সফটওয়্যার রফতানির আয় আসলে কত?

আপডেট: মার্চ ১, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সরকারি হিসাবে গত বছর ৮শ’ মিলিয়ন (৮০ কোটি) ডলারের সফটওয়্যার রফতানি করেছে বাংলাদেশ। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ এক বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই টার্গেট কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সফটওয়্যার রফতানি করে যে পরিমাণ আয়ের কথা বলা হয় তার তথ্য কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক, বাকিটা (বড় অংশ) আনুমাননির্ভর। প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুমানিক ধারণার যোগফলে ‘রফতানির পরিমাণ’ নিয়ে তাই বরাবরই সন্দেহ থেকে গেছে।
তবে সফটওয়্যার নির্মাতাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সফটওয়্যার ও সেবা পণ্যের রফতানি আয় নিয়ে একটি জরিপ বা গবেষণা করতে যাচ্ছে। এতে দেশ থেকে আসলেই কত টাকার সফটওয়্যার বা সেবাপণ্য রফতানি হয় সেই হিসাব বের হয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সরকারের টার্গেট ২০১৮ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন এবং ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রফতানি করা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারসহ বিভিন্ন পক্ষের ঘোষিত ৮০০ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। কারণ, এই ঘোষণার সঙ্গে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবের বিশাল ফারাক। ফলে অনেকেই বিষয়টি ঠিক বিশ্বাস করতে চান না। আর এসব বিবেচনায় নিয়েই বেসিস আনুষ্ঠানিক জরিপ বা গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে।
জানতে চাইলে বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইপিবি যে হিসাব দেয় তার বাইরে ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ডেভেলপার ও কল সেন্টারগুলোর সেবা রফতানি আয়ের সঙ্গে যুক্ত করে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কথা বলা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইনফরমাল সার্ভে রয়েছে। তাতে দেখা যায় সফটওয়্যার ও সেবাপণ্যের রফতানির পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন ডলার। তবে আমরা এবার একটি ফরমাল সার্ভে (আনুষ্ঠানিক জরিপ) করতে যাচ্ছি। ওই সার্ভের রিপোর্ট পেলেই আমরা সবাইকে জানাতে পারবো আমাদের রফতানির পরিমাণ কত। শিগগিরই টেন্ডারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়ে সার্ভের দায়িত্ব দেওয়া হবে।’
সূত্রে জানা গেছে, চলমান ‘বেসিস সফটএক্সপো-২০১৮’ শেষ হওয়ার পরে আনুষ্ঠানিক জরিপের কাজ শুরু হতে পারে।
ইবিপি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) দেশ থেকে সফটওয়্যার রফতানি (তথ্যপ্রযুক্তি রফতানি) হয়েছে ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি ডলারের। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি রফতানি আয় ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সফটওয়্যার রফতানির হিসাব দিয়েছে ২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। এর মধ্যে ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ডেভেলপার ও কল সেন্টারগুলোর আয় অন্তর্ভুক্ত নয়। ফ্রিল্যান্সারদের আয় যোগ করে বলা হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন বা ৮০ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় অংকের পার্থক্য আসলে মেনে নেওয়াটা বেশ কঠিন। বেসিস ফরমাল সার্ভে করলে বিশাল পার্থক্যটা পরিষ্কার হবে।
এদিকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ২২ ফেব্রুয়ারি সফটওয়্যার মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা সফটওয়্যার তথা তথ্যপ্রযুক্তি রফতানিতে ৮০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছি। চলতি বছরের বাকি সময়ে এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাব। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রফতানি করা।’
বেসিস সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ২৮ লাখ (২.৮ মিলিয়ন) ডলারের সফটওয়্যার রফতানি হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সফটওয়্যার রফতানি শুরু করে। ওই বছর রফতানির পরিমাণ ছিল ৭২ লাখ ডলার। এরপর ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে এক কোটি ২৬ লাখ ডলার, ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৮ লাখ ডলার, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০১০-১১ অর্থবছরে চার কোটি ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডলার অতিক্রম করে। ওই অর্থবছরে মোট রফতানির পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এই আয় বেড়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার ডলার ও ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই খাত থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হয়।
বেসিস সফটএক্সপো-২০১৮ -এর আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সফটওয়্যার রফতানি খাতে বাংলাদেশ যে পরিমাণ আয় করে তার বেশিরভাগই ব্যক্তি উদ্যোগে। বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের সফটওয়্যার নির্মাতাদের তৈরি ইআরপি সলিউশনের চাহিদা বেশি। এর পাশাপাশি চ্যাটধর্মী অ্যাপ্লিকেশন, বিলিং সফটওয়্যার, মোবাইল অপারেটর ও নেটওয়ার্ক পরিচালনার সফটওয়্যারের চাহিদা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সফটওয়্যার রফতানির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি পর্যায়ের ডিজিটালাইজেশনের কাজে বাংলাদেশের একাধিক প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করছে। দোহাটেক নেপালে ই-প্রকিওরমেন্টের কাজ করছে, সাউথটেক একটি দেশের সরকারের ডিজিটালাইজেশনের কাজ করছে। টাইগার আইটি বিভিন্ন দেশে কাজ করছে।’
ডাটাসফটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার নিজের প্রতিষ্ঠানও মালয়েশিয়া ও ভারতে কাজ করছে বলে তিনি জানান। সিস্টেক ভুটানে বিডিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশনের কাজ পেয়েছে। আগামীতে আরও প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।-বাংলা ট্রিবিউন