শুল্ক বাড়ায় আমদানির মোবাইল ফোনে দাম হবে প্রায় দ্বিগুণ

আপডেট: জুন ২০, ২০১৯, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বাজেট ঘোষণায় স্মার্টফোনে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া এর সঙ্গে অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) ৫ শতাংশ ও উন্নয়ন কর (গবেষণা ও উন্নয়ন) ৩ শতাংশ ধার্য করায় ভ্যাট, অগ্রিম কর, সারচার্জ ইত্যাদি মিলিয়ে স্মার্টফোন আমদানিতে কর দিতে হবে ৫৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। মোট করের সঙ্গে আরও যুক্ত হবে আমদানিকারকের বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়, অবকাঠামোগত খরচ ও মুনাফা। সব মিলিয়ে এই দাম বাড়বে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশের মতো। আর এসব কারণে ১০ হাজার টাকা দামের আমদানিকৃত একটি মোবাইল ফোন গ্রাহককে কিনতে হবে প্রায় ২০ হাজার টাকায়! আর ২০ হাজার টাকার ফোন কিনতে হবে প্রায় ৪০ হাজার টাকায়!
অন্যদিকে ফিচার ফোনে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বহাল থাকলেও মোট আমদানি শুল্ক দিতে হবে ৩৪ শতাংশ। ফিচার ফোনও ক্রেতাদের বাড়তি দামে কিনতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর দেশে মোবাইল আমদানি হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ পিস। এর বেশিরভাগই ফিচার ফোন। স্মার্টফোনের সংখ্যা মোট আমদানি হওয়া ফোনের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। আর অবৈধ পথে দেশে এসেছে এক কোটিরও বেশি মোবাইল ফোন। অবৈধ পথে আসা ফোনের সংখ্যা আমদানি হওয়া মোট ফোনের বাইরেই থেকে যায়, যা থেকে সরকার রাজস্ব পায় না।
দেশের অন্তত ৫ জন মোবাইল ফোন আমদানিকারক এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, স্মার্টফোনে সরকারের নতুন শুল্ক আরোপ এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ক্রেতাদের মোবাইল ফোন কিনতে হবে বেশি দামে। সরকারের শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তে দেশে মোবাইল ফোনের প্রবৃদ্ধি কমবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, সরকারের রাজস্ব আয়ও কমবে। গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আরও উৎসাহিত হবে। তারা অবৈধ পথেই ফোন আনতে বেশি উৎসাহী হবে বেশি লাভের আশায়।
তারা আরও বলছেন, গ্রে মার্কেটের আকার বড় হয়ে যাওয়ায় ২০১৮ সালে সরকার এই খাত থেকে ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। তাদের আশঙ্কা করছেন, সরকার এখন যে হারে স্মার্ট ফোনে শুল্ক নির্ধারণ করেছে তাতে এই বছরে রাজস্ব হারানোর পরিমাণ হবে এক হাজার কোটি টাকার মতো।
আমদানিকারকদের পর্যবেক্ষণ, এই খাতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। স্মার্টফোনের দাম বেড়ে গেলে তা বিক্রিতে প্রভাব ফেলবে। বিক্রি কমে গেলে তা কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের দাবি, নতুন ব্র্যান্ডগুলোকে দেশে মোবাইল কারখানা স্থাপনে আরও অন্তত দুই বছর সময় দেওয়া হোক। এই সময়ের মধ্যে ব্র্যান্ডগুলো দেশে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা ও বাজার তৈরি করে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।
আমদানিকারকরা মনে করেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে দেশে অবৈধ পথে মোবাইলের প্রবেশ বাড়বে। এতে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হতে পারে। অন্যদিকে, সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। বর্ধিত কর আরোপের ফলে আমদানিও কমবে। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোও মোটা অঙ্কের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে বলে তাদের দাবি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমরা আমদানি নির্ভর জাতি হয়ে থাকতে চাই না। আমরা উৎপাদক হতে চাই। ফলে আমাদের এমন সিদ্ধান্তে আসতেই হতো।’
মন্ত্রী জানান, দেশে এরইমধ্যে ৫টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফোন তৈরি করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি মোবাইল ফোন দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করছে। তারা কারখানা চালুর ৬ মাসের মধ্যে এই অবস্থানে চলে এসেছে। ফলে এখনই দেশীয় উৎপাদকদের ওপর আস্থা হারাতে চাই না।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মোবাইলে শুল্ক বাড়লে গ্রে মার্কেট বাড়ার যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে সেটা হতে দেওয়া হবে না। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমাদের আইএমইআই ডাটাবেজ তৈরি হয়ে গেলে অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করা মোবাইল চালু করা সম্ভব হবে না। ফলে এই মার্কেট বড় হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। তিনি জানান,এরইমধ্যে ৪ কোটি মোবাইলের আইএমইআই ডাটাবেজে যুক্ত করা হয়েছে। ২-১ মাসের মধ্যে আরও ২ থেকে ৩ কোটি আইএমইআই নম্বর ডাটাবেজে যুক্ত হবে।
