সিয়াম দর্শন

আপডেট: জুন ৮, ২০১৮, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

ড. হাসান রাজা


‘সিয়াম’ আরবি শব্দ। ফার্সি ও উর্দূতে একে বলা হয় রোজা। এই শব্দটি বাংলায় বহুল প্রচলিত। বাংলায় সিয়ামকে উপবাস বলা যেতে পারে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ঋধংঃরহম।
‘সিয়াম’ অর্থ প্রত্যাখান, ‘জবলবপঃরড়হ’ বর্জন, ত্যাগ, বিরতি বা পরিত্যাগ করা। আর রসনার উপরে বাস করা বা ভাসমান থাকাই হচ্ছে উপবাস।
শুধুমাত্র ২৪ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম নয়। মূলত পানাহার গ্রহণ করেও সদা সর্বদা মস্তিষ্কে আগত ধর্মারাশীকে মোহাবিষ্ট হয়ে গ্রহণ না করে সেগুলো সূক্ষ্মভাবে জানার মাধ্যমে প্রত্যাখান করা বা বর্জন করায় হচ্ছে সর্বক্ষণিক সিয়াম।
‘সিয়াম’ একটি সর্বজনিন আত্মদর্শন বা আত্মমুক্তির সাধনা। কলেমা, সালাত, হজ্জ্ব, জাকাত ও কুরবানির সাথে এর গভীর সংযোগ রয়েছে। যিনি সিয়াম পালন করেন তিনি সায়েম বা রোজাদার। যেহেতু ধর্মরাশীসমূহকে মোহাবিষ্ট হয়ে মস্তিষ্কে ধারণ করলে শিরিক হয়, তথা পরজন্মের বীজ রোপিত হয়, তাই এই সকল ধর্মকে গ্রহণ নয় বরং বর্জন করতেই হয়। এই প্রক্রিয়ায় শুধু রসনার উপরে ভাসমান থাকায় নয় বরং সর্বক্ষণিক ধর্মরাশীকে পরিত্যাগ বা বর্জনের গভীর নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মধ্যে দিয়ে সাধক তার ফলস্বরূপ দেহমনের বন্দিদশা থেকে আপন রবের চিরস্থায়ী মুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
‘সিয়াম’ একটি সর্বজনিন সাধন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক। গুরুমুখি যে কোনও ব্যক্তি সাধ্যমত এই সাধনার মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করতে পারেন।
ইসলাম ধর্মদর্শনের মৌলিক গ্রন্থ আল কোরানে ঘোষিত হয়েছে : ‘হে ঈমানের মহড়াকারীগণ, তোমাদের উপর সিয়াম কেতাবস্থ করা হইল যেমন কেতাবস্থ করা হইয়াছিল তেমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেনো তোমরা তাকওয়া কর, অথবা… কেতাবস্থ করা হইল যেমন কেতাবস্থ করা হইয়াছিল তোমাদের কবুলকৃতগণ হইতে যেন তোমরা আল্লাহর প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হও ।’ (আল কোরান ২ : ১৮৩ )। যারা পূর্ণ ঈমান অর্জনের জন্য সাধনারত থাকেন তাদের বলা হয় আমানু। আমানু অর্থ গুরুভক্ত সাধক। কোরানে উল্লিখিত কেতাব শব্দটির সর্বজনিন রূপক অর্থ মানবদেহ। গুরুভক্ত সাধকগণই কেবল একথা সত্যিকার উপলব্ধি করতে পারেন যে তাদের উপর সিয়াম দেয়া হয়েছে দেহস্ত করে, অর্থাৎ দেহের সঙ্গে জড়িত করে। প্রত্যেক মানব সত্তার সাথে সিয়াম অর্থাৎ ‘দেহমন বিসর্জন’ জড়িয়ে আছে প্রকৃতিগতভাবে কিন্তু আমানু সাধক ব্যতীত সাধারণ অমনোযোগী মানুষেরা সেটা উপলব্ধি করে না। যদিও সবাই জানে যে, মৃত্যুর মাধ্যমে আপন সত্তা থেকে দেহমন বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে। মূলত সিয়াম কোনো নতুন বিষয় নয় বরং সর্বকালের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। আমানু