স্বপ্নভঙ্গ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৯, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

কবির কাঞ্চন


একবুক জ্বালা নিয়ে মরতে মরতে বেঁচে আছেন মিলু করিম। একাত্তরের টগবগে এক যুবক জীবন সায়াহ্নে এসে জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি।
যে বুকে ছিল স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার আসল সুখকে হৃদয়াঙ্গম করার অদম্য স্পৃহা। হিংসা হানাহানিমুক্ত স্বদেশ পাওয়ার সহজাত প্রত্যাশা। না পাওয়ার সীমাহীন দলিলে সে বুক আজ ভারাক্রান্ত। সেই স্বপ্নিল হাতছানি স্বাধীনতার নাম করে মিলু করিমদের পায়ে পরাধীনতার কঠিন শিকল পরিয়ে দিয়েছে। পরাধীনতার সেই শিকল ছিন্ন করে স্বাধীন দেশের মৃত্তিকায় মুক্ত বিহঙ্গের মতো বিচরণের সেই ব্যাকৃলতা তার কাছে আজ শুধুই স্বপ্ন।
স্বাধীনতার এতো বছর পরও তার কপালে মুক্তজীবন জুটেনি। অর্থনৈতিক মুক্তিসহ মাথাউঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি জুটেনি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে রণক্ষেত্রের যে যুবক বীরের বেশে আপন ভিটেবাটীতে ফিরে এসেছিল। বিজয়ের প্রাক্কালে সে হারিয়েছিল জীবনের অমূল্য ধন গর্ভধারিণী মাকে।
মা-ছেলের সংসারে ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়ে একাকী জীবন কাটাচ্ছিলেন তার মা। কিন্তু হঠাৎ করে মা এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানার সঙ্গী হলেন। নিজের একান্ত প্রয়োজনেও ছেলেকে কাছে ডাকেননি। জানাননি তার জটিল রোগের কথা। ভেবেছিলেন যুদ্ধ শেষে ছেলে বীরের বেশে ঘরে ফিরে এলে তার কাছে রোগের কথা জানাবেন। যুদ্ধ শেষ হলে ঘরের ছেলে ঘরে ঠিকই ফিরলো। কিন্তু ততদিনে মিলু করিমের কাছ থেকে তার প্রিয় মা চিরতরে বিদায় নিয়ে স্বর্গের পথে হাঁটলেন।
মৃত্যুর আগে আশপাশের লোকজন ছেলেকে খবর দিতে চাইলে তিনি তাদের বারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এতে যুদ্ধে তার মনোযোগ কমে যাবে। আগে শত্রুদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলুক। দেশকে ওদের কাছ থেকে উদ্ধার করুক। দেশ উদ্ধার হলে বাঁচবে হাজারো মা। তার মায়ের এমন কথার পর কেউ তাকে মায়ের অসুস্থতার কথা জানায়নি।
যুদ্ধ থেকে ফিরে মায়ের বুকে মাথা রেখে বিস্তৃর্ণ খোলা আকাশ দেখার সাধ অধরাই থেকে গেলো তার। শুধু বাড়ির সম্মুখে অবস্থিত মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারতের সময় বিদীর্ণ হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর অশ্রুজলে সিক্ত হয়েছিল সে।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ। চারিদিকে পোড়া পোড়া গন্ধ। রাস্তাঘাট ভাঙা। জমিতে উঠতি ফসল নেই। মানুষের ঘরে ঘরে অভাব অনটন লেগেই আছে। তারওপর মিলুর ঘরে বাবা নেই। মা নেই। আছে শুধু মায়ের মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া একখানা ভাঙাচোরা ছনের ঘর। সেই ঘরে রোদে পুড়ে বৃষ্টির জলে ভিজে আরো একটি বছর পার করে দিয়েছে সে।
এরপর বাড়ির পাশের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর চালের আড়তে সহকারীর কাজ নিয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে কাজ আর সততার মাধ্যমে আড়ৎদারের কাছে সে আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। জীবন চলার পথে সে আড়ৎদারকে একজন অভিভাবকের ভূমিকায় কাছে পেয়েছে।
এরমধ্যে আড়ৎদারের পরামর্শে সে নতুন করে সংসার জীবন শুরু করে। দেখতে দেখতে সংসারে নতুন মুখ আসে। নতুন করে খরচের অংক বড় হতে থাকে। তখনও মোটামুটি সুন্দর জীবনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। এরমধ্যে সারাদেশে দুর্ভিক্ষ লেগে গেলো। তখন ঘরে ঘরে অভাব। কেউ কারো জন্য সাহায্যের হাত বাড়াতে সাহস পায়নি। মিলু করিম যে আড়ৎদারের দোকানে কাজ করতেন তার সংসারেও অভাব নামক দৈত্য হানা দিলে তিনি বাধ্য হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। যে কারণে মিলু করিম আবার বেকার হয়ে পড়েন। কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের সংসার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। স্ত্রী, সন্তানের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে সে কাজের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ছুটতে থাকে। সকাল- দুপুর -সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। মিলু করিম কোথাও কোন কাজ পায় না। রাত দশটা বাজে। চায়ের দোকানে অলস বসে বসে ভাবতে থাকে। ঘরে বৌ-বাচ্চা না খেয়ে আছে। এখন কার কাছে যাওয়া যায়। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি বলে কাছের লোকেরা তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। ইতোমধ্যে বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকেও ধার নিতে নিতে অনেকে এখন তার কাছ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ধার চাইতে পারে এমন কারো নাম তার মাথায় আসছে না।
ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে হাওয়া বের করে দিয়ে চা বিক্রেতাকে লক্ষ্য করে বললেন,
– খালেক ভাই, আরেক কাপ চা দিন।
চা বিক্রেতা খালেক বললেন,
করিম ভাই। সেই সন্ধ্যার পর থেকে একটানা বসে আছেন। কী ব্যাপার! কোন টেনশনে আছেন বলে মনে হচ্ছে?
