সাধারণ অথচ মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত দেয়

আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মাঝেমধ্যে বেশি পরিমাণ খাবার খাওয়ার কারণে আমরা গ্যাসীয়, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা অথবা বুকজ্বালা অনুভব করি। কিন্তু এসব লক্ষণ যে সবসময় স্বাভাবিকতা বা সামান্য সমস্যা নির্দেশ করে তা নয়, এসব লক্ষণ কোনো মারাত্মক সমস্যারও ইঙ্গিত দিতে পারে।
মাউন্ট সিনাইয়ে অবস্থিত আইকান স্কুল অব মেডিসিনের ‘মেডিসিন অ্যান্ড গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’ এর অধ্যাপক ও মেডিক্যাল ডাক্তার জেমস এফ. ম্যারিয়ন বলেন, ‘ছুটির দিনে এখানে ওখানে, বিশেষত যদি আপনার শিডিউল, ডায়েট কিংবা লাইফস্টাইল পরিবর্তনের কারণে যদি এ জাতীয় সামান্য সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা কারণ ছাড়া যদি হঠাৎ কোনো পরিবর্তন বা সমস্যা দেখা দেয়, অথবা এ সমস্যা যদি লেগেই থাকে- তাহলে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে যাওয়াটা ভালো আইডিয়া।’
এ প্রতিবেদনে পাকস্থলীর সবচেয়ে বেশি কমন সমস্যাসমূহের কিছু উল্লেখ করা হলো, যা পড়ে আপনি এসব সম্পর্কে ধারণা পাবেন এবং বুঝতে পারবেন কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
১. বুকজ্বালা : আপনার যদি পূর্বে হার্টবার্ন বা বুকজ্বালা না হয়ে থাকে (মসলাযুক্ত কিংবা সুপার-সাইজড মিল বা ফাস্টফুড জাতীয় খাবার খাওয়ার পর যে বুকজ্বালা হয় তা ব্যতীত) এবং কোনো নির্দিষ্ট ট্রিগার বা খাবার ছাড়াই যদি হঠাৎ ধারাবাহিকভাবে বুকজ্বালা করতে থাকে (বিশেষ করে, আপনার যদি অন্যান্য উপসর্গ থাকে, যেমন- ওজন হ্রাস পাওয়া, গলায় খাবার আটকে আছে এমন অনুভূতি হওয়া, অথবা মলের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া)- তাহলে বুঝবেন যে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার সময় হয়েছে। ডা. ম্যারিয়নের মতে, ‘গ্যাস্ট্রোএসোফাজিল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা হার্টবার্ন বা বুকজ্বালা হচ্ছে এমন এক অবস্থা যখন পাকস্থলীর এসিড প্রদাহ শুরু করে এবং এসোফ্যাগাস বা খাদ্যনালী সংকীর্ণ হয়ে যায়।’ যেহেতু বুকজ্বালা আলসার ও অ্যাজমাসহ অন্যান্য মারাত্মক সমস্যার দিকে ধাবিত করে, সেহেতু এসব নিয়ে নীরবে বসে থাকা উচিত নয়। সঠিক ওষুধ সাধারণত এই উপসর্গকে দমাতে পারে। কিছু লোক বুকজ্বালা ও বুকব্যথা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে, কেননা প্রায়ক্ষেত্রে বুক থেকে পেটের মধ্যে বুকজ্বালা হয়ে থাকে। ডা. ম্যারিয়ন বলেন, ‘চল্লিশোর্ধ্ব লোকেরা এ সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। তীব্র বুকজ্বালার অনুভূতি অ্যাজিনার মতো হতে পারে এবং এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন।’ এ কারণে ডাক্তার দেখানো খুব প্রয়োজন। বুকজ্বালার যেকোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ পরীক্ষা করুন।