বিএমপিআইএ (বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন)-এর কোনও শীর্ষ নেতা দেশে না থাকায় তাদের মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংগঠনটির একজন পরিচালক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শীর্ষনেতারা দেশে না থাকায় এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। নেতারা দেশে ফিরলে সবার সম্মিলিত মতামত জানানো হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজেটের প্রভাব এখনও স্মার্টফোন মার্কেটে পড়েনি। আগের দামেই স্মার্টফোন বিক্রি হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পরে এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দর থেকে মোবাইল ফোন ছাড় করেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিমানবন্দরে ছাড়ের অপেক্ষায় আছে হুয়াওয়ে, শাওমি, অপো, ভিভো, মটোরোলা ও টেকনো মোবাইল। ওই সূত্র আরও জানায়, এগুলোর মধ্যে একটি ব্র্যান্ডের কর্মকর্তারা বিমানবন্দর থেকে মোবাইল ছাড় করাতে গেলে তাদের কাছে বাড়তি শুল্ক চাওয়া হয়। বাজেট পাস হওয়ার আগেই বাড়তি শুল্ক কার্যকর হওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠান মোবাইল ছাড় করেনি।
জানতে চাইলে ট্রানশান বাংলাদেশের (টেকনো ও আইটেল মোবাইলের আমদানিকারক) প্রধান নির্বাহী রেজওয়ানুল হক বলেন, স্থানীয় উৎপাদকদের উৎসাহ দিতে এ ধরনের কাজ করতে হয়। কিন্তু যে পরিমাণ কর আরোপ করা হয়েছে, তা গ্রে মার্কেটকে উৎসাহী করবে। গ্রে মার্কেট কমাতে না পারলে উদ্যোগটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি মনে করেন, আমদানিকারকদের আরও অন্তত দুই বছর সময় দেওয়া উচিত ছিল।
শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত বছর শাওমি বাংলাদেশে এসেছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাশ্রয়ী ও অনেস্ট প্রাইসে গ্রাহকদের জন্য উন্নতমানের পণ্য আনতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের শাওমি ভক্তদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে আসার প্রতি আমরা বিশ্বাসী। এই আমদানি কর আরোপ করা হলে বাজারে স্মার্টফোন আমদানির পাশাপাশি অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের উচ্চ করের ফলে অনেস্ট প্রাইসে উন্নতমানের প্রযুক্তি নিয়ে আসা কঠিন হবে এবং এতে গ্রাহকদের বেছে নেওয়ার সুযোগ কমে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ, যেটি বর্তমানে তার ডিজিটাল পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন হলে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হতে পারে।
দেশে মোটোরোলা মোবাইল ফোনের ন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউটর স্মার্ট টেকনোলজিসের টেলিকম বিভাগের পরিচালক শাকিব আরাফাত রনি বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে (শুল্ক বৃদ্ধি) দেশে মোবাইল ফোনের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ উদ্যোগও পেছাবে, সরকারের রাজস্ব আয় কমবে বিপুল পরিমাণে এবং গ্রে মার্কেটের আকার আরও বড় হবে।
তিনি মনে করেন, শুল্ক এখনই না বাড়িয়ে আমদানিকারকদের আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন। সময় পেলে মোটোরোলাসহ আমদানি হওয়া মোবাইল নির্মাতাদের বুঝিয়ে এ দেশে কারখানা তৈরির বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব হবে। তাদের কাছে সুবিধার কথা তুলে ধরা যাবে। কোনও দেশে কোনও কোম্পানি পণ্য নিয়ে গেলে নির্মাতারা সে দেশে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডটির বাজার উপস্থিতি ও আকারকে বড় চোখে দেখে। এসবের জন্য সময় প্রয়োজন।
নকিয়া এইচএমডি বাংলাদেশের হেড অব বিজনেস ফারহার রশীদ বলেন, আমরা এখনও দেশে আমদানি করেই ব্যবসা করছি। নকিয়া পুরোপুরি আমদানি নির্ভর একটি ব্র্যান্ড। নতুন আরোপিত করের ফলে স্মার্টফোনের দাম অনেক বাড়বে। ফলে ক্রেতাদের বেশি দামে মোবাইল কিনতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ মোবাইল উৎপাদন হয়। ৭০ শতাংশ মোবাইল আমদানি করে মোবাইলের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ফলে এখনও আমাদের আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমরা মনে করি, আমদানিকারকদের কারখানা স্থাপনের জন্য আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন। মোবাইলের মান ঠিক এবং দেশে চাহিদা তৈরি করতে পারলে বড় মার্কেট শেয়ার তৈরি হবে। এসব হলেই কেবল কোনও নির্মাতা এখানে কারখানা তৈরি করতে আগ্রহী হবেন।-বাংলা ট্রিবিউন