শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ-এর ৬২তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০১৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

হাবিবুর রহমান স্বপন
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ দাশের (ডাক নাম ‘মিলু’) জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরে (উল্লেখ্য, একই বছর ২৪ মে’ কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন)। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ ছিলেন, বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশাল কালেক্টরেটের কর্মচারি। তার আদি নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুর পরগণায়। চাকরির কারণেই জীবনানন্দের পিতামহ বরিশাল শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তার পূর্ব পুরুষের উপাধি গুপ্ত অংশ বাদ দিয়ে দাশ লিখতে শুরু করেন। সর্বানন্দ দাশের দ্বিতীয় পুত্র সত্যানন্দের প্রথম সন্তান জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দের অপর ভাই অশোকানন্দ এবং বোন সুচরিতা দাশ। জীবনানন্দের মা কবি কুসুম কুমারী দেবী ছিলেন বরিশালের গৈলা গ্রামের সুরসিক চন্দ্রনাথ দাশ ও ধনমণি দাশ এর কন্যা। হাসির গান রচনা করার জন্য চন্দ্রনাথ দাশকে সুরশিক বলা হতো।


কলকাতার বেথুন স্কুলের ছাত্রী  জীবননান্দ দাশের মা কুসুম কুমারী দেবী রচিত কালজয়ী কবিতা ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে’। কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রবন্ধ লিখতেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ ও ‘মুকুল’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। এছাড়াও জীবননান্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ সম্পাদিত ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় লিখতেন। সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন আদর্শ সম্পাদক। তিনি পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতেন। ‘নারীত্বের আদর্শ’ প্রবন্ধ লিখে কুসুম কুমারী দেবী স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ মারা যান ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এবং মায়ের মৃত্যু হয় ১৯৪৮ এর ২৫ ডিসেম্বর।
আদর্শনিষ্ঠ বাবা-মা’র গভীর প্রভাব পড়েছিল জীবনানন্দের জীবনে। তিনি বড় হয়ে ওঠেন একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিম-লে। ২০ বছর বয়সে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ দাশ প্রথম কবিতা রচনা করেন ‘বর্ষা আবাহন’। খেলাধূলা, বাগান করা এবং সঁতারের অভ্যাস ছিল তার।
জীবনানন্দ দাশ বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজ থেকে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে দ্বিতীয় বিভাগে এমএ পাশ করেন। পরীক্ষার আগে তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন হেতু ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। এর পর আইন শাস্ত্র পড়ার জন্য ভর্তি হন। কিছু দিন পড়ার পর বাদ দেন। এ বছরই তিনি কলকাতার সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েকমাস চাকুরি করার পর সিটি কলেজে সরস্বতী পূজাকেকেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কলেজটিতে ছাত্র সংকট দেখা দেয়। তখন কিছু শিক্ষক ছাঁটাই করা হয়। ছাঁটাইয়ে প্রথমেই বাদ পড়েন নতুন বা জুনিয়র শিক্ষক জীবনানন্দ দাশ। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর জীবনানন্দ দাশ ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণে’ শিরোনামে কবিতা রচনা করেন যা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৯ তিনি চলে আসেন বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে। এখানে মাত্র ৩ মাস অধ্যাপনা করার পর দিল্লির রামযশ কলেজে যোগ দেন। ১৯৩০ এর ৯ মে খুলনা জেলার সেনহাটির রোহিনীকুমার গুপ্ত ও সরযূবালার কন্যা শ্রীমতী লাবণ্য ওরফে পটু’র সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরিতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর ১৯৪৭ এর শেষভাগে তিনি সপরিবারে কলকতায় চলে যান।
