‘স্বনির্ভর হয়ে উঠতে অন্যদের অনুকরণীয় বাংলাদেশ’

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০১৭, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ‘স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গল্প’ সরেজমিনে দেখে জাতিসংঘের কৃষি উন্নয়ন তহবিল আইএফএডির প্রতিনিধিরা বলেছেন, বিশ্বের অন্য দেশের জন্য ‘অনুকরণীয়’ হয়ে থাকবে বাংলাদেশ।
ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টের (আইএফএডি) অর্থায়নে বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন প্রকল্প দেখতে গত ২৬ নভেম্বর পাঁচদিনের সফরে বাংলাদেশে আসে আইএফএডির নির্বাহী বোর্ডের ১১ সদস্য।
এই সময়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারি ও কৃষকদের বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেবার আওতায় আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের খাপ-খাওয়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত ছয়টি প্রকল্প ঘুরে দেখে প্রতিনিধি দলটি। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এসব প্রকল্প ঘুরে ওইসব এলাকার মানুষদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের প্রশংসা করেন আইএফএডির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক হোনে কিম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন, তারা শ্রম দিয়ে অল্প অল্প করে নিজেদের স্বনির্ভর করে তুলেছেন। আমরা মুগ্ধ, বাংলাদেশের মানুষ খুবই পরিশ্রমী।
“আইন মেনে চলে অল্প আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে, যা আফ্রিকারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য অনুকরণীয়। বাংলাদেশকে আমরা উদাহরণ হিসেবে আমরা তুলে ধরব।”
কৃষিতে উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের খাদ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে যাত্রা শুরু করা আইএফএডি প্রথম থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে আসছে।
গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করে আসা সংস্থাটির প্রতিনিধি দল এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনে এসেছে। প্রতি বছর ঋণ গ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে একটিকে ঠিক করে সেখানে যে ধরনের পরিদর্শনে যায় তারা।
পাঁচদিনের বাংলাদেশ সফরে তিনদিন সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন হাওর এলাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেওএসএফ) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প ঘুরে দেখে প্রতিনিধি দলটি।
স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি দলও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের এসব প্রকল্প ঘুরে দেখে।
‘বাঁধে বদলেছে জীবন’ : সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নে আইএফএডির প্রতিনিধি দল ‘বাঘা বিল সাব-প্রজেক্ট’ ঘুরে দেখে, যে প্রকল্পটির কারণে বন্যা ও নদীভাঙন থেকে ফসল রক্ষা পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে কৃষকদের।
পার্টিসিপেটরি স্মল স্কেল ওয়াটার রিসোর্সেস সেক্টর প্রজেক্ট (পিএসএসডাব্লিউউআরএসপি) নামের এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অঞ্চলের নদী ভাঙ্ন, বন্যা, শুষ্ক সময়ে পানির অপর্যাপ্ততা দূর করতে ৬১টি জেলায় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকাঠামো বানানো হয়। আইএফএডি দেওয়া ৩২ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তায় এলজিইডি বাঘা বিলে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে ২০০৬ সালে, যা ২০০৯ সালে শেষ হয়। এই বাঁধ পুরো এলাকারই জীবনযাত্রা পাল্টে দিয়েছে বলে জানান এলাকাবাসীরা।
এলাকাবাসীদের প্রতিনিধি আরজুমান্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে বলেন, “আগে বন্যা হলে আমাদের ফলস নষ্ট হত, বাঁধ তৈরির পর আমাদের শুধু ফসলের চাষই বৃদ্ধি পায়নি, সেই সাথে সেচের মাধ্যমে পরিত্যক্ত জমিকে কৃষি জমিতে পরিণত করেছি।”
এলজিআরডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাঁধ নির্মাণের আগে যেখানে এক হাজার হেক্টর জমিতে তিন হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন ফসল ফলত, সেখানে বর্তমানে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফলছে পাঁচ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এছাড়া মাছ উৎপাদন ৩৪ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮৩ মেট্রিক টন।
শুধু বাঘা বিলে প্রকল্প থেকেই এলাকার ৬২৫ পরিবারের তিন হাজারের বেশি মানুষ সরাসরিভাবে উপকৃত হচ্ছে বলে জানান প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বের থাকা এলজিআরডির প্রকৌশলী মোহাম্মদ মহসিন।
আইএফএডির তথ্য অনুযায়ী, পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের ৬১ জেলার ২ লাখ আট হাজার হেক্টর জমির উৎপাদন বেড়েছে, সরাসরি উপকৃত হচ্ছে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ।
