সবুজের স্বপ্নভূমি বাবুডাইং

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮, ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মেহেদী হাসান মাসুম


বাবুডাইংয়ে ছুটি কাটাতে যাওয়া রাবির কয়েক শিক্ষার্থী সোনার দেশ

এলার্মের টুং টাং শব্দে ঘুম ভাঙলো। অর্ধ ঘুমন্ত অবস্থায় পাশে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনে দেখলাম, ভোর সাড়ে চারটা। এতো তাড়াতাড়ি এলার্ম বেজে উঠার কারণ কী? হঠাৎ করেই মনে হলো রাতে ঘুমাতে যাবার আগে এলার্ম চালু করা হয়েছিল। এটা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রিকশা নিয়ে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে হাজির হলাম। স্টেশনে পৌঁছে দেখি আমার জন্য অপেক্ষা করছে ১৭ থেকে ১৮ জন। তাদের সকলের চোখে মুখে সদ্য ঘুম ভাঙার ছাপ লেগে আছে। এরা কেউ এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে না সাধারণত। এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম তারা সকলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ-যোগাযোগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইং ঘুরতে যাবার জন্য সকাল সকাল বন্ধুরা মিলে রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত হয়েছে।
ট্রেন ছাড়ার সময় সকাল সাড়ে ৫টা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে একঘণ্টা পরে সকাল ৬টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে ট্রেনটি ছাড়লো। সকালের ¯িœগ্ধ বাতাস ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ায় এক মনমাতানো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সকাল যে এত সুন্দর হয় সেটা ট্রেনে বসে প্রথম অনুধাবন করলাম। এই মন মাতানো পরিবেশের মধ্য দিয়ে ঝিক ঝিক শব্দ করে ট্রেনটি ছুটে চলেছে গন্তব্যে। সকাল সাড়ে ৭ টায় ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে। স্টেশন থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাতে করে আমরা আমাদের গন্তব্য বাবুডাইংয়ে পৌঁছে যাই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের বাবুডাইংয়ে ২০০ একর খাস জমিতে গড়ে উঠেছে এ নৈসর্গিক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। উঁচু কয়েকটি টিলার জন্যই এক সময়ের বাবুডাঙ্গা আঞ্চলিকভাবে এখন বাবুডাইং নামে পরিচিত। ছোট বড় ২৬টি টিলার সমন্বয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে এ স্বপ্নভূমি। শহরের কৌলাহলমুক্ত এক নির্জন পরিবেশের কোথাও কোনো মানুষের দেখা নাই। পাহাড়ের মতো কোথাও উঁচু আবার কোথাও বা নিচু এবং বিভিন্ন প্রকার নাম না জানা বৃক্ষে ভরপুর হয়ে রয়েছে এ অরণ্য। এ যেন এক সবুজের দেশ। তবে কিছুটা জায়গা ঘুরার পর দেখা গেল নিচু জায়গাগুলোতে ধান চাষ করা হয়েছে। কিছু দূরে যাবার পরে ঝরণার মতো শব্দ শুনতে পেলাম। সে শব্দকে অনুসরণ করে হাঁটতে লাগলাম। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তা দেখে খুশিতে মন ভরে গেলো। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ লেকের পানি জমিতে সেচ দেয়ার জন্য একটি ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। এ ক্রসড্যামের পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় তা দেখায় কৃত্রিম ঝরণার মতো। তবে দূর থেকে এ শব্দ শুনে সবাই ঝরণা বলে ভুল করবে এটা শতভাগ নিশ্চিত। পুরো এলাকাটা পাহাড়ি এলাকার মতো হয়ে আছে। এই এলাকা দেখে আমার কাছে ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা বন জঙ্গলের মতো মনে হচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ লালমাটি ও উঁচুনিচু টিলা ও সবুজে ঘেরা অরণ্যের ভিতর প্রায় ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পরে দেখা মিললো কয়েকটা বাড়ির। সেখানে একটি বাড়িতে পানি খাবার জন্য প্রবেশ করলাম। বাড়িটিতে দেখলাম বসবাস করার জন্য ৩টি ঘর রয়েছে। এছাড়া একটি রান্নাঘর ও একটি গোয়াল ঘর রয়েছে। ঘরগুলো খড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং উপরে টিন দিয়ে রয়েছে। সে বাড়ির জামিলা বেগম নামের এক গৃহিনীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আদিম যুগের মতো করে বসবাস করছেন তারা। অতি দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে সব সময় জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। জঙ্গলের ভিতরে কিভাবে জীবন যাপন করছে ভাবলেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে? চলাফেরা করার জন্য নেই কোনো রাস্তাঘাট, নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা। খেতের আইল দিয়েই চলাফেরা করতে হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া প্রাকৃতিক বিপদ তো তাদের জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। মাসখানেক আগে এক রাতের ঝড়ে তাদের ঘরের টিন উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। যার ফলে সারা রাত তাদের বৃষ্টির পানির মধ্যে কাটাতে হয়। এতে করে তাদের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সকল জিনিস পত্রের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্তমানে সমাজের সব রকম সুযোগ-সুবিধার বাইরেই রয়ে গেছে এই এলাকায় বসবাসরত মানুষজন। এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে এলাকাটি সবুজের অরণ্য বা স্বপ্নভূমি মনে হলেও এখানে বসবাসরত মানুষদের বাস করতে হয় অতি দুঃখ দুর্দশায়। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়া সব জায়গায় পৌঁছালেও বাবুডাইংয়ে এখন পর্যন্ত পৌঁছেনি মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা। এখানকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ের যেতে হলে এদেরকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পানি কাদার রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। এতো সমস্যা থাকার পরেও থেমে নেই এখানকার মানুষের জীবন-যাপন। বাবুডাইং এলাকাটিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে এতদিকে যেমন সরকার এখান থেকে পাবে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব। অন্যদিকে এখানে বসবাসকারিদের জীবন-যাপনের মানোন্নয়ন ঘটবে।