সীমিত সেচনির্ভর ফসলে বরেন্দ্র

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৭, ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


সেচের জন্য ভূ-উপরিস্থ পানির আধার সৃষ্টি করা হচ্ছে-সোনার দেশ

জলবায়ু পরিবর্তন ও অধিক পরিমাণে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কম সেচনির্ভর ফসলের আবাদ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাতে করে পরবর্তীতে এই অঞ্চলে পানি সংকটে পড়তে না হয়। এজন্য বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। জানা গেছে, দেশের অন্য অঞ্চলের ন্যায় বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভের পানির স্তর মোটেই সমৃদ্ধ নয়। তাই এ অঞ্চলে গভীর নলকূপ বা অগভীর নলকূপের পানি উত্তোলন ও ব্যবহার সীমিত হচ্ছে। সেই সাথে এর বিকল্প হিসেবে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংরক্ষণ করার জন্য পাতকূয়া, খাল, বিল, নদী, বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এজন্য চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ১০৫টি পাতকূয়া খনন করা হয়েছে। কুয়ায় জমান পানি খাবার ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারসহ কম সেচ লাগে এরূপ ফসল চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।
এ দাবি করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত মনিটরিং কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, সন্তোষজনক পানি পাওয়ার জন্য প্রায় ৪৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১২০-৩০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা প্রয়োজন হয়। কুয়ার অনেক নিচে থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে দড়ি বালতি ব্যবহার করে পানি উত্তোলন করা বেশ কষ্টসাধ্য। অসুবিধা দূর করতে সোলার প্যানেল ব্যবহার করে পানি উত্তোলন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সোলার প্যানেলগুলো প্রচলিত লম্বা সারিতে ব্যবহার না করে কিছুটা ফানেল আকৃতি করে স্থাপন করা হয়। যাতে বৃষ্টির পানি জমে কুয়ায় পতিত হয়। পাতকুয়ার জমা হওয়া পানি সাবমারসিবল সোলার পাম্প ব্যবহার করে কুয়ার উপর স্থাপিত ট্যাংকিতে জমা করা হয়। ট্যাংকিতে জমাকৃত পানি পিভিসি পাইপ লাইনের মাধ্যমে পাতকুয়ার নিকট স্থাপিত ট্যাপ থেকে পানি পান করা ও গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি সেচের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, গোমস্তাপুর ও নাচোল, নিয়ামতপুর, মহাদেবপুর, পতœীতলা, ধামুইরহাট, সাপাহার ও পোরশা ৯টি উপজেলায় ৪৫০টি পাতকুয়া খনন করে ১৩৫০ হেক্টর জমিতে স্বল্প সেচের ফসল উৎপাদনসহ ৩৩ হাজার ৭৫০ জনকে খাবার ও গৃহস্থালির কাজে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এদিকে দেশের অন্য এলাকার চেয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনায় অনেক কম হয়। সেই সাথে সংস্কারের অভাবে নদী ও বিলগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে করে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ৩২৫০ টি পুকুর ও ১৫৭০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এছাড়া বরেন্দ্র এলাকার ভূমি উঁচু-নিচু হওয়ায় পানি সংরক্ষণের জন্য খালে ৭২৫টি ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়েছেÑ যা এক লাখ একর জমিতে এসব পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়াও নওগাঁর পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নে বছরব্যাপি সেচ কার্যক্রমের জন্য ১৭ একরের একটি জলাধার পুনঃখনন করা হয়েছে। সেচ কার্যক্রমে নদীর পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মানদী থেকে ২টি স্থাপনা থেকে ৪৮ কিউসেক পানি উত্তোলন করে ৩.৫ কিলোমিটার দূরত্বে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সরমংলা খালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। খাল থেকে বিভিন্ন স্থানে পাম্পের মাধ্যমে ২৫০০ হেক্টর জমিতে বছরব্যাপি সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই স্থানে নদী থেকে পানি উত্তোলন করে ৫টি পুকুরে পানি স্থানান্তর করে ৪০০ হেক্টর বৃষ্টি নির্ভর এক ফসলি জমিতে বছরব্যাপি সেচের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুঠিয়ার ইউসুফপুরে পদ্মা নদীর পানি উত্তোলন করে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালে স্থানান্তর করে ১২০০ হেক্টর জমিতে বছরব্যাপি চাষাবাদের জন্য গৃহীত প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও পদ্মা, মহানন্দা ও আত্রাই নদী হতে পাম্পের সাহায্যে ২০০ কিউসেক পানি উত্তোলন করে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য ২৭৮টি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও ভূ-পরিস্থ পানি সংরক্ষণ করে সেচকাজ সহ অন্য কাজে ব্যবহার করার জন্য পুঠিয়া উপজেলার জগদিশপুরে বারনই নদীতে রাবারড্যাম স্থাপন করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ৩০ কিলোমিটার অংশ এবং নদী সংলগ্ন ২০টি খালে ২০০টি সেচ যন্ত্র স্থাপন করে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বছরব্যাপি সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মতে, বরেন্দ্র এলাকার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় জলাধারগুলো দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভরাট হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে বর্ষাকালে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষি কাজে অচল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে এবং শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিএমডিএ বড় বড় খাল পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে রাজশাহীর পবা উপজেলায় ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৩০ মিটার প্রস্থের জোহা খাল এবং নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার প্রস্থের রক্তদহ খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে আমন ধান চাষে পানি ব্যবহারের পাশাপাশি খালে সংরক্ষিত পানি দিয়ে রবি মৌসুমে জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল হোদা বলেন, বোরো ধান উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। তাই সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর জন্য বোরো ধানের পরিবর্তে সীমিত সেচনির্ভর ফসল চাষে কৃষকদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট মোকাবিলা করার জন্য বোরো চাষের আবাদ কমিয়ে দিয়ে গমসহ অন্য ফসল ( যেসব ফসলে পানি কম ব্যবহার হয়) চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে সরকার থেকে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশের যে অঞ্চলে পানির সমস্যা নেই। সেখানে বোরো আবাদ করার জন্য বলা হয়েছে। এসব অঞ্চলে আউস-আমন ধান আবাদ করতে কম পানি লাগে। তাই এসব চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যাতে করে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে পানির ভূগর্ভস্থ স্তর ঠিক রাখা যায়।
অন্যদিকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বোরো ধান চাষ হ্রাস পাওয়ায় আউস ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উন্নত জাতের ধান বীজ ব্রি-ধান-৪৮ ও বি-ধান ৫৫ সরবরাহ ও এর ওপর প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত আউশ ধানের বীজে হেক্টর প্রতি উৎপাদন ৩.৫০ টন এবং ব্রি-ধান-৪৮ ও ব্রি-ধান ৫৫ ধানের উৎপাদন হচ্ছে হেক্টর প্রতি ৫টন। এছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচুর পতিত জমি আছে। পানির অভাবে এগুলোকে কৃষি কাজের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্ষাকালে এসব অঞ্চলে আমন ধানের চাষ হলেও যথা সময়ে বৃষ্টির অভাবে উৎপাদন অনেক কম হয়। সীমিত সেচনির্ভর তুলা চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষিবিদরা জানান, বোরো মৌসুমে ১ কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। অথচ সমপরিমাণ গম উৎপাদন করতে ধানের তিনভাগের একভাগেরও কম পানির প্রয়োজন হয়। এছাড়া ডাল, মসলা, সবজি আবাদে পানি সেচ আরো অনেক কম লাগে। সে দিকেই কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এতে করে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