সিটি হাসপাতালে সপ্তায় তিনদিন বিনামূল্যে চিকিৎসা

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৯, ৯:৫০ অপরাহ্ণ

শাহিনুল আশিক


সিটি হাসপাতালে চিকিৎসার অপেক্ষায় রোগিরা-সোনার দেশ

সালমা আক্তার (২১) গাইনি সমস্যা নিয়ে এসেছেন রাজশাহী সিটি হাসপাতাল। কাউন্টারে দাঁড়িয়েছেন টিকিট নিতে। তিনি জানেন না মঙ্গলবার গাইনি রোগিদের ফ্রিতে চিকৎসা দেয়া হয়। তিনি বলেন, অন্যদিনে ১০০ টাকা টিকিট নেয়া হয়। কিন্তু তারা টিকিট ছাড়ায় রোগি দেখছে। এটা ভালো উদ্যোগ। চিকিৎসার মানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্রিতে বলে দায় সারা চিকিৎসা হয় না এখানে। চিকিৎসকরা অনেক সময় ধরে রোগি দেখছেন। চিকিৎসাও অনেক ভাল।’
রাজশাহীর একটি মাত্র বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুনতে অনেকটা অবাক লাগলেও এমনটিই ঘটছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নিকট থেকে লিজ নেয়া সিটি হাসপাতালে সপ্তাহে তিনদিন বিনামূল্যে রোগিদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাও একজন দুইজন নয়। গড়ে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন রোগির সার্বিক চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে হাসপাতালটিতে। তবে স্বাভাবিক দিনের চেয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে ভিড় করছেন রোগিরা। আবার হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার মান বৃদ্ধি হওয়াতেও ওই এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা এসেছে। যদিও হাসপাতালটি রাসিক-এর কাছ থেকে লিজ নেয়ার পর থেকেই চিকিৎসাসেবায় এই পরিবর্তন এসেছে। হাসপাতালের চিকিৎসার মান দেখে রোগি ও তাদের স্বজনরা প্রশংসা করছেন রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের। রাসিক মেয়রের এমন উদ্যোগে ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বাসিন্দাদের কাছে আস্থা অর্জন করেছে সিটি হাসপাতাল। শুধু তাই নয়, রাসিকের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা আসছেন এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। হাসপাতাটিতে নতুন আঙ্গিকে আধুনিক চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন একদল অভিজ্ঞ চিকিৎসক।
সিটি হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন জানান, হাসপাতালে সপ্তাহে তিনদিন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে রোগিদের। তবে বিনামূল্যের চিকিৎসা নিতে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেও রোগিরা আসেন। আমরা তাদেরকেও ফিরিয়ে দেয় না। সবাই ওইদিন বিনামূল্যে চিকিৎসা পান। এর মধ্যে প্রতি সোমবার শিশু বিভাগে, মঙ্গলবার গাইনি ও বুধবার ডেন্টাল চিকিৎসা প্রদান করা হয় বিনামূল্যে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বাইরের পরিবেশে যেমন এসেছে চাকচিক্য, তেমনি ভেতরের পরিবেশও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হাসপাতালের অভর্থ্যনা কক্ষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসকের বিষয়ে সব ধরনের তথ্য দেয়া হচ্ছে রোগিদের।
সিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, এখানে বিনামূল্যের পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে আন্তর্জাতিক মানের যেসব সেবা দেয়া হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ জরায়ু ক্যান্সার পরীক্ষা, থ্রি ডি আল্ট্রাসোনোগ্রাম, নরমাল ডেলিভারি, সিজারিয়ান ডেলিভারি, অ্যাপেন্ডিসাইটিস সার্জারি, ১২ চ্যানেল ইসিজি, সার্জারি, পিত্তথলি সার্জারি, হল্টার মনিটরিং, রক্ত পরীক্ষা, হার্টের মনিটরিং, ইটিটি, ইকো, হার্নিয়া, টনসিল, সিস্ট ও এক্সরে করা হচ্ছে।
হাসপাতালে ৯টি বিভাগের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। সেগুলো হলো- গাইনি, কিডনি, দন্ত, মেডিসিন, ডায়াবেটিক, শিশু, চর্ম ও যৌন এবং হৃদরোগ। তবে দ্রুত চক্ষু রোগিদেরও চিকিৎসা দেয়া হবে। এই লক্ষ্যে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালে ভাই মোজাফ্ফর আলীকে অপারেশনের জন্য ভর্তি করেছেন গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, গত রোববার মোজাফ্ফর আলীর অপারেশন হয়েছে। তারপর থেকে চিকিৎসক সার্বক্ষণিক দেখভাল করছে। রোগির যে কোনো সমস্যার জন্য সবসময় চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে অনেক অধুনিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। সেগুলোর পরিবেশ তেমন ভাল না। বেড ও ক্যাবিনগুলো আধুনিক না। এই হাসপাতালটির বেড ও ক্যাবিনগুলো আধুনিক। পরিবেশও অনেক সুন্দর।’
স্থানীয় বাসিন্দা নাহিদ জানান, আগে হাসপাতালে তেমন রোগি আসতো না। চিকিৎসাসেবা ভাল হতো না বলে। অনেক সময় চিকিৎসকদের ঠিকমতো পাওয়া যেত না। বর্তমানের চিত্র পাল্টে গেছে। এখন বিভিন্ন রোগ নিয়ে রোগিরা আসেন এখানে।
চিসিৎসা নিতে আসা সেলিনা বেগম বলেন, এখনে চিকিৎসার মান ভালো। ডাক্তাদেরও খুব সহজে পাওয়া যায়। বড় সুবিধা হলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এছাড়া অন্য হাসপাতালের মত দালালের ঝামেলা নেই। তাই ভালো লাগে এখানে আসতে। বাড়ির কারো কিছু হলেই আমরা ছুটে আসি এখানে।’
আরেক রোগি মর্জিনা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ট্যাকার ওভাবে বড় হাসপাতালে য্যাতে পারি না। এখিনে অ্যাসলে কম ট্যাকাতে অসুখের পরীক্ষাও করা যায়। আমাদের খুব উপকার হচ্ছে। আমাদের মুতন মানুষদের সাথে এভাবেই যেন থাকে হাসপাতালের লোকজন। তাহলে মানুষ উপকার পাবে।’
প্রসঙ্গত, অব্যাহত লোকসানের মুখে সম্প্রতি রাসিক সিটি হাসপাতালটি তিন বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছে। এরপর থেকে সেলট্রন নামের একটি কম্পানি এখানে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে নগরবাসীকে। নগরীর গরিব রোগিদের অন্যতম ভরসার জায়গা এই সিটি হাসপাতাল।