সিংড়ায় নাগর নদে শতাধিক বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ || হুমকির মুখে বোরো ধান ও রবি শস্য

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০১৮, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

নাটোর প্রতিনিধি


নাগর নদের ঢলের পানি থেকে জমি রক্ষায় বাঁধ দিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা-সোনার দেশ

‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তায় হাঁটু জল থাকে’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত এই কবিতার উৎস নাটোরের সিংড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নাগর নদের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে অবৈধ দখলদার ভূমিদস্যুদের থাবায়। নিয়মিত ড্রেজিং না করা, নদী জুড়ে বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের ফলে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত এই নদী আজ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। তাছাড়া নদীতে বাঁধের কারণে গত কয়েক দিনের বর্ষণ ও ঢলের পানি চলনবিলে ঢুকে পড়ায় হুমকির মুখে রয়েছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আধা-পাকা বোরো ধানসহ বিভিন্ন রবি শস্য।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ভূমি দস্যুদের অবৈধ দখলের কারণে নাগর নদ ও তার সংযোগ নদী গুড়-আত্রাই নদীর ঐতিহ্য ও গতি প্রবাহ হারিয়ে যেতে বসেছে। ভূমিদস্যুরা সিংড়া উপজেলার জয়নগর তাজপুর গ্রাম থেকে সারদানগর ফার্ম পর্যন্ত নাগর নদ দখল করে নদের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছে। খরশতি দক্ষিণপাড়ার খেচের আলী সেও নাগর নদ দখল করে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন। এতে করে নদীর চলমান পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি খরসতি গ্রামের প্রভাবশালী ইদ্রিস আলী ও শামসুল ইসলাম ওরফে কালু সাদনগর এলাকায় নাগর নদ জুড়ে চারটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছেন। এতে নদে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়াও সম্প্রতি কয়েক দিনের বর্ষণ ও ঢলের পানি নামতে না দেয়ায় ধর্মপুর, বাশারনগর, ভুলবাড়িয়া এলাকার বিভিন্ন ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে চলনবিলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আধা-পাকা বোরো ধানসহ বিভিন্ন রবি শস্য তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার সরেজমিনে নাগর নদের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদ জুড়ে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর পানি ধর্মপুর ও বাশারনগর এলাকার ভাঙন দিয়ে বিলে ঢুকছে। শতাধিক কৃষক স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছে। বাঁধে কর্মরত কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান, নজরুল ইসলাম ও ফজলুর রহমান বলেন, কিছু অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীর কারণে প্রতি বছরই এই ভাঙন দিয়ে বিলে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চলনবিলের লক্ষাধিক কৃষক। তাছাড়া নদীতে লাখ লাখ ঘনমিটার পলি পড়ে ও অবৈধভাবে পুকুর খননের কারণে এই নদী নাব্যতা হারিয়ে ক্রমশ সঙ্কুুচিত হচ্ছে। তারা এবিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন।
এবিষয়ে অভিযুক্ত ইদ্রিস আলী বলেন, জয়নগর থেকে সারদানগর ফার্ম পর্যন্ত নাগর নদে প্রায় শতাধিক বাঁধ রয়েছে। তার শুধু একটি সাথানে বাঁধ দিয়েছেন। আর পানি প্রবাহের জন্য বাঁধের কিছু অংশ খুলে দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তিনি ভেকু মেশিন দিয়ে আরো মাটি সরিয়ে দিবেন বলে জানান।
শারদানগর নদের পাড়ে বসবাসকারী ববিতা বেগম ও ওহেদ প্রামাণিক জানান, যে যেমন পারছে নদী দখল করে বাঁধ দিচ্ছে। এক সময় এই নদী দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নওগাঁর আত্রাইয়ের পতিসরে যাতায়াত করেছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত পরিমাণে পলি পড়া ও নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ এবং নিয়ম বহির্ভুত ভাবে রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। অবিলম্বে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এই নদীগুলো ড্রেজিং করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনদীপ কুমার সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নদে কিছু জায়গায় শ্রমিক দিয়ে মাটি অপসারণ করেছেন। শনিবার থেকে অন্য সব জায়গার বাঁধ অপসারণ করা নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Don`t copy text!