সংশপ্তক পুরুষ শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৯, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

মো. আরিফুল ইসলাম


এক.
বাঙালির ইতিহাস এক দীর্ঘ পরাধীনতার ইতিহাস। কেবল দীর্ঘ নয় প্রায় বিধিলিপির মতো নিষ্কৃতিহীন আমাদের এ পরাধীনতা। ইতিহাসের কোন পর্বে আমাদের স্বশাসনের নজির নেই। কখনো এদেশে চলেছে পালদের শাসন, কখনো সেনদের, কখনো মোঘলদের, কখনো পাঠানদের, কখনো ব্রিটিশদের, কখনো পাকিস্তানিদের। সবযুগেই অন্যেরা এ দেশকে অধিকার করেছে, শাসন করেছে, শোষণ করেছে। করেছে ভোগদখল ও লুটপাট। তারাই ছিল আমাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা। নিজেদের ভাগ্য কখনই আমরা নিজেরা নির্ধারণ করার সুযোগ পাইনি। বেশিরভাগ সময়ই আমাদের আক্রান্ত হতে হয়েছে অবাঙালি পরাক্রান্ত রাজবংশ দ্বারা। এখানে রাজত্ব করেছে খরগ, বর্মণ, কম্বোজ রাজবংশ; এখানে রাজত্ব করেছে হাবসি, তুর্কি ও আফগানরা। পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা ছিলাম আমরা বহুকাল। ফলে আমাদেরকে অন্যায়, অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে দীর্ঘদিন। আমরা ছিলাম নিজভূমে পরবাসী। তবে এই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার চেষ্টা যে আমরা করিনি তা নয়Ñ এই অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি বহুবার। আমরা সবসময় মুক্তি লাভের চেষ্টা করেছি তবে সফল হতে পারিনি। আমাদের সুদীর্ঘ এই আন্দোলন-সংগ্রামে কখনো নেতৃত্ব দিয়েছে ঈশা খাঁ, কখনো সিরাজ, কখনো তিতুমীর, কখনো খুদিরাম, কখনো সূর্যসেন, কখনো বিজয়-বাদল-দিনেশ, কখনো ভাসানী-শের-ই-বাংলা-সোহরাওয়ার্দী, কখনো শেখ মুজিব। এই স¦াধীনতার পথে, মুক্তির পথে বাঁধা সৃষ্টি করেছেÑ দেশের বিরুদ্ধে, জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে কখনো মীরজাফর, কখনো মোশতাক, কখনো মোহাম্মদী বেগ, কখনো ফারুক-ডালিমের দল।
দুই.
১৯৭১ সালে ঘটেছে বাঙালির জাতীয় জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা- স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই প্রথমবারের মতো নিজেদের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার আমরা নিজেরা পেয়েছি। এই প্রথম আমরা মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে পেরেছি। আর এটা যার জন্য সম্ভব হয়েছে তিনি হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শফিকুর রহমান (২০১১:১৪২) বলেন, ‘এ বাংলায় অনেক নেতা অনেক মনীষীর জন্ম হয়েছে কিন্তু সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানী শাষক-শোষকদের বিরুদ্ধে তাঁর মতো সাহসী পুরুষ, দূরদর্শী নেতা, অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক এ বাংলায় আর কেউ জন্ম নেয়নি। পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১১ বছরই তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে, তিঁনি অন্তত দুইবার ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে আসেন। এইভাবে তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নসাধ নিজস্ব জাতি-রাষ্ট্র এনে দিয়েছিলেন। সেজন্যই তিঁনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের পরাধীনতার পরিচয়ের চির অবসান ঘটে। আমরা পাই একটি স্বাধীন দেশ, একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, লাল-সবুজের একটি পতাকা। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পুনঃজন্ম হয় আমাদের। তবে ৭১ পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যেমন বেদনার, তেমন কষ্টের। তার মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা ও ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার, ঘৃণার ও অপমানের। মানুষরূপী একদল হিংস্র ও বিকৃতমনা সেনা সদস্য কর্তৃক ১৫ই আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নং সড়কের ১০ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে এবং ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর রক্তবন্ধু জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান শহিদ হন। এ ব্যাপারে আমার সাথে হয়তোবা অনেকেই একমত হবেন যে, প্রত্যেক জাতির মধ্যেই কিছু লোক থাকে যাদের ভুলের ও