‘হাঁসের গ্রাম’: গ্রামটিতে ঢুকতেই চোখে পড়বে হাঁসের মেলা; পুকুরে হাঁস, উঠোনে হাঁস- হাঁসের ডাকে কান পাতা দায়। গ্রামটি অঞ্চলে হাঁসের গ্রাম হিসেবে পরিচিত।
সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের এই গ্রামের সব পরিবারই হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সব পরিবারের কাছেই রয়েছে গড়ে পাঁচশ-একশ হাঁস।
হাওর ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড লাইভলিহুড ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (হিলিপ) অধীনে শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ ও পরিবার প্রতি ১৫ টাকা ঋণ সহায়তা পুরো গ্রামকে পাল্টে দিয়েছে।
“আগে খাইতে পারতাম না, আর এখন হাঁস চাষ কইরা মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় হয়,” বলছিলেন রইস মিয়া। কৃষি কাজের পাশাপাশি হাঁস পালন করছেন তিনি, একশ হাঁস রয়েছে তার।
এই প্রকল্পে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে এলাকার নারীদের। হাঁস প্রতিপালনের প্রশিক্ষণ নিয়ে সাবলম্বী হয়ে উঠেছেন বলে জানান তারা। ৫০০ হাসের মালিক ফয়জুন্নেসা বলেন, “স্বামী থেকে টাকা নিতে হয় না আর, হাঁস পাইলা নিজেই আয় করতেছি। ছেলে-মেয়েরে স্কুলে দিছি, ভাল খাবার খাইতে পারতেছি।” হিলিপের এই প্রকল্পে দরিদ্র নারীদের গৃহপালিত পশু-পাখি প্রতিপালন, সবজি চাষ ও সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মৌলভীবাজার ছাড়াও নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে চলমান এই প্রকল্পে ৫৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছে আইএফএডি।
মহাজনের কবল মুক্ত জেলেরা : হিলিপ প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জের নারায়ণপুর গ্রামের দিঘা বিল ও গুজাউনি বিলের মাছ ধরার জায়গা স্থানীয় জেলেদের কাছে সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই সঙ্গে তাদের মাছ ধরা সম্পর্কে যাবতীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ায় মহাজনের কবল থেকে বেড়িয়ে স্বাধীনভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে জেলেরা।
নারায়ণপুরর একজন জেলে বলেন, “মহাজনেরা বিলে মাছ ধরতে দিত না, লুকিয়ে মাছ ধরতাম। আমাদের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো।” বর্তমানে এই দুই বিলে ৩৩ রকমের মাছ পাওয়া যাচ্ছে, দুই বিল থেকে জেলেরা বছর আয় করেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। বাঘা ও গুজাউনি বিলের মত পুরো সুনামগঞ্জের দুইশর বেশি বিল স্থানীয় জেলেদের লিজ দেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এই প্রকল্পের আওতায়।
‘সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিন ঘুরিয়েছে জীবনের চাকা’ : সুনামগঞ্জের ‘মাকলুদা টেইলরিং হাউজ’, এক নামে চেনে এলাকাবাসী। পাঁচ বছর বয়সে টাইফয়েডে পা হারান মাকলুদা। তিন বছর আগে এলজিআরডি থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড সেলাই মেশিন কেনেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে সালোয়ার-কামিজ, শার্ট, প্যান্টসহ পোশাক সেলাইয়ের কাজ শুরু করার পর এখন মাকলুদার রয়েছে মুরগি ও মাছের আলাদা খামার। প্রতিমাসে ১৯ হাজার টাকা আয় করছে মাকলুদা। প্রশিক্ষণ নিয়েই থেমে থাকেননি, গ্রামের ৮-১০ জন মেয়েকে বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণও দিয়েছেন তিনি। মাটির ভাঙা ঘরকে পাকা ঘরে পরিণত করেছেন নিজের টাকায়। “দোকানের অর্ডারের কাজ করি, আশে-পাশের বাড়ির কাজ করি। দুইটি ব্যাংক একাউন্টও আছে আমার,” বলছিলেন মাকলুদা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “১৫ বছর আগে আমার বাবা মারা যায়। সংসারে তখন খুব অভাব, আমি বড় মেয়ে বলে নিজের পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নেই।” তার সাফল্যে এখন গ্রামের অনেকেই সেলাইয়ের কাজ করছেন বলে জানান মাকলুদা। কাজের সহায়তার জন্য একটি নতুন সেলাই মেশিন ও দুইজন সহকারী রেখেছেন তিনি। এসব প্রকল্পে দেওয়া ঋণ সহায়তায় হাওরাঞ্চলের মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেখে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন আইএফএডির প্রতিনিধি হোনে কিম। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের পুরনো ঋণ গ্রহীতা দেশগুলোর একটি, ভবিষ্যতে এখানে সব ধরনের সহায়তা দিতে আইএফএডি আগ্রহী।” আইএফএডি থেকে তৃতীয় সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণকারী দেশ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে কৃষিতে আরও জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন প্রতিনিধি দলে থাকা আইএফএডির স্ট্র্যাটেজি ও নলেজ বিভাগের সহযোগী সহ-সভাপতি পল উইন্টার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের উচিৎ কৃষিতে আরও জোর দেওয়া, কারণ এই দেশের মানুষদের একটি বড় অংশ এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। উন্নয়নে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়ে। টেকসই উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে এদেশে কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”-বিডিনিউজ