সরকারি ঘোষণা অনুয়ায়ী বই পায় নি নাটোরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিক্ষার্থীরা

আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০১৭, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস


পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের নিজস্ব মাতৃভাষায় বিনামূল্যে বই দেয়ার ঘোষণা ছিল আগে থেকেই। কিন্তু সরকারের সেই ঘোষণা অনুয়ায়ী বই পায় নি নাটোরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষা অফিস বলছে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের জন্য আলাদা কারিকুলাম না থাকায় তাদের নিজস্ব ভাষার বই দেয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদরি ও গারো এই পাঁচটি ভাষার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু বিনামূল্য বই উৎসবের তিনদিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের সেই ঘোষণা অনুযায়ী বই পাচ্ছে না উত্তরের জেলা নাটোরে বসবাসকারী সাদরি ভাষার শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উরাও, পাহান, তেলি, সাদরি, মুন্ডা সহ মোট ২৩টি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তিক জনগোষ্ঠির অর্ধলক্ষাধিক মানুষের বসবাস নাটোর জেলায়। সমতলে বসবাসকারী এসব আদীবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সে লক্ষ্য নিয়েই সরকার স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ক্ষুদ্র ৫টি গোষ্ঠির জন্য নিজস্ব ভাষায় বই দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সরকারের ঘোষণা থাকার পরও উল্টো চিত্র নাটোরের স্কুলগুলোতে। বই উৎসবের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও স্কুল গুলোতে দেয়া হয় নি তাদের বই।
নাটোর সদর উপজেলার শংকর ভাগসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম মিলে আদিবাসীদের বসবাস। এসব বসবাসকারীদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করে স্থানীয় শংকর ভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গেল কয়েক বছর ধরেই পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র  নৃ-জনগোষ্ঠির মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের সচেতনা লক্ষনীয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের মধ্যে সচেতনাতা বাড়ায় এই অঞ্চলে শতকরা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ আদিবাসীরা শিশুরা এখন স্কুল মুখি।
শংকর ভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ঝর্ণা তেলী বলেন, প্রথম যখন স্কুলে ভর্তি হই, তখন বাংলা ভাষায় বই পড়তে খুবই অসুবিধা হতো। পরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় এখন আর অসুবিধা হয় না। ঝর্ণা তেলী আরো বলেন, আদিবাসী শিশুদের মধ্যে পড়াশুনার খুব আগ্রহ রয়েছে। অনেকে নিজস্ব ভাষার বই পায় না দেখে ভর্তি হয় না। তবে সরকারিভাবে বই দেয়া হলে শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হবে।
শংকরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামিমা নার্গিস বলেন, দিন দিন আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বছর সরকার ৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের জন্য বই দেয়ার ঘোষণা দিলেও আমার স্কুলে এখন পর্যন্ত বই আসে নি। আদিবাসী শিশু শিক্ষার্থীরা প্রথম অবস্থায় বই পড়তে তাদের অসুবিধা হয়, পরে বাংলা ভাষায় পড়ে অভ্যস্ত হয় তারা। যদি তাদের নিজস্ব ভাষায় বই দেয়া হয় তাহলে এই জনগোষ্ঠির মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে।
এ ব্যাপারে জাতীয় আদিবাসী ছাত্র পরিষদ নাটোর জেলা শাখার সভাপতি কালিদাস রায় বলেন, সরকার পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে যে বই দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো নাটোরের সাদরি ভাষার শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছে। সরকারের ঘোষণার পরও বই দেয়া হয় নি। তবে নাটোরের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বই না দেয়ায় সরকারের শতভাগ বই উৎসব সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাটোর জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, এই বছর নাটোর জেলায় প্রাথমিকে ১ লাখ ৮২হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯ লাখ ২৫ হাজার। এখন পর্যন্ত বরাদ্দ এসেছে ৬ লাখ ২৫ হাজার ২৫০টি। শিক্ষা অফিসে এখনও এসে পৌঁছায়নি ৩ লাখ বই। অপরদিকে ২ লাখ ১২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বই দেয়া বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭টি। এর মধ্যে অধিকাংশ বই বিতরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাফিসা বেগম বলেন, বাংলা ভাষায় শিক্ষা লাভ করার কারণে তাদের জন্য বই বরাদ্দ চাওয়া হয় নি। তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের জন্য জেলায় আলাদা কারিকুলাম না থাকায় বই দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।