সবুজ জলবায়ু তহবিলের অর্থ বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ নয় কেন!

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৮, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের কয়েক হাজার নারীকে অর্থসহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং বাংলাদেশের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই অর্থ যোগান দেবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রকৃতি-বিনাশি উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তনে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। উপকূলীয় সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এমন নারীদের জন্য তিন কোটি ৩০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় ২৭০ কোটি ৩২ লাখ ৭৬ হাজার টাকার অর্থ সহায়তা দেয়া হবে। এই তহবিলে ৩৯ হাজার নারীর ভাগ্যোন্নয়ন ঘটবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে চার কোটি ডলার পাচ্ছে বাংলাদেশ। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৩২০ কোটি টাকারও বেশি। জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (ক্লাইমেট রেসিলেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার মেইনস্ট্রিমিং ইন বাংলাদেশ) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ অর্থ ব্যয় হবে।
৮ মার্চ জার্মান দাতা সংস্থা কে এফ ডব্লিউ-এর সঙ্গে সরকারের এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) আওতায় এটি প্রথম প্রকল্প। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা ও সাতক্ষীরার ২০ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
দেশের নীতিনির্ধারক মহলে একটা ধারণা খুবই প্রকট বলে মনে হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আক্রান্ত এলাকা মানেই সমূদ্র উপকূলবর্তী এলাকা। এবং এই ধারণার বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত হয়নি বলেই হয়ত জলবায়ু তহবিলের অর্থ দেশের অন্য অঞ্চল অর্থাৎ বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য কখনো বরাদ্দ হয়নি। অথচ বরেন্দ্র অঞ্চল খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিগণিত। মনুষ্য তৈরি অপরিণামদর্শী কারণে এ অঞ্চল ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এ অঞ্চলের পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নি¤œগামী হচ্ছে। এ ছাড়াও এ অঞ্চলের খাল বিল-নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে কিংবা প্রভাবশালীরা দখল করে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভরাট কিংবা নানা স্থাপনা তৈরি করেছে। এমনি পরিস্থিতিতে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ এর মত বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার বেড়েছে। সব মিলে এ অঞ্চলে বর্তমানে মরুকরণ প্রক্রিয়া চলছে বলেই বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ১৩শ থেকে ১৪শ’ মিলিমিটার, অথচ জাতীয় গড় ২৫শ’ মিলিমিটার। তদুপরি এ অঞ্চলের ভূউপরিস্থ পানির আধার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিয়ে বরং ব্যাপকহারে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভরা বর্ষা মৌসুমেও এ অঞ্চলে খরা লক্ষ্য করা যায়। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে সাধারণ দরিদ্র মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে। গ্রীষ¥কালে নিরাপদ পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়। নারী ও শিশুরা এর নির্মম শিকারে পরিণত হয়। নারীদের ৭/৮ কিমি দূর থেকে খাবার পানে সংগ্রহ করতে হয়। এর ফলে ওই নারীদের নিরাপত্তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রতিক্রিয়া তার সবগুলোই এ অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ জলবায়ু তহবিলের অর্থ থেকে বঞ্চিত। এ অঞ্চলের দুর্ভাগ্য যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বও এ অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিকে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে নিতে সক্ষম হননি। এটি নেতৃত্বের একটি বড় ব্যর্থতাও বটে।
আমরা আশা করি বিষয়টি নিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনোযোগী হবেন। এবং একই সাথে সরকারের কাছে আমরা আবেদন রাখতে চাই যে, জলবায়ু তহবিলের অর্থ এ অঞ্চলের পীড়িত মানুষের উন্নয়নের জন্য এবং মরুকরণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নিবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