সাধকগণ যাদেরকে সম্যকভাবে আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে একমাত্র কামেল মুর্শেদগণই কেবল সিয়ামকে দেহস্ত করতে পেরেছেন অর্থাৎ তাঁরা আপন দেহমন হতে আপন সত্তাকে স্বাভাবিক মৃত্যুর পূর্বেই বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং আমানুগণের লক্ষ্য হলো দেহমন বর্জনের জন্য গুরুর প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হওয়া।
‘গণনাকৃত সময় সমূহ সিয়াম, অতএব তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত অথবা ভ্রমণের উপর আছে তাহার গণনা পরবর্তী কালসমূহের প্রতিটি হইতে (গ্রহণীয়)। এবং যে শরাঘাত খাওয়া তাহার উপর মুক্তিপণ রহিল একজন মিসকিনকে আহার্য দান। তারপর যে ব্যক্তি ততোধিক সৎকর্ম স্বেচ্ছায় করে উহা তাহার জন্য কল্যাণকর। এবং যদি সিয়াম কর, তোমাদের জন্য (তাহা) কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝিয়া থাক।’ (আল কোরান ২ : ১৮৪ )।’ গণনাকৃত সময়সমূহই সিয়াম কাল। এই কথার মধ্যেই মূল সিয়ামের নিগুঢ় তত্ত্ব নিহিত আছে। সপ্ত ইন্দ্রিয় পথে ধর্মরূপে যেসব বিষয়বস্তু মস্তিষ্কের দিকে আসে তাহার প্রত্যেকটি বিষয় এক এক করে হিসাব মতো বর্জন করার পদ্ধতির নাম সিয়াম। পীড়িত এবং ভ্রমণরত অবস্থায় বিষয়গুলির প্রত্যেকটির আগমণকে গণনা করে বর্জন করা সম্ভব হয় না। এইজন্য এইরকম দুই অবস্থায় সিয়াম করা নিষেধ করা হয়েছে। তবে অবশ্য পালণীয় সিয়াম হিসাবে পরবর্তী সময়ে এটা পূরণ করার নির্দেশ রয়েছে। যে ব্যক্তি গুরুভক্ত কিন্তু এখনও জীব পর্যায়ভুক্ত অর্থাৎ আমানু হয় নি সে ব্যক্তি সিয়াম সাধনা করতে যেয়ে বিষয়বস্তুর তীরাঘাত এতো বেশি খায় যে, প্রকৃত সিয়াম সাধনা তার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, এ ক্ষেত্রে তার জন্য ব্যবস্থা হলো- একজন গুরুভক্ত মিসকিনকে খাদ্যবস্তু দান করা। মিসকিন তাকেই বলে যিনি গুরুভক্ত এবং আল্লাহ প্রাপ্তির জন্য সংসার ও সকল দুনিয়াবি সংশ্লিষ্টতা তথা সকল বিষয়বস্তুর মোহ ত্যাগ করে সর্বহারা হয়েছেন। যদি কেহ একজন মিসকিনকে খাদ্যবস্তু দানের পরেও অন্যান্য প্রকার সৎকর্ম করে তবে সেটা বেশি কল্যাণকর। অপরপক্ষে যদি কেহ সিয়ামের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করে সকল প্রকার প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও সিয়াম সাধনায় দৃঢ়ভাবে লিপ্ত থাকে তবে সেটা তার জন্য অবশ্য কল্যাণকর।
‘রমজান মাস ইহাতে কোরান নাজেল হয় যাহা মানুষের জন্য একটি হেদায়েত এবং হেদায়েতেরে একটি ব্যাখ্যা এবং ফোরকান। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এই মাসকে প্রত্যক্ষ করে সে-ই সিয়াম করে। এবং তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত অথবা ভ্রমণের উপরে আছে তাহার গণনা পরবর্তী কালসমূহের হইতে গ্রহণীয়। তোমাদের সহিত যাহা সহজ তাহাই আল্লাহ ইচ্ছা করেন এবং তোমাদের সহিত যাহা কঠিন আল্লাহ তাহা ইচ্ছা করেন না; এবং গণনাটিকে কৃতকার্য করিয়া তোলার জন্য এবং যে হেদায়েত তোমাদিগকে দেওয়া হইয়াছে তাহার (আদর্শের) উপরে আল্লাহকে বড় করিয়া তোলার জন্য এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পার।’ (আল কোরান ২ : ১৮৫)। ‘কোরান নাজেল হওয়া’ কথাটি সর্বকালীন এবং সর্বজনিন একটি বিষয়। সাধকের কাছে তাঁর আলোকিত সূক্ষ্ম মস্তিষ্ক থেকে আত্মদর্শনের পূর্ণাঙ্গ যে পাঠ নাজেল হয় বা বের হয় তাকেই বলা হয়েছে কোরান। পূর্ণাঙ্গ সাধকের আত্মদর্শনের পাঠকে অর্থাৎ অভিব্যক্তিকেই কোরান বলে। আরবি কোরান এ সকলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। কোরানই খোদাভক্ত মুত্তাকি মানুষের জন্য একমাত্র হেদায়েত বা সুপথ প্রদর্শনকারী। কোরান সাধকের ‘রমজান মাস’ অর্থাৎ শিরিক পরিত্যক্ত কাল ব্যতীত অন্য সময় নাজেল হয় না। চরম সাধক থেকে আগত কোরান অর্থাৎ পরম একজন গুরু থেকে আগত কোরান ইনসানের জন্য হেদায়েত। ইনসান থেকে নিম্ন পর্যায়ের মানুষের জন্য কোরান হেদায়েত নয় ( ২ : ২)। সৎগুরু তাঁর নিজ থেকে আগত কোরান শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থ ভক্ত জীবগণকে ইনসান বানিয়ে থাকেন ( ৫৫ : ১)। এই রকম ইনসান তথা মোত্তাকিদের জন্যই কোরান হেদায়েত। জীব প্রকৃতির মানুষের জন্য কোরান বোধগম্য বা যোগ্য নয়। কামেল গুরু থেকে শিক্ষা লাভের পর শিষ্যগণ কোরানের প্রকৃত জ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করে ইনসানে পরিণত হয়ে থাকেন।
সায়েমের কাছে তাঁর সিয়ামের কালে হেদায়েতের ব্যাখ্যা এবং ফোরকান নাজেল হয়। মানব জীবন সার্থকভাবে মুক্তির দিকে পরিচালনার জন্য সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে যত প্রকার হেদায়েতের (এঁরফবহপব) প্রয়োজন হয় তার সব ধরনের জ্ঞানে একজন সায়েম পরিপূর্ণ হয়ে থাকেন। সিয়াম সাধনার সময়ে সিয়ামের ফলশ্রুতি স্বরূপ সায়েমের কাছে ফোরকান অর্থাৎ ভাল-মন্দ প্রভেদ জ্ঞান তথা সকল বিষয়ের পার্থক্যকারী জ্ঞান নাজেল হয়, যার দ্বারা বস্তুর বন্ধন থেকে মুক্তিপথের সঠিক দিক্ নির্দেশনা পাওয়া যায়। সিয়াম করা অর্থ সপ্ত ইন্দ্রিয় পথে যে সকল বিষয়াশয় মস্তিষ্কে প্রবেশ করে তার মোহ বর্জন করা। এইরকম মোহ বর্জনের গুরুত্ব যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় অর্থাৎ উপলব্ধি করে সেই ব্যক্তিই কেবল এই মাসে সিয়াম করে। অন্য লোকেরা কেবল পানাহারের সময়সূচির বিধান পালন করেই আত্মপ্রসাদ অনুভব করে। অনেকে আবার রসনা সংযমের পরিবর্তে রসনা বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েন। পীড়া এবং ভ্রমণ, এসব দৈহিক এবং মানসিক ঊভয় প্রকারের হয়ে থাকে। মানসিকভাবে পীড়িত এবং বিষয়বস্তুর উপর মানসিক ভ্রমণে রত ব্যক্তির পক্ষে সিয়াম পালন করা সম্ভবপর হয় না বিধায় তাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে যেন তারা সিয়াম পালনের উপযুক্ত মানসিক যোগ্যতা অর্জনের পর তা ‘পালন করিতে’ যতœবান হয়। ‘পালন করা’ কথাটি এখানে নাই, রয়েছে গণনা করার কথা। কোরানের কথা হচ্ছে : পরবর্তী