সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত চরাঞ্চলের হাজার মানুষ || চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব, চর আষাড়িয়াদহ থেকে ফিরে


সৌর বিদ্যুতের আলোয় উল্লসিত চরের মানুষ-সোনার দেশ

ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন। গোদাগাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়ন। গোদাগাড়ীর বিদিরপুর থেকে আধা ঘণ্টায় উত্তাল পদ্মা নদী পার হয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়। সেইগ্রামে খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার সংকট থাকলেও সৌর বিদ্যৎ থেকে উৎপন্ন আলোয় আলোকিত হচ্ছে তাদের গ্রাম। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের ছোঁয়ায় পরিবর্তন এসেছে তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনেও। তবে বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় হতাশ তারা।
ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে মোট ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। সব মানুষের দোরগোড়ায় বিদ্যুতের ছোঁয়া পৌঁছাতে না পারলেও প্রায় ১৩ হাজার মানুষের দোরগোড়ায় বিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছে দিয়েছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডিসিওএল)। এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠান আভা-মিনি গ্রিড প্রজেক্ট চর আষাড়িয়াদহে ৫৯৪ পিস সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে ৬টি গ্রামে বিদ্যুতের সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এসব সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ১৪৮ দশমিক ৫০ কিলোওয়াট। এর মাধ্যমে ১৩০০ মিটার চালানো হয়। একটি মিটারের অধীনে ১০ জন মানুষ থাকলে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ বিদ্যুতের সেবা পেয়ে থাকে। চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের আষাড়িয়াদহ, পানিপার, ভুবনপাড়া, কানপাড়া, হনুমান্তনগর ও নওশেরা গ্রামের মানুষরা বিদ্যুতের সেবা পেয়ে থাকেন।
আভা-মিনি প্রজেক্টের প্ল্যান্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মিল্লাত হোসেন জানান, ২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর সৌর প্যানেলের কার্যক্রম শুরু হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছয়টি গ্রামের বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করা হয়। দিনে সৌর প্যানেলগুলো সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে। সেই জমাকৃত বিদ্যুৎ সংযোগ লাইনের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যায়। চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলে সেগুলো জমা থাকে। সেই জমাকৃত বিদ্যুৎ রাতে সরবরাহ করা হয়। একটি মিটার থেকে কয়েকটি বাল্ব, ফ্যান ও টেলিভিশন চালানো যায়।
গত দুই বছর আগেও ওই ইউনিয়নে বিদ্যুৎ ছিল না। তখন বিদ্যুতের চার্জ করার জন্য আধাঘণ্টার পদ্মা পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হতো বিদিরপুরে। বিদিরপুর থেকে মোবাইল, ব্যাটারি চার্জার চার্জ দিয়ে নিয়ে যেত গ্রামের বাসিন্দারা। আর এখন বিদ্যুৎ পেয়ে তারা বাড়িতে বসেই মোবাইলে চার্জ দিতে পারে। টিভি সেটের সামনে বসে পছন্দের অনুষ্ঠান দেখতে পারে। আর গরমকালে বিদ্যুতের ছোঁয়ায় পায় ঠাণ্ডা ফ্যানের বাতাস। রাতে ঘর আলোকিত করে বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো।
ভুবনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, আগে মোবাইলে চার্জ দিতে পদ্মা নদী নৌকায় পার হয়ে ওই পারে গিয়ে চার্জ দিতে হতো। আর এখন সেই সমস্যা নেই। সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পেয়ে আলো জ্বালানো যায়, টিভি দেখতে পারি আর ফ্যানের বাতাস তো পাওয়া যায়। রাতে ছেলেমেয়েরা বিদ্যুতের আলোয় পড়ালেখা করতে পারে।
কানপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলেয়া বানু বলেন, বিদ্যুৎ আসার পরে গ্রামের অনেক পরিবর্তনই হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের কারণে রাতে আলো জ্বালানো যায়। আগে অন্ধকারে কষ্ট হতো। এখন টিভিও দেখতে পারি। তবে বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি মিটার প্রি-পেইড। আগে টাকা দিয়ে ইউনিট কিনে নিয়ে যেতে হয়। প্রতি ইউনিটের মূল্য ৩০ টাকা।
কানপাড়া এলাকার বাসিন্দা তাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতি ইউনিটের দাম বেশি। শহরের মানুষরা যেখানে ৭ টাকা ইউনিট প্রতি খরচ করে সেখানে আমাদের খরচ করতে হয় ইউনিট প্রতি ৩০ টাকা। এত টাকা খরচ করা সম্ভব হয় না। এইজন্য হিসেব করে প্রতিটি পরিবারই বিদ্যুৎ খরচ করে। মাসে চারশো টাকার বেশি কেউ খরচ করতে চায় না।
চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহও বলেন, বিদ্যুৎ আসায় চরাঞ্চলের মানুষের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দাম বেশি। এইজন্য চরের মানুষরা খুব প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না।
আভা-মিনি প্রজেক্টের প্ল্যান্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মিল্লাত হোসেন জানান, পুরো প্ল্যান্টটি স্থাপন করতে ১০ কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। তখন সার্ভে করে পরিকল্পনাবিদরা মতামত দিয়েছিলেন মাসে আট লাখ টাকার মতো আয় হবে। কিন্তু এখন তিন লাখ টাকার বেশি আয় হয় না। এর ফলে কোম্পানি বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে আছে। এইজন্যই চরদিয়াড় মানিকচরে আরেকটি প্রকল্প স্থাপিত করতে চেয়েও আর স্থাপন করছেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, পুরো সিস্টেমের মধ্যেও গলদ আছে। সিস্টেমটি অনেক ব্যয়বহুল। আর এর বাইরে গ্রাহকরা খুব বেশি ইউনিটও ব্যবহার করেন না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