শ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে এবং সাড়ে ৩ হাজার পরিবারের তালিকা দেয়া হয়েছে।
দূর্লভপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রাজিব রাজু বলেন, আমার ইউনিয়নে ৭,৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দেড় হাজার পরিবারের বাড়ি ঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে ও ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৯শ হেক্টর জমির। তারমধ্যে মাষকলাই ১৩৭০ হেক্টর, কলা ২৫ হেক্টর, বরই ২৫ হেক্টর, হলুদ ২৫ হেক্টর, সবজি ৬৬ হেক্টরসহ অন্যান্য ফসল মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৯ শ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার চাহিদা দেয়া হয়েছে।
মনাকষা ইউপি সচিব জানান, মনাকষা ইউনিয়নে ৬টি ওয়ার্ডের সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এাছাড়া প্রায় ৪০ হেক্টর জমির মাষকলাইসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে আড়াই মেট্রিকটন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংশ্লিষ্ট অফিসে দেয়া হয়েছে।
ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুল হক জানান, আমার ইউনিয়নে প্রায় ২ শ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। প্রায় ২৫ হেক্টর জমির মাষকলাই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ত্রাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন জানান, ৩শ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০টি পরিবারকে ত্রাণ দেয়া হয়েছে এবং আরো চাহিদা দেয়া হয়েছে।
উজিরপুর ইউনিয়নের বেশীর ভাগ মানুষ পূর্বে নদী ভাঙনের কারণে অন্য স্থানে বসবাস করছে যারা বর্তমানে আছে তারা প্রায় পানিবন্দি হয়েছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে প্রচুর।
তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল ইসলাম বলেন, বুধবার হতে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পদ্মা নদীতে ২২.২৩ সেন্টিমিটার ও পাগলা নদীতে ২০.২৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিপদ সীমার ১২ সেন্টিমিটার নিজ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে দু একদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানান।
শিবগঞ্জ উপজেলা পরিকল্পনা অফিসার আরিফুল ইসলাম জানান, সার্বক্ষনিক পানি বন্দী জনগণকে সেবায় নিয়োজিত রয়েছি। শিবগঞ্জ উপজেলায় এ পর্যন্ত ৮ হাজার পরিবার পানি বন্দী হয়েছে। ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উপজেলা সহকারী শ্ক্ষিা অফিসার আবদুল মান্নান বলেন, এপর্যন্ত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা না করলে ২২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যেতে না পারায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার আরিফুল ইসলাম জানান, এপর্যন্ত ৫২ মেট্রিক টন চাল ও অন্যান্য শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এপর্যন্ত আড়াই হাজার হেক্টর জমির মাষকলাই, ২৩০ হেক্টর জমির সবজি ও ৯৩ হেক্টর জমির হলুদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কিন্তু শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুজ্জামান জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩ হাজার ৯ শ হেক্টর জমির মাষকলাই, ২শ ৪৫ হেক্টর জমির সবজি, ৯৫ হেক্টর জমির হলুদ, ৫৭ হেক্টর জমির কলা ও ৩৫ হেক্টর বর ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা ত্রাণ কমিটির সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। সমস্ত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে আরো ত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য ডাক্তার সামিল উদ্দিন আহমদ শিমুল বলেন, আমি ইতোমধ্যে শিবগঞ্জের বন্যা ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি। গত দুদিনে পরিবার প্রতি ১০ কেজি করে ৫২ মেট্রিক টন চাল, ৩হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের মাঝে ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যেহেতু আমি নিজেই একজন ডাক্তার, সেহেতু বন্যা কবলিত মানুষের সেবা নিজেই করবো। এছাড়া বন্যা কবলিত মানুষের জন্য সব ধরনের সাহায্য দেয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