২. পেটব্যথা : পেটব্যথা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। ডা. ম্যারিয়ন বলেন, ‘যদিও অ্যাপেনডিক্স পেটের নিচে ডানদিকে থাকে, অনেক লোকের বেলি বাটন বা নাভিতে ব্যথা হয়- যখন তাদের অ্যাপেনডিসাইটিস থাকে।’ পেটের মধ্যখানে যকৃতের নিচে গলব্লাডার বা পিত্তকোষে সমস্যা হলে উপরিস্থ পেট অথবা পিঠে ব্যথা হতে পারে। আমেরিকান কলেজ অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির মতে, ‘ঘনঘন পেটব্যথা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিএসের লক্ষণ হতে পারে। ধারণা করা হয় যে, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আমেরিকান এ রোগ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে, যদিও শুধুমাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আমেরিকানের মধ্যে এ রোগ ধরা পড়ে।’ গ্যাস, ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য যদি মাসে কমপক্ষে তিনবার করে অন্তত তিনমাস বা ছয়মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে তা আইবিএসের লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে। কখন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করবেন তা নির্ভর করছে আপনি কত দীর্ঘসময় অস্বস্তি বা সমস্যায় ভুগছেন এবং ব্যথার তীব্রতা কেমন তার ওপর। ডা. ম্যারিয়ন বলেন, পেটব্যথা যদি অপেক্ষাকৃত নতুন হয় এবং তা যদি আপনার খাবার বা জীবনধারার কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত না হয়, এটি যদি আপনাকে আপনার দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং বিশেষ করে যদি মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দুদিন পর ডাক্তার দেখানো উচিত।’ যদি নিয়মিত ব্যথা অনুভব করে থাকেন, এমনকি তা চলে গেলেও ডাক্তারকে বলুন।
৩. কোষ্ঠকাঠিন্য : নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত মন্টেফিওর মেডিক্যাল সেন্টার ডিপার্টমেন্ট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির অ্যাটেন্ডিং ফিজিশিয়ান জেনিফার ক্যাটজ বলেন, ‘কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া ভীতিকর নয় এবং অপর্যাপ্ত মলের কারণে বাওয়েল মুভমেন্ট বা মলত্যাগ না হওয়া স্বাভাবিক।’ প্রকৃতপক্ষে, কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে সবচেয়ে বেশি কমন পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাসমূহের একটি। সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য হলে প্রতি সপ্তাহে তিনবারের কম বা অসম্পূর্ণ বাওয়েল মুভমেন্ট হয়। পর্যাপ্ত ফাইবার না খাওয়া কিংবা খাদ্যসূচি বা খাবারের পরিবর্তনের কারণে এমনটা হয়ে থাকে। ডা. ক্যাটজ বলেন, ‘কখনো কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য বেশ ভীতিকর কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এসব সমস্যার মধ্যে কোলন বা মলাশয়ের আস্তরণে ইনজুরির কারণে ক্ষত, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্লোখযোগ্য।’ ডা. ম্যারিয়ন বলেন, ‘আপনি যা করতে চান তা যদি বাওয়েল মুভমেন্টের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়, যদি প্রতিনিয়ত টয়লেটে যেতে হয়, যদি মল শক্ত হয় ও মলত্যাগে জোর দিতে হয় এবং যদি মলত্যাগের জন্য সবসময় ল্যাক্সাটিভ বা জোলাপ ব্যবহার করতে হয়- তাহলে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক লোক রয়েছে যারা নীরবে এ সমস্যা ভোগ করে যায়, কারণ তারা ডাক্তারের কাছে এটি প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকে।’ তিনি যোগ করেন, এটি থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা অনেক কিছু করতে পারি, যেমন- খাবারে পরিবর্তন আনা অথবা ওষুধ সেবন করা।
