শিশু শ্রম নয় শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়

আপডেট: জুন ১২, ২০১৯, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি


একটি লেদ কারখানায় এক কর্মরত শিশু শ্রমিক সোনার দেশ

“ শিশু শ্রম নয় শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময় ” এই শ্লোগানকে সমনে রেখে পালিত হচ্ছে বিশ^ শিশু শ্রম দিবস। লফস রাজশাহী অঞ্চলে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে সংগঠনটি। বিশ^ শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, বিশে^র প্রতিটি দেশে শিশু শ্রমের মতো অমানবিক ঘটনা খুবই সাধারণ বিষয়ে পরিনত হয়েছে। শিশুরা কখনও মজুরীর কখনও বা মজুরীবিহীনভাবে কাজ করে থাকে তারা। শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুরা শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। শিশু নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের বঞ্চনার কথা অনেক ক্ষেত্রে লোক চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারবিহীন হয়ে ঝুকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে। শিশু অধিকার শব্দটির সাথে রাষ্ট্রদ্বারা স্বীকৃত সকল ধরনের অধিকার তার সাংবিধানিক অধিকার। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শিশুরা সাংবিধানিক সকল অধিকার পাওয়ার অধিকার রাখে। শিশু শ্রম প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকে সমষ্টি, বেসরকারী পর্যায় থেকে সরকারী, রাষ্ট্রীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ব্যতিত শিশু শ্রমের মতো অভিশাপ দুর করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ জাতীয় শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করানো হলে তা শিশু শ্রম হিসেবে গন্য হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেশে শিশু শ্রম ও শিশু শ্রমিকের যে চিত্র উঠে এসেছে তা খুবই উদ্বেগ ও হতাশ জনক। জাতিসংঘের শ্রম বিষয়ক সংস্থা আইএলও এর সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশে^ ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ শিশু নানা ভাবে শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এদের অর্ধেক প্রায় ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত জাতীয় শিশু শ্রম জরিপের তথ্য মতে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৩৪ লক্ষ শিশু নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১২ লক্ষ ৮০ হাজার শিশুই ঝুকিঁপূর্ন শ্রমে জড়িত।
লফস বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যাক্তিবর্গ ও সরেজমিন আলাপের মাধ্যমে রাজশাহী শহরে শিশু শ্রমের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করে। লফস এর তথ্য মতে নগরীর শিশু শ্রম এর অবস্থান তুলে ধরা হলো। হোটেল, রেস্তরা ও চা ষ্টলে শিশুশ্রম শতকরা ২৫ জন, রেস্তরায়-শতকরা ৪০ জন, চা ষ্টলে শতকরা ৫০ জন শিশু শ্রমে নিয়েজিত। পরিবহণ হিউম্যান হলার-শতকরা ৫০ জন, অটোবাইক শতকরা ১৫ জন, আন্ত:জেলা বাস শতকরা ৩০ জন, রিক্সা ভ্যানে শতকরা ২০ জন শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ওয়ার্কসপ, কারখানা ও ভাংরী কাজে নিয়োজিত শতকরা ৫০ জন, কারখানায় শতকরা ২০ জন, ভাংরী কাজে শতকরা ৬০ জন শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের নিয়ে একটি গবেষনা করে। বিএসএএফ এর সহায়তায় রাজশাহীতে ১৮০ টি বাসায় গৃহ কর্মে নিয়োজিত শিশুদের উপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। প্রাপ্ত জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় গৃহকর্মে নিয়োজিত ১৮০ জন শিশুর ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ শারীরিক এবং ৫৭ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার। ১৮ শতাংশ শিশু গৃহশ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার। এদের কেউ হোটেল রেষ্টুরেন্টে কেউ ফ্যাক্টরী ওয়ার্কশপে কেউবা বাসা-বাড়িতে কাজ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা না বুঝে অথবা বাধ্যহয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত হয়ে পড়ে। কখনো কাজ না পেয়ে কেউ আবার টাকাই এ পরিনত হয়। পিতা-মাতা স্বল্প শিক্ষা ও অসচেতনতার কারনে তারা শিক্ষাকে একটি অলাভজনক কান্ড মনে করে। সন্তানদের ১০-১৫ বৎসর ধরে লেখা পড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়ার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে পরিবার। বাংলাদেশের শিশু শ্রমের অভিশপ্ত দিক হচ্ছে শহর জীবনের গৃহস্তালির বাসায় কাজের লোকের উপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতা। গতানুগতিক সংস্কৃতিক কারনে গ্রামে লেখা পড়ায় মগ্ন শিশুটিকেও নিয়ে আসা হয় শহরে বাসায় কাজের জন্যে। এক শ্রেনীর প্রতারক কর্মের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুকে শহরে থেকে বিদেশে পাঁচার করে। এভাবে পাঁচার হওয়া মেয়ে শিশুদের পতিতাবৃত্তি ও পর্ণোগ্রাফী এবং ছেলে শিশুদের বিভিন্ন অসামাজিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শ্রমজীবি শিশুদের কর্মপরিবেশের অবস্থা তুলে ধরে কর্মপরিবেশ সুনিশ্চিতের উপর জোর দাবী জানিয়ে কর্মস্থলে অসর্তকতামূলক কাজগুলো চিহ্নিত করে দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ কর্মঘন্টার অতিরিক্ত সময় কাজ করানো ও শিশুর শারীরিক এবং মানসিক ও সামাজিক অবস্থার উপর অন্যায় ভাবে চাপ সৃষ্টি করা, নিরাপত্তাহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা, বিনা মজুরী, অনিয়মিত মজুরী, স্বল্প মজুরীতে কাজ করানো, সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করানো, ব্যক্তি মর্যাদাকে হেয় করে দাসের মতো কাজ করতে বাধ্য করা, নির্যাতন বা যৌন হয়রানী করা, বিনোদনের কোন সুযোগ না দেওয়া। শিশু অধিকার ফোরামের নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহানাজ পারভীন জানান, শিশুশ্রম বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারী বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা, শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত হতে না হয় এমন পরিবেশ তৈরী করা, কর্মরত শিশুদের জীবনকে পরবর্তী সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষার সুব্যবস্থা করা, গ্রাম থেকে শিশুদের শহরে অভিবাসন রোধ করা, শিশুদের কর্ম পরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে শিশুদের জীবনের ঝুঁকি কমানো, শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে নিরাপদে রাখা, কর্মঘন্টা, মজুরীসহ সকল নায্য অধিকার নিশ্চিত করা, শিশু পাচার রোধ করার মাধ্যমে আমাদের মতো দেশে শিশু শ্রম একবারে বন্ধ না করা গেলেও ঝুকিঁপূর্ন শ্রম থেকে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম শিশুদেও রক্ষা করা সম্ভব। তাই শিশুদের প্রতি মানবিক হতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