সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব বিইএ’র

আপডেট: মে ২৬, ২০১৯, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবদেক


২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বৈদেশিক ঋণমুক্ত ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট ঘোষণা করেছে অর্থনীতিবিদদের পেশাদার সংগঠন ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি’ (বিইএ)। এতে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ৬৯ শতাংশ হবে প্রত্যক্ষ কর ও ৩১ শতাংশ হবে পরোক্ষ কর।
এদিকে আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। বৈদেশিক ঋণমুক্ত এই বিকল্প বাজেট সরকারের সম্ভাব্য বাজেটের দ্বিগুণের বেশি।
২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে নিয়মিত এ প্রস্তাবনা দিয়ে আসছে উন্নয়নশীল বিশ্বে সরকারের বাইরে বিকল্প বাজেট ঘোষণাকারী একমাত্র এ সংগঠনটি।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় রাজশাহীসহ সারাদেশের ২৫টি জেলায় একই দিনে একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে অর্থনীতি সমিতির বাজেট প্রস্তাবনা ২০১৯-২০ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরীর নানকিং দরবার হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির নির্বাহী সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, সরকার ধনীদের তুলনায় গরীব শ্রেণির ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে রেখেছে। এই বৈষম্য কমাতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত দুই কোটি কর দেয়ার যোগ্য। কিন্তু কর দেন মাত্র ২২ লাখ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে আরো আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিল হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ, এন. কে নোমান ও রাজশাহী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর ইসলাম, রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাকপ আনিসুজ্জামান মানিক প্রমূখ।
বিডিনিউজ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব করা হয়। এসময় অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আবুল বারকাত জানান, আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রীর আভাসের চেয়ে দ্বিগুণ অঙ্কের বাজেটের প্রস্তাব দিয়ে তার অর্থ সংস্থানে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বড় তিনটি ক্ষেত্র হচ্ছে- পাচার হওয়া ও কালো টাকা উদ্ধার এবং সম্পদ কর।
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আবুল বারকাত বলেছেন, এই তিনটি নতুন উৎস থেকেই সরকার মোট ৯৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারেন। আর এ টাকা দিয়ে প্রতি বছর তিনটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব।
আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটের অঙ্ক সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলেও আভাস দিয়েছেন তিনি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বাজেটে কর না বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের কথা বলে আসছেন মুস্তফা কামাল।
অর্থনীতি সমিতি তাদের প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটে রাজস্ব আয় ধরেছে ১০ লাখ ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৯ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর ও ৩১ শতাংশ পরোক্ষ কর। মোট বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৮১ শতাংশের জোগান আসবে রাজস্ব আদায় থেকে।
অর্থপাচার রোধ, কালো টাকা উদ্ধার ও সম্পদ করসহ রাজস্ব আদায়ের আরও নতুন উৎস দেখিয়ে বারকাত বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের ২০টি নতুন উৎস নির্দিষ্ট করেছি, যা আগে ছিল না।
২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ঘাটতির এই বিকল্প বাজেটে অর্থায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না বলে দাবি করেন তিনি।
আগামী ৩ বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৫ লাখ ভ্যাট লাইসেন্সধারীকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে অর্থনীতি সমিতি। এনবিআর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে বাংলাদেশের ভ্যাট লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে বড়জোর ১ লাখ লাইসেন্সধারীর কাছ থেকে বর্তমানে ভ্যাট আদায় হয়।
খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বারকাত করেন, অভ্যাসগত ঋণ খেলাপিদের মোকাবেলার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাদের পূর্ণউদ্যমে চালু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। সমস্যাটি জটিল, তবে সমাধান সম্ভব বলে মনে করি।
বিকল্প বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে মোট ২ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে অর্থনীতি সমিতি। এরপর রয়েছে জনপ্রশাসন, পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত।
কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে ১ লাখ ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ২ লাখ বিঘা খাস জমি বন্দোবস্ত এবং ২০ হাজার জলাহীন প্রকৃত মৎস্যজীবী পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ হাজার বিঘা খাস জলাশয় বন্দোবস্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে সমিতি।
ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ ও বিমার ব্যবস্থার পাশাপাশি চলতি বোরো মৌসুমে সঙ্কটে পড়া কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিতের দাবিও জানিয়েছে তারা।
কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক বারকাত বলেন, দেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ মানুষেরই কর্মসংস্থান হয় না।
কর্মসংস্থান বাড়ানো ও বেকারত্ব কমাতে ‘জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কোষ’ গঠন, যুবকদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হতে উৎসাহিত করতে স্টার্ট আপ পুঁজি সরবরাহ এবং শিক্ষাখাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫% বরাদ্দের প্রস্তাব দেন বারকাত।
তামাকে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, তামাকের ওপর শুল্কারোপের ক্ষেত্রে কয়েক স্তরবিশিষ্ট মূল্যস্তর বাতিল করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের উপর কমপক্ষে ৬০ টাকা আবগারি শুল্ক, প্রতি ২৫ শলাকার বিড়ির উপর ১৫ টাকা আবগারি শুল্ক, আর প্রতি ১০০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ওপর ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক আরোপ করা হোক।
নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে দরিদ্র নারীদের সরকারিভাবে ক্ষুদ্র-অনুদান, প্রশিক্ষণ, গার্মেন্টসসহ কর্মজীবী নারীদের আবাসন ও ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, একশভাগ নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৪ গুণ বাড়ানো, ক্রীড়া খাতে নারীদের জন্য বরাদ্দ ৪ গুণ বাড়ানো, মাধ্যমিক স্কুলে মেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষায় বরাদ্দ ৩ গুণ বাড়ানো এবং নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বরাদ্দ ৩০ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে অর্থনীতি সমিতি।
তাদের আরও কয়েকটি সুপারিশ হচ্ছে- ব্যক্তি পর্যায়ে করহার কমিয়ে ৩ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে রাখা, বছরে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা আয়কর দেওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজারে বাড়ানো, প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট উপখাতভিত্তিক কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি।
বারকাত বলেন, আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ, মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালের বাজেট। আসন্ন অর্থবছরের বাজেট হতে হবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন আমাদের ‘স্বাধীনতার ঘোষণার’ সঙ্গে সম্পূর্ণ সাযুজ্যপূর্ণ, বাজেট হতে হবে আমাদের ১৯৭২ এর মূল সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
স্বাগত বক্তব্যে অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের বিকল্প বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ফল। তাও সমিতির গুটিকয়েক ব্যক্তির। আর সরকার যে খসড়া বাজেট আগামী জুন মাসে সংসদে উত্থাপন করবে, তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দেশি-বিদেশি পরামর্শকসহ কয়েক হাজার কর্মকর্তার যৌথ কর্মকাণ্ড।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