রবীন্দ্র যুগে তাকে ছাড়িয়ে যে একজন নতুন কবির আবির্ভাব হচ্ছে তার জানান দেন জীবনানন্দ দাশ তার বনলতা সেন কবিতা রচনা করে। জীবনানন্দ দাশ তখন থাকেন বরিশালে। তিনি লিখে পাঠিয়েছেন, একটি কবিতা ‘বনলতা সেন’। সেটি প্রকাশিত হলো  ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘কবিতা’র প্রথম বছরের দ্বিতীয় সংখ্যায় (পৌষ) কবিতাটি পাঠ করে পাঠক সম্প্রদায় মেনে নিলেনÑহ্যাঁ, যুগান্তর ঘটেছে, বাংলা কবিতা অবশেষে উত্তর-রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতায় উপনীত। যেসব কবি প্রতি সন্ধ্যায় বুদ্ধদেব বসুর রাসবিহারী আ্যভেনিউয়ের বাড়িতে চতুরালির দীপ্তি ছড়িয়ে আড্ডায় মশগুল হতেন, তাঁরা ‘বনলতা সেন’ পড়ে বিস্মিত হলেন। কবিতাটি নিকষ নির্জন মফস্বল থেকে ডাকযোগে লিখে পাঠিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ।
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমূদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু’দ- শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
বঞ্চনা-দারিদ্র্যই ছিল যেন কবির নিয়তি। কিন্তু কবি হিসেবে তার স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তার মূলে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে ‘বনলতা সেন’ কবিতা। অন্যদিকে জীবদ্দশায় যে একমাত্র পুরস্কার জীবনানন্দ দাশ পেয়েছিলেন, সেটিও ‘বনলতা সেন’-এর জন্যেই। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে ১৯৫২-এর শ্রেষ্ঠ কাব্য হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়।
জীবনানন্দ দাশের ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেব বসুকে লেখা চিঠিতে মন্তব্য করেন কবিতাটি ‘চিত্ররূপময়’। এতেই প্রতীয়মান হয় জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্র যুগেও প্রথম কাতারের কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
জীবনানন্দ দাশ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক। তাকে বাংলাভাষার ‘শুদ্ধতম কবি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম। জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে জনপ্রিয়তা পান। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ নিবন্ধ রচনাও প্রকাশ করেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ২১ টি উপন্যাস এবং ১০৮ টি ছোট গল্প রচনা করেন। যা তার জীবদ্দশায় প্রকাশ পায়নি। এখনও তা প্রকাশিত হচ্ছে।
জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ‘দৈনিক স্বরাজ’ পত্রিকার রোববারের সাহিত্য পাতার সম্পাদনা করতেন। কাজী নজরুল ইসলামের প্রশংসাসূচক একটি প্রবন্ধ রচনা করে তা তিনি উক্ত পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ  হন পত্রিকার মালিক পক্ষ। জীবনানন্দ দাশকে ছাঁটাই করা হয়। ভারত- পাকিস্তান বিভক্তির অব্যবহিত পূর্বে তিনি বরিশাল এসেছিলেন। এই সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে যান এবং ওসখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর  তার রচনার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ ওঠে। ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় উক্ত কাব্য গ্রন্থ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এসময় তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। বেশ কিছুদিন  তিনি সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে থাকেন।  এর পর জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘ধুসর পা-ুলিপি’ প্রকাশের পর সাহিত্যবোদ্ধা মহলে ব্যাপক সাড়া পরে যায়। এতে তার স্বকীয় কাব্য কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি প্রাবন্ধিক হিসেবে তেমন পরিচিতি লাভ করেননি। তবে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ আলোচনা লিখেছেন যার প্রতিটি অত্যন্ত মৌলিক চিন্তা ভাবনার স্বাক্ষর বহন করে। তার মৃত্যুর পর বহু অপ্রকাশিত প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
অসাধারণ প্রতিভাবান এই বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতায় ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। প্রায় এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে যান। তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় তার চিকিৎসা করেন। কিন্তু মাথায় আঘাতজনিত গুরুতর আহত জীবনানন্দ দাশকে বাঁচানো যায়নি। ১৯৫৪-এর ২২ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স