সেলিম প্রধানের সহচর শিবগঞ্জের কেনাল আলী

আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


ক্যাসিনো, মানি লন্ডারিং ও মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক ও বেআইনি কাজ করা অপরাধে আটক সেলিম প্রধানের ঘনিষ্ট সহচর শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কেনাল আলীর বিরুদ্ধে মাদক, জাল টাকা ও চোরাকারবারের অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কেনাল আলী বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার মালিক। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগে কেনাল আলী ইট ভাটার একজন শ্রমিক ছিল। ভাটায় কাজ করার সময় ভাগ্যক্রমে সেলিম প্রধানের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তাতেই তার ভাগ্য খুলে যায়।
সেলিম প্রধানের সঙ্গে কেনাল আলী যোগসাজস করে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শিবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক ও জাল টাকার বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে কেনাল আলী বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থের বিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কয়েকটি গোষ্ঠীকে দিয়ে বিভিন্ন নামে অশ্লীল মন্তব্য, অসামাজিক কথা, বিভিন্ন হুমকি দেয়া অব্যাহত রেখেছে। শুধু তাই নয়, তাদের দিয়ে বিভিন্ন মহলে চাঁদাবাজিও শুরু করেছে কেনাল আলী।
আর চাঁদাবাজদের নিরাপত্তা দিতে কেনাল আলী সরকারের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগযোগ রাখছে। ফেসবুকে তার সমর্থক গোষ্ঠিকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে গেঞ্জি বিতরণসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। সরকারের ওই উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও শিবগঞ্জের সন্তান বাড়ি আসার সময় কেনাল আলী লাখ লাখ টাকা খরচ করে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে যান তাকে অভ্যর্থনা জানাতে। তিনি যতদিন শিবগঞ্জে অবস্থান করেন ততদিন যত টাকাই খরচ হোক তা বহন করে এ কেনাল আলী। একটি সূত্রে মতে, শিবগঞ্জের ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সামনে সংসদে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন এবং কেনাল আলী ইউপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন।
অভিযোগে প্রকাশ কেনাল আলী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বাক্ষর জাল করে শিবগঞ্জে গরুর খাটালের মালিক করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের খালেকসহ আরো কয়েকজনকে।
এব্যাপারে স্বারাষ্ট্র মন্ত্রী ও তার পিএসের স্বাক্ষর জাল করার দায়ে কেনালসহ তার দোসরদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দিলেও এপর্যন্ত কেনাল গ্রেফতার হয়নি। তারা গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে সরকারি নিয়ম বহির্ভুতভাবে। আর চাঁদার টাকার বেশির ভাগ যায় কেনালসহ অন্যাদের পকেটে। সাম্প্রতিককালে রুবেলের মালিকানাধীন মাসুদপুর গরুর খাটালে ৬০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করতে গিয়ে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রিজবী আলম রানাসহ কয়েকজন বিজিবির হাতে আটক হয়ে জেল হাজতে থাকার পর জামিনে আছে।
তবে এ ব্যাপারে খাটাল মালিক বলেন, টাকাগুলো ভারতীয় সিন্ডিকেটের ছিল। অপরদিকে রানা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। সাম্প্রতিক কালে শিবগঞ্জ থানা পুলিশ পাকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যন মজিবুরসহ তিন জনকে সাড়ে ৭ হাজার ইয়াবাসহ আটক করলে কেনাল আলী ও সরকারি কর্মকর্তার তদবিরে মজিবুর রহমান ছাড়া পেয়ে যায়। গত ২৯ সেপ্টম্বর তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘চাঁদাবাজিতেই কোটিপতি ইটভাভাটার শ্রমিক কেনাল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর কেনাল আলী আত্মগোপনে আছে। অনেকের ধারণা সে ভারতে পালিয়ে আছে এবং সেখান থেকে তার মাধ্যমে প্রতিদিন মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক শিবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসছে।
এব্যাপারে কেনাল আলীর সঙ্গে বাবার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শিবগঞ্জ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতা জানান, আওয়ামী লীগ ঐতিহ্যবাহী ও সবচেয়ে বড় দল। সামান্য কিছু লবিংগ্রুপিং থাকতেই পারে। কিন্তু একজন সরকারি উর্দ্ধতন কর্মকর্তা যিনি শিবগঞ্জের কৃতি সন্তান বলে সুনাম অর্জনও করেছেন। তার ইন্ধনে কিভাবে সেলিম প্রধানের ঘনিষ্ট সহচর সহ একদল চোরাকারবারী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। কিভাবে তার নামে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সমর্থক গোষ্ঠী পরিচয় দিয়ে গেঞ্জি, শার্ট, ক্যাপসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস বিতরণ করে ও কোটি কোটি টাকা খরচ করে। এটি রাজনৈতিক চর্চা হতে পারে না। আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেনালের মত চোরাকারকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট প্রধানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
পাকা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও রঘুনাথপুর গরুর বিট খাটালের পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও উচ্চ আদালতের আদেশ আমার পক্ষে থাকার পরও সেলিম প্রধানের ঘনিষ্ট সহচর কেনাল আলী ও আবদুল খালেক গায়ের জোরে রঘূনাথপুর গরুর বিট পরিচালনা করছেন। তিনি আরো বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার তৎকালীন পিএস এর স্বাক্ষর জাল করার দায়ে কেনাল আলীকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিলেও আজও গ্রেফতার হয়নি। যার ইন্ধনে কেনাল ও তার সহচররা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার দাবি করছি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান জানান, ক্যাসিনো, মানি লন্ডারিংও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে প্রশাসনের হাতে আটক সেলিম প্রধানের ঘনিষ্ট সহচর জিরো থেকে হিরো- বর্তমানে কোটিপতি কেনাল কোনোদিনই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। যাদের ইন্ধনে কেনালের মত আরো অনেকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শুদ্ধি অভিযানে কেউ ছাড় পাবে না। তিনি আরো বলেন, আশা করি শিবগঞ্জেও শিগগিরই অভিযান শুরু হবে।
সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমদ শিমুল বলেন, কেনাল আলী আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শুদ্ধি অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাদক ও চোরাচালনে মত অপরাধের সঙ্গে জড়িত যেই হোক না কেন কেউ ক্ষমা পাবে না। এ ক্ষেত্রে আমি প্রধান মন্ত্রীর নিদের্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। এটিই জনগণেরও চাওয়া পাওয়া।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