কালসমূহের অর্থাৎ প্রতিটি ধর্ম আগমণের কালসমূহ থেকে আগমণকারী সকল ধর্মকে এক এক করে গণনা করা। এর অর্থ আগমণকারী প্রতিটি ধর্মই যেনো তার জ্ঞাতসারে আগমণ করে এবং বিদায় গ্রহণ করে। এর ফলে বস্তুবাদের মোহের ছাপ তথা শিরিক বা সংস্কার মস্তিষ্কে আবদ্ধ হয়ে থাকে না, সকলই পরিত্যক্ত (জবলবপঃবফ) হয়ে যায়। এটাই সিয়ামের মূল কথা। সিয়ামের অভ্যন্তরীণ কথাটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আনুষ্ঠানিক সিয়াম পালনের ক্ষেত্রেও দৈহিকভাবে অসুস্থ এবং দৈহিক ভ্রমণকারীর সিয়াম পালন নিষিদ্ধ করে তা পরে পালন করা ওয়াজেব অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় করা হয়েছে।
পূর্ণ সিয়াম পালনের সহায়ক অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে :
১. সেহ্রি : ঞড় ঃধশব ধ সড়ৎহরহম সবধষ বা ঊষাকালের পূর্ববর্তী নাস্তা। হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (আ.) বলেছেন : ‘সেহ্রি কর, কারণ নিশ্চয় সেহ্রির মধ্যে বরকত আছে।’
‘বরকত’ অর্থ বৃদ্ধি বা বর্ধিষ্ণু, প্রাচুর্য আনয়নকারী, প্রাচুর্যদাতা। সেহ্রি গ্রহণের ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে না। এতে সায়েম মস্তিষ্কে আগত বিষয়রাশীর সাথে জড়িত চিন্তাগুলিকে বিশ্লেষণ করে তার মধ্য থেকে দুনিয়ার মোহকে বিচ্ছিন্ন করার আত্মিক শক্তি অর্জন করেন।
২. তারাবিহ : ‘তারাবিয়াৎ’ থেকে ‘তারাবিহ’। ‘তারাবিয়াৎ’ অর্থ ধীরতা, স্থিরতা। একাকী ধীরে সুস্থে, আপন মর্জি মাফিক (ডরঃয ভৎবব ংঃুষব) পালন করার সালাত তারাবিহ। তারাবিহ সালাত সাধারণত ৪ রাকাত থেকে ৮ রাকাত দীর্ঘ করে পড়া যায়। মস্জিদে জামাত করে ২০ রাকাত তারাবিহ সালাত মাওলানা রাসুলুল্লাহ্র (আ) দেহ ত্যাগের ৭ বছর পর হযরত ওমর নববিধান (বেদাত) হিসাবে প্রচলন করেন। মওলা আলী (আ) তাঁর শাসন আমলে এটি বন্ধ করেন এবং আমির মাবিয়া তার আমলে এটি আবার প্রচলন করেন।
৩. বেসাল : রাত দিন ২৪ ঘণ্টায় একটি একদিনের সিয়াম হয়। ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ একাধারে তিন দিন দুই রাত পানাহার ত্যাগ করে ধ্যানের গভীরতা সৃষ্টির জন্য যে সিয়াম পালন করা হয় তাকে সিয়ামে বেসাল বলা হয়। রমজানের দীর্ঘ একমাস পানাহার বর্জন করেও সত্যিকার সিয়াম পালনের আদর্শগত ব্যবস্থা হিসাবে রাসুলুল্লাহ্ (আ.) ‘সিয়ামে বেসাল’ পালনের মাধ্যমে নমুনা স্বরূপ দেখিয়েছেন। যাতে মানুষ আনুষ্ঠানিক সিয়ামের মৌলিকত্ব ভুলে না যায়।
৪. এতেকাফ : ‘এতেকাফ’ এর শাব্দিক সাধারণ অর্থ কোনো জায়গায় অবস্থান করা বা থাকা। ধর্মীয় পরিভাষায় সংসার কর্তব্য থেকে দূরে থেকে দুনিয়া হতে মনের সংশ্লিষ্টতাকে বিচ্ছিন্ন করে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন, বিশেষ কোরে চলতি নিয়মানুসারে রমজানের শেষ দশ দিন মস্জিদে থেকে আল্লাহ্র ধ্যান সাধনায় নিমগ্ন থাকায় এতেকাফ।