অপকর্মের খেসারত দিতে হয় গোটা জাতিকে। বাঙালি জাতিও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে মীর জাফরের ষড়যন্ত্র ও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যায় খন্দকার মোশতাকের ভূমিকা তারই স্বাক্ষর বহন করে। এ ব্যাপারে আমরা স্পষ্ট ধারণা পাই আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যে। তিনি (২০১১: ৫৫) বলেন, “ভাগীরথী থেকে বুড়িগঙ্গা, পলাশী থেকে ধানমন্ডি। ১৭৫৭ থেকে ১৯৭৫ কালের যাত্রার ধ্বনি বাংলার আকাশে একই রক্তিম খেলায় তার অধ্যায় সাজিয়ে গেছে। সেই ইতিহাসে আজ একটা নাম সবচাইতে দীপ্ত ভোরের শুকতারা। তার নাম শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর মতো দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যিই বিরল।”
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে বেলাল চৌধুরী (২০১১:৮৯) বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান একটি মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন। এই মহাকাব্য জাতীয়তাবাদের। আরো নির্দিষ্টার্থে এ হচ্ছে পাকিস্তানী রাষ্ট্রকাঠামোর অঙ্গনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও পরিণতিতে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। সবাইকে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন, ছাপিয়ে উঠেছেন, কেন পারলেন, অন্যরা কেন পারলেন না? কেন পিছিয়ে গেল তারাও, যারা বৈষয়িকভাবে অধিকতর প্রতিষ্ঠিত ছিল? প্রধান কারণ সাহস। শেখ মুজিবের মত সাহস আর কারো মধ্যে দেখা যায়নি। ফাঁসির মঞ্চ থেকে তিনি একাধিকার ফিরে এসেছেন, আপোষ না করে।”
জীবনের শেষ দিনটিতেও বঙ্গবন্ধু রক্ত দিয়েছেন, কিন্তু আপোষ করেন নি। বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রবিষ্ট হয়েছিল জাতীয় চার নেতার মধ্যে তারাও রক্ত দিয়ে জীবন দিয়েছে, কিন্তু আপোষ করেন নি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর খন্দকার মোশতাক ও তার বাহিনী নানাভাবে তাদেরকে দলে ভেড়ানের চেষ্টা করেছিল, ক্ষমতার লোভ দেখিয়েছিল কিন্তু তারা আপোষ করেন নি। কারণ বঙ্গবন্ধুর সাথে এ বন্ধন তাদের রক্তের, এ মিল আত্মিক, এ সম্পর্ক প্রেমের-ভালবাসার-শ্রদ্ধার। এজন্যই হয়তোবা জাতীয় চারনেতাকে বঙ্গন্ধুর রক্তবন্ধু হিসেবে অভিহিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সাথে জাতীয় চার নেতার সম্পর্ক জনম-জনমের, চিরকালের। তারা সবসময় সহযোদ্ধা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাথে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। বেলাল চৌধুরী (২০১১:৮৭) বলেন, “সেই উপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে নব্য ঔপনিবেশিক দুরাত্মা পাকিস্তানি আমল থেকে রীতিমত মুক্তিযুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতার অমৃত সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আর তার সংগ্রামী সহযোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, আর অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের শৌর্য-বীর্য আর বীরত্বগাঁথার কল্যাণে।”
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন জাতীয় চারনেতাকে সেই রাষ্ট্রের চারটি প্রধান স্তম্ভ বলা যায়। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রধান চারটি স্তম্ভ হল : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চারটির কোনো একটিকে বাদ দিয়ে যেমন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাকে কল্পনা করা যায় না, তেমনি এই চার নেতার কোনো একজনকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণের সাথে সাথেই প্রাণ দিতে হল এই চার নেতাকে। বঙ্গবন্ধুর রক্তবন্ধু এই চার নেতার জীবনাবসান হলো নির্মমভাবে, রাতের অন্ধকারে, জেলখানার অভ্যন্তরে। বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি আস্থা ও ভরসা রাখতেন যার উপর তিনি হলেন- জাতীয় চার নেতার অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান। যিনি মুক্তি সংগ্রামের ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এজন্য বঙ্গবন্ধু সবসময় তাঁর উপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস ও আস্থা