শিবগঞ্জে শারদীয় দূর্গাপূজার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে দলিত ও হরিজনের ২১ শ পরিবার

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯, ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


শিবগঞ্জের চৌকা মনাকষা গ্রামের দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুরা-সোনার দেশ

সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা উপযাপন নিয়ে আর্থিক সংকটের কারণে শিবগঞ্জে দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ২ হাজার একশটি পরিবার হতাশার ভুগছে। এসব পরিবারের মধ্যে কোন উৎসাহ ও আনন্দ নেই।
সরজমিনে শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সম্প্রদায়গুলির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের পেশাগত কাজ না থাকায় উপার্জন প্রায় বন্ধ হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। জানা গেছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মোট ভোটার সংখ্যা হলো প্রায় ৩০ হাজার ও লোক সংখ্যা হলো প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। তার মধ্যে দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো অসহায় ও নিঃস্ব ।
একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী শিবগঞ্জের দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ১শটি পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে ধোপা ৪০০, নাপিত ৪০০, রবিদাস(মুচি) ৮০০, হরিজন(ডোম ও মেথর) ৫০টি ও বেদেসহ অন্যান্য আরো ৫০টি পরিবার রয়েছে।
মনাকষা ইউনিয়নের চৌকা মনাকষা গ্রামের রবিদাস সম্প্রদায়ের দিলীপ রবিদাসের মেনকা রানী বলেন, আমার পরিবারে স্বামী বার্ধক্য জনিত কারণে অক্ষম, জমিজমা নেই। নিজে ভিক্ষাবৃত্তি করে ৫সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। মাত্র কয়েকদিন পর আমাদের ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা। এ পর্যন্ত পূজা উপলক্ষে কোন নতুন জামা কাপড়, ভাল খাবারসহ পূজার উপকরণ সংগ্রহের জন্য কোন কিছু করতে পারিনি। তাই পূজা আমাদের জন্য আনন্দের না হয়ে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পারচৌকা গ্রামের নিম্নবৃত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের শম্ভু মন্ডলের রানী জানান, আমার স্বামী অল্প পুঁজিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে শঙ্কবালা বিক্রীর ব্যবসা করতো। বর্তমানে পুঁজির অভাবে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর্থিক সংকটের কারণে ৭ সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। সামনে পূজা নিয়ে ভীষণ চিন্তার মধ্যে আছি।
কানসাট ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বিভীষণ রবিদাস, শিবগঞ্জ পৌরসভার বাগানটুলী গ্রামের ফড়িং রবিদাস ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের ছত্রাজিতপুর গ্রামের জয়চাঁদ কর্মকার, দূর্লভপুর ইউনিয়নের দূর্লভপুর গ্রামের অমল চন্দ্র প্রমানিক, শাহাবাজপুর ইউনিয়নের তেলকুপি গ্রামের অচর্না রানী, পাকা ইউনিয়নের দয়াল সাহা, উজিরপুর ইউনিয়নের প্রশান্ত কুমার, বিনোদপুর ইউনিয়নের লছমনপুর গ্রামের সবিতা রানীসহ প্রত্যন্তাঞ্চলের দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে। তারা জানান পূর্বে পূজা উপলক্ষে কোন সহযোগিতা পাননি। তবে দূর্গা প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে ও মন্দির উন্নয়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতর ও নেতারা অনুদান দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের জন্য কোন অনুদান এপর্যন্ত আসেনি। তাদের দাবি, পূজা উদযাপনের জন্য আমাদের মত দরিদ্র পরিবারে জন্য পর্যাপ্ত পরিমান অনুদান দেয়া হোক এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
বিডিআরএম এর শিবগঞ্জ উপজেলার শাখার সভাপতি নিবারণ রবিদাস এ সব পরিবারের হতাশা ও অসাহয়তের কথা স্বীকার করে বলেন, তারা যেন সঠিকভাবে পূজা উদযাপন করতে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমানে অনুদানের জন্য সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। হিন্দু ধর্মের উপজেলা পূর্জা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমল ত্রিবেদী বলেন, শিবগঞ্জে প্রায় ৯ হাজার দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দু মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের জন্য শারদীয় দূর্গা পূজা উপলক্ষে অনুদানের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস বলেন, সমাজ সেবা দফতর থেকে এ ব্যাপারে কোন সহযোগিতা করার সুযোগ নেই। তবে সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের অনুদান পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং আমি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধূরী রওশন ইসলাম ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ধর্মীয় উৎসব পালন সাধারণত নিজ নিজ উদ্যোগে হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কেউ কোন লিখিত বা মৌখিকভাবে আবেদন করেনি। তবুও একেবারে অসহায় পরিবারের জন্য আমরা অনুদান দেয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, আ’লীগ সরকার সংখ্যা লঘুদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারাই ধারাবাহিকতায় শিবগঞ্জ উপজেলাতে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। তিনি অরো বলেন, দলিত, হরিজন ও নিম্নবৃত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের অসহায় ও নিঃস্ব পরিবারগুলো যেন সঠিক ভাবে তাদের ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব সঠিকভাবে উদযাপন করে আনন্দ করতে পারে, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।