৪. ডায়রিয়া : বিষম ডায়রিয়া যা চার সপ্তাহের কম সময় ধরে থাকে তা অতি কমন। ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, প্যারাসাইট বা পরজীবীর কারণে অথবা অত্যধিক পরিমাণে সরবিটল সমৃদ্ধ খাবার (সাধারণত চিনিমুক্ত গাম বা চুয়িং গামে সরবিটল পাওয়া যায়, সরবিটলের কারণে পেটে গ্যাসও হতে পারে) খাওয়ার কারণে এ ডায়রিয়া হতে পারে। ডায়রিয়া একজন মানুষকে দ্রুত ডিহাইড্রেশনের দিকে ধাবিত করতে পারে। এ কারণে এই উপসর্গসমূহ দেখা দিলে ডাক্তার দেখানো গুরুত্বপূর্ণ: দুইদিন ধরে পাতলা পায়খানা করা, ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর জ্বর হওয়া, ঘনঘন বমি করা, ২৪ ঘন্টায় ৬ বার বা অধিক পায়খানা হওয়া, পেটে বা পায়ুপথে তীব্র ব্যথা করা, মলের বর্ণ কালো বা আলকাতরার মতো হওয়া বা মলের সঙ্গে রক্ত/পুঁজ বের হওয়া এবং ডিহাইড্রেশনের উপসর্গ (যেমন- তৃষ্ণা, চোখের পার্শ্বস্থ চর্মে দাগ, ডার্ক ইউরিন বা কালো প্রস্রাব বা বাদামি প্রস্রাব, সচরাচরের চেয়ে কম মূত্রত্যাগ) দেখা দেওয়া।
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া কমপক্ষে একমাস ধরে থেমে থেমে হয় এবং এটি কম কমন। কোলন ইনজুরি, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, লং স্ট্যান্ডিং ইনফেকশন বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, ক্রোন’স রোগ, আলসারেটিভ কোলাইটিস বা মলাশয়ের প্রদাহ, আইবিএস, সেলিয়াক রোগ এবং বিরল ক্ষেত্রে ক্যানসারের কারণে এটি হতে পারে। গরুর দুধ, সয়া, শস্যদানা, ডিম অথবা সিফুডের প্রতি অ্যালার্জি বা ইনটলারেন্স থাকলেও এ ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়রিয়ার সঠিক কারণ নিশ্চিত হতে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। ডা. ম্যারিয়ন বলেন, রোগীদের মধ্যে কি ঘটছে তা আমরা নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করতে চাই, যাতে রোগ উৎপত্তির কারণ জেনে রোগের চিকিৎসা করতে পারি।
৫. পেট ফাঁপা ও গ্যাস : আক্ষরিক অর্থে, সবার পেটে গ্যাস হয়, কিন্তু কারো কারো গ্যাসের পরিমাণ অন্যদের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। হয়তো আপনার পেটে পূর্বে সামান্য গ্যাস ছিল, কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করছেন যে পেট অতিমাত্রায় ফেঁপে বা ফুলে গেছে। এরকম পেট ফাঁপা বা পেট ফোলা অস্বস্তি যদি আপনার স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন ভালো নিউট্রিশনিস্ট বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নিন। অন্ত্রনালির সংকীর্ণতা, আইবিএস সম্পর্কিত প্রদাহ, ক্রোন’স রোগ, কোলাইটিস অথবা অন্ত্রের কোরিওগ্রাফি বা মোবাইলিটি বা নড়নচড়ন সমস্যার কারণে এটি হতে পারে। এছাড়া ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের মতো ফুড অ্যালার্জি (যা ৩০ বছরের পর থেকে বেড়ে যায়), সেলিয়াক রোগ কিংবা ব্যাকটেরিয়াল ওভারগ্রোথের কারণেও পেট ফাঁপা সমস্যা হতে পারে। যে কারণেই পেট ফাঁপা হোক না কেন, ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন- বিশেষ করে গ্যাসের সঙ্গে রক্তপাত, ওজন হ্রাস বা বারবার বমির মতো উপসর্গ থাকলে। একজন ডায়েটিশিয়ান আপনার খাবার তালিকা দেখে পেট ফাঁপা সৃষ্টি করতে পারে এমন খাবারসমূহ বর্জন করার জন্য বলতে পারেন। তথ্যসূত্র : ম্যানস হেলথ