রাখতেন। তাঁর সম্পর্কে সাবরিন (২০১৭:১৮) বলেন, “এএইচএম কামারুজ্জামান বাংলায় মানুষের মুক্তি সংগ্রামে ধীরে ধীরে অনন্য উচ্চতায় ওঠে আসেন এবং সান্নিধ্য লাভ করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। কেননা বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহসিকতা ও সততার মানদণ্ডেই এএইচএম কামারুজ্জামানকে রাজনৈতিক সতীর্থ করে নিয়েছিলেন।” তার প্রমাণ পাওয়া যায়- ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মত আওয়ামীলীগের সভাপতির পদ ছেড়ে দিলেন। তিঁনি এ পদে ছিলেন ১৯৬৬ সাল থেকে। তাঁর স্থানে এলেন এএইচএম কামারুজ্জামান। তিঁনি ছিলেন তখন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিঁনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একথা বলা বাহুল্য যে, জাতীয় চার নেতার মধ্যে একমাত্র তিঁনিই আওয়ামীলীগের সভাপতি হয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সাইদ উদ্দীন আহমেদ (২০০০:৩৩২) বলেন, “বস্তুত তাঁর সততা ও দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। তাই সারা জীবন কোন নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি।”
তিন.
বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জোতিষ্কের নাম এএইচএম কামারুজ্জামান। উত্তরবঙ্গের রাজনীতির সংশপ্তক পুরুষ এএইচএম কামারুজ্জামান ১৯২৩ সালের ২৬ জুন রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার বাগাতিপারা থানার মালঞ্চী রেল স্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ডাক নাম হেনা। রাজশাহীর মানুষের কাছে তিনি সর্বজন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ‘হেনা ভাই’ নামেই সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল হামিদ মিয়া ও মাতার নাম জেবুন নেসা। তাঁর পিতামহ হাজী লাল মোহাম্মদ সরকার ছিলেন মহাত্মা-গান্ধী অনুসারী একজন স্বনামধন্য রাজনীতিক। তিঁনি ১৯৪২ সালে চট্রগ্রাম এর বিখ্যাত কলেজিয়েট স্কুল হতে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৪৪ সালে রাজশাহী কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তিঁনি ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে অর্থনীতিতে স্নাতক ও ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১ম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের নেতা। নিরহংকারী ও সাদামনের মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সকলের কাছে সমধিক পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর মত তিনিও ছিলেন দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, নির্লোভ ও জনদরদী নেতা। অপরিসীম ধৈর্য আর অসীম সাহসিকতায় তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অসাধারণ প্রবাদ পুরুষ। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অনুরাগী এবং প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান ছিলেন একাধারে একজন কবি, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সংস্কৃতিবোধসম্পন্ন রাজনীতিক। তাঁর কবি প্রতিভা ছিল অনন্য অসাধারণ। সাবরিন (২০১৭:১৮২) বলেন, “তিনি বাল্যকালে চট্টগ্রামে থাকতেই স্কুল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধকালেও মাঝে মধ্যে লিখেছেন। বিদ্রোহ ছিল তাঁর শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে যারা মানবতাকে অপমান করে। আর্তের বেদনা যাদের আহত করেনা। তাদের প্রতি ছিল তাঁর দ্রোহ ও প্রতিবাদ। বঙ্গবন্ধু যেমন ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেনÑ ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার নর-নারীর করুণ আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের ইতিহাস, যেই ইতিহাসের পটভূমিতেই কামারুজ্জামান তাঁর কবিতায় লিখেছেন:
এ দেশের মানুষের করুণ আর্তনাদ
আর আহাজারির মধ্যে দাঁড়িয়ে
যারা গড়েছে সম্পদের পাহাড়,
আভিজাত্যের সেরা ইমারত
হে বন্ধু! তাদের প্রতি আঘাত হানিবার
এইতো প্রকৃষ্ট সময়।
কবি নজরুলের মত তাঁর কবিতার মধ্যেও বিদ্রোহ ও বিপ্লবী জাগরণ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়Ñ
কেমনে ভুলিব বন্ধু তোমায়
আর কেমনে ভুলিব সেই রাত্রি
পঁচিশে মার্চের রাত্রি?