৫. লাইলাতুল ক্বদর : ‘লাইলাতুল ক্বদর’ অর্থ শক্তিশালী রাত (মনের মহাশূণ্য অবস্থা)। সিয়াম সাধনার গভীরতার মধ্যে বিষয়বস্তুর বিষাক্ততাকে দর্শন ও বর্জনের নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মাধ্যমে সাধক এই শক্তিশালী মানসিক অবস্থা লাভ করেন। একাগ্রভাবে গুরুমুখি ধারায় সঠিকভাবে সিয়াম পালন করলে ক্বদর রাত্রির সন্ধান পাওয়া যায়। যার ফলে সাধকের কাছে নাজেল বা স্পষ্ট হয় কোরান, হেদায়েতের ব্যাখ্যা এবং ফুরকান। রমজানের নৈসর্গিক একটি রাত্রিকে ক্বদর রাত্রি হিসাবে পালন করা চলমান সমাজে একটি প্রতীকি ব্যাপার মাত্র। সাধকের জীবনে যে কোনও সময়ই ক্বদর রাত্রির আবির্ভাব হতে পারে।
৬. ইফতার : ‘ফাতারা’ শব্দ থেকে ‘ইফতার’ শব্দটি এসেছে। ‘ফাতারা’ অর্থ দেহমন ভেঙ্গে ফেলা। যাতে করে পুনরায় দেহমনের সমন্বয়ে নবজন্ম লাভ না হয়।
২৪ ঘণ্টা বা একদিন, ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন অথবা একমাস কিংবা জীবনভর সিয়াম সাধনার একটাই লক্ষ ইফতার লাভ করা।
ইফতার দুই প্রকার । যথা : এক. জাহেরি ইফতার ও দুই. বাতেনি ইফতার। গুরুর তত্ত্বাবধানে আপন অস্তিত্বের দিকে আগত বিষয়রাশীকে বিষমুক্ত করে মন থেকে দেহের আকর্ষণকে বিচূর্ণ করার ম্যাধমে যে আত্মমুক্তি ঘটে মূলত তাই ইফতার। সাধারণভাবে আমরা রমজান মাসে যখন যা পানাহার করি তাই বস্তুগত বা জাহেরি ইফতার। আর সকল প্রকার কামনা বাসনাকে জয় করে ‘কামালিয়াৎ’ অর্জন করা তথা সৃষ্টির মোহবন্ধন থেকে মুক্তিলাভের আত্মিক শক্তি অর্জন করার নামই হলো প্রকৃত ইফতার। কামেল মুর্শেদ বা গুরুর তত্ত্বাবধান ছাড়া একা একা এই ইফতার লাভ করা যায় না। যিনি নিজে কামালিয়াৎ লাভ কোরে ইফতার প্রাপ্ত হয়েছেন তিনিই কেবল তার একনিষ্ট অনুসারীকে পূর্ণ ইফতার করাতে পারেন। নিজে ইফতার প্রাপ্ত অর্থাৎ কামেল না হলে অন্যকে ইফতার করানো সম্ভব নয়। তাই মহান আল্লাহ্তায়ালা নিজে বলেছেন : ‘রমজান আমার জন্য, তাই আমি নিজ হাতে ইহার প্রতিফল দান করি এবং আমি নিজেই রমজানের সিয়াম সাধনার প্রতিফল তথা ইফতার।’
সুতরাং, পৃথিবীতে সৃষ্ট দেহধারী প্রতিটি মানুষের দেহমনের সঙ্গে সিয়াম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা দেখা, শোনা, বলা, করা, খাওয়া, চলা-ফেরা, চিন্তা-ফিকিরসহ সকল পর্যায়ে সবধরনের সংস্কারের মোহত্যাগসহ খারাপ চিন্তা ও বিষয়বস্তু থেকে নিজেকে বিরত রাখার নাম সিয়াম। এই সিয়াম মানবজীবনকে সকল প্রকার ভ্রান্তি থেকে ক্রমশ সুরক্ষা দেয়। এবং বিশেষ পর্যায়ে সাধক বা সায়েম সকল বস্তুগত নির্ভরতা পরিত্যাগ করে মহান রবের রবুবিয়াতের মধ্যে আল্লাহর পবিত্র গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে স্থায়ী রেজেক লাভ করেন। পরিশেষে মহান রবের দর্শনলাভের মধ্যদিয়ে মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যুকে জয়লাভ করার শক্তি অর্জন করে জগৎবাসীর হেদায়েতের অধিকার লাভ তথা অলিত্ব অর্জন করেন। যা মানবজীবনের পরম পাথেয়। মাওলা আমাদের সকলকে পবিত্র রমজানের হাক্বিকতলাভের তৌফিক দান করুন। পৃথিবীতে আগত অনাগত সকল সৃষ্টির কল্যাণ হোক।
লেখক: কবি, লেখক ও গবেষক, রাজশাহী
যধংংধহৎধলধথৎধল@ুধযড়ড়.পড়স