হায়েনার হুংকার অস্ত্রের ঝংকার
দাউ দাউ জ্বলে, ওঠে বারুদের আঙ্গার
প্রকম্পিত মেদিনীতে নাই কারো নিস্তার
দিশেহারা সকল যাত্রী
সেই পঁচিশে রাত্রি।”
বাংলাদেশের রাজনীতিক অঙ্গনে বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী এই মহান পুরুষ যেমন বাংলাভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির মুক্তি আকাক্সক্ষা লালন করেছিলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর একজন অন্যতম সহযোদ্ধা হিসেবে আমৃত্যু তাঁর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করেছেন। বাস্তবিকপক্ষে, ব্রিটিশ বাংলা থেকে দেশ বিভাগ পর্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের পথ ধরেই অগ্রসর হতে হতে একসময় শহিদ এএইচএম কামারুজ্জমান এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেতনায় ও আদর্শের এক বিন্দুতে স্থির হয়েছেন। পরিণত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর রক্তবন্ধুতে। একই রক্তের ধারা যেন দু’জনের শরীরে প্রবাহমান। তাঁদের যেন একই আত্মা, একই আদর্শ, একই চেতনা।
চার.
বাঙালির আত্মবিকাশ ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পুরোধা বঙ্গবন্ধুর পরেই যাদের অবস্থান তাঁদেরই একজন জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান। আদর্শিক জীবন, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালবাসা প্রভৃতি গুণের অধিকারী এই মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর ও বন্ধু হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অন্যতম নির্ধারক ও পরামর্শক ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সংকট ও উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি সিনিয়র নেতা হিসেবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, উদারতা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, অসাধারণ বাগ্মিতা প্রভৃতি গুণে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি। ফলে আদর্শ, চেতনা, ব্যক্তিগত গুণবিচার প্রভৃতি দিক থেকে বঙ্গবন্ধু ও কামারুজ্জামানকে কোনোভাবেই আলাদা করার উপায় নেই। এ সম্পর্কে সাবরিন (২০১৭:১৮৭) বলেন, “অস্বীকার করার কোন কারণ নেই, কামারুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালে প্রধানতম সংগঠক। একদিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত করে তোলা, অন্যদিকে শরণার্থী ও আর্তমানবতার সেবা করার মধ্য দিয়েই কামারুজ্জমান তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। মনে হয়েছে কোমলে কঠোরে তিনি এক ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। তিনি স্বদেশ স্বজাতির প্রতি যতই প্রেমময় ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, ঠিক তেমনি নিষ্ঠুর ও প্রতিঘাত পরায়ণ ছিলেন শত্রুশিবিরের প্রতি। যেমন রণকৌশলী, তেমনি রাজনীতি কৌশলীও ছিলেন। তবে আপোষ করে না যুদ্ধক্যাম্পে গিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করা, নতুন নতুন দলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠত করা, প্রশিক্ষণ দেয়া, অস্ত্র সরবরাহ, ত্রাণ সরবরাহ থেকে শুরু করে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের মাধ্যমে, বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আন্তজাতিক স্বীকৃতি অর্জনে তিনি ছিলেন অগ্রচারী।”
শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান বঙ্গবন্ধুর মতোই বাংলাদেশ ও বাঙালিকে ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা ছিল অকৃত্রিম, দেশপ্রেম ছিল আদর্শভিত্তিক। তাই তিনি নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ্য, সংসার-সন্তানকে নিয়ে খুব বেশি ভাবতেন না; ভাবতেন দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, দেশ সমৃদ্ধ হলে প্রত্যেক ব্যক্তিও সমৃদ্ধ হবে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালবাসার কারণে তিনি খন্দকার মোশতাকের কু প্রস্তাবকে ঘৃণা ও ধিক্কার দিয়ে মৃত্যুকে বরণের মাধ্যমে চিরকালের মহৎ জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ সম্পর্কে সাবরিন (২০১৭:১৮৮) বলেন, “তিনিও চাইলে নিজের জীবনকেই ভালবেসে শত্রুদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারতেন। আদর্শে অবিচল এবং বঙ্গবন্ধু প্রেমিক কামারুজ্জামান কখনই প্রিয় নেতার আস্থা থেকে দূরে সরে যাননি। তাঁর মর্যাদাও বঙ্গবন্ধু তাকে দিতেন ও সম্মানিত করতেন। এসব পরম্পরা থেকেই বোঝা যায় কামারুজ্জামান কেবল একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বই নন শ্রম, মেধা, সততা ও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে একটি উন্নত বাঙালি রাষ্ট্রভাবনার মণীষী হিসেবে তাঁর সুগভীর অন্তদৃষ্টি ছিলÑ তা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।”
পাঁচ.
৩রা নভেম্বর জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন, মাথা নত না করার দিন। কারাগারের অভ্যন্তরে, ঘোর অন্ধকারে কামারুজ্জামানসহ জাতীয় চার নেতা জীবন দিয়েছেন কিন্তু মাথা নত করেন নি। বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে তারা বেঈমানী করেন নি। সত্য সবসময়ই সত্য। এর কোনো রকমফের নেই, কাল বিকাল নেই। বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করার জন্য, তাঁর আদর্শকে লালন করার জন্য কিছু লোক প্রয়োজন এবং এজন্য যে জীবন দেয়া যায় এরকম ঘটনা ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু সাথে দেশরত্ন শেখ হাসিনার যেমন সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধু কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে যেমন বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তেমনি তাঁর সাথে কামারুজ্জামানসহ জাতীয় চার নেতাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই সম্পর্ক আদর্শের, প্রেমের, ভালবাসার। বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতা ইতিহাসে অমর হয়েছেন। ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন উত্তরবঙ্গের বরপুত্র, বাংলার নক্ষত্র পুরুষ শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান। তিনি বাংলা মায়ের এক অকুতোভয় সন্তান। জন্ম-মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে আবহমান বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল শ্রদ্ধার-ভালবাসার মানুষ হয়ে থাকবেন বরেন্দ্র ভূমির সন্তান আমাদের এই প্রিয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা ভাই। মানুষ মরে যায়। কিন্তু তাঁর আদর্শ বেঁচে থাকে প্রজন্ম হতে প্রজন্মে। তাই বাংলাদেশ ও বাঙালির মধ্যেই বেঁচে থাকবে মৃত্যুঞ্জয়ী কামারুজ্জামানের আদর্শ। তাঁর দেশপ্রেম। তাঁর মহৎকর্ম। মহাপ্রয়াণের এই মাসে বরেন্দ্র বন্ধু, অমর এই সংশপ্তক পুরুষের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর শোক ও সমবেদনা।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সদস্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, রাজশাহী মহানগর।