করিম বললেন,
– খালেক ভাই, এই জগৎ সংসারে কেউ কারো নয়। সবাই স্বার্থপরের মতো নিজের কথাই বোঝে। আর স্বার্থের সিদ্ধি হলে ভুলে যায়।
– আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। কোন বিষয় নিয়ে বলছেন?
– দেশের প্রয়োজনে নিজের সকল আরাম-আয়েশ ছেড়ে মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলাম। দেশের মুক্তির জন্য প্রিয় মায়ের শেষ বিদায়েও উপস্থিত থাকতে পারিনি। তবু জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। বেঁচে থাকার জন্য সবার দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। কেউ একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কাজ দেয়নি। করুণাও করেনি। একজন মানুষ ভালোবেসে চালের আড়তে কাজ দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই সুখও বেশিদিন আমার কপালে সইলো না। আজ মাস দুয়েক ধরে ঘরে বেকার বসে আছি। যে টাকা ছিল তা দিয়ে কিছুদিন চলেছি। তারপর নিকটাত্মীয়, বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ধার নিয়ে চলেছি। তাদের ধারদেনা সময়মতো দিতে পারিনি বলে অনেকেই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু আজ সকাল থেকে আমার বৌ-বাচ্চা না খেয়ে আছে। আর কারো কাছে চাওয়ার মতো মুখ নেই। অনেকের কাছে কাজ চেয়েছি। কেউ কোন কাজ দিলো না। তাই নিরুপায় হয়ে তোমার দোকানে এসে বসে আছি। এজন্যই কি এই দেশকে স্বাধীন করেছি?
খালেক চোখ বন্ধ করে একটু দম নিয়ে বলল,
– কি আর করবেন! দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছে। সবার ঘরে অভাব। সবাই নিজের জীবন নিয়ে চিন্তার মধ্যে আছে। এই আমার কথা ভাবেন না। সন্ধ্যার পর থেকে আপনি ছাড়া হাতেগোনা কয়জন কাস্টোমার এসেছে। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই লোকজন একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয় না। দোকানের যা বিক্রি তাতে মনে হচ্ছে, না খেয়ে মরতে হবে।
– এটাই কি আমাদের স্বাধীনতার সুফল?
– এতো ভেঙ্গে পড়বেন না। দুঃসময় এসেছে। আবার সুসময় আসবে। আমার কাছে বিশ টাকার মতো আছে। আপনি এক কাজ করুন। আমার কাছ থেকে পাঁচ টাকা নিয়ে কিছু চাল কিনুন। আর রাস্তার পাশের কচু পাতা ছিঁড়ে বাড়িতে ফিরে যান। গত কয়েক দিনে কচু পাতাও কমে গেছে। একটু পরে দোকান বন্ধ করে আমিও আসছি। তাহলে আর দেরি করার দরকার নেই।
মিলু করিম দুঃখের মধ্যে আনন্দে কেঁদে ওঠেন।
এরপর সোয়া সের চাল কিনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। কিছুদূর গিয়ে কাচা রাস্তার পাশ থেকে খুঁজে খুঁজে কচু পাতা তুলে নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন।
বাড়িতে পৌঁছে স্ত্রীর হাতে চাল আর কচু পাতা তুলে দিয়ে বললেন,
– খোকনকে দেখছি না যে।
– আস্তে বলো। ছেলেটা সকাল থেকে কিছু খায়নি। ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করেছে। তুমি আসবে বলে বুকে পাথর বেঁধে ওকে মিথ্যে সান্ত¡না দিয়েছি। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে।
স্ত্রীর কথা শোনে করিম বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মতো নিঃশব্দে দুচোখের জল ছেড়ে মাটিতে বসে পড়লেন। স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর পাশে বসে তাকে সান্ত¡না দিলেন।
কিছু মুহূর্ত পর স্বাভাবিক হয়ে স্ত্রী উনুনে ভাতের পাতিল তুলে দিয়ে রান্নার জন্য খাবার উপযোগী কচুপাতা ছিঁড়ে নিতে লাগলেন। মিলু করিমও বৌয়ের সাথে বসে কচু পাতা ছিঁড়ছেন। হঠাৎ চুলোর আগুনের লেলিহান শিখায় চোখ পড়তেই বুকের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। সে আনমনে ভাবে, এই দেশ আমার, স্বাধীনতা আমার। শুধু স্বাধীনভাবে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাটা আমার অধিকার না।
স্বামীর আবেগী চোখের জলে স্ত্রী আর্দ্র গলায় বললেন,
– তুমি আবার কাঁদছো কেন? যা হবার তা তো হবেই। মানুষের জীবনে অসময় আসতেই পারে। সেজন্য ভেঙে পড়লে তো হবে না। এতে বিপদ আরো বাড়বে। আমাদের বাঁচার উপায় খোঁজে বের করতে হবে। একাত্তরে শক্তিশালী পাক হানাদারদের পরাজিত করতে পারলে জীবনযুদ্ধের আসন্ন অভাবকেও দূর করতে পারবো। আমি ভাবছি কাল থেকে গ্রামের মহাজনের বাসায় গিয়ে একবেলা কাজ করে আসবো। তাতে আর কিছু দিক না দিক ভাতের মাড় তো দিবে। খালাম্মা খুব ভালো মানুষ। উনাকে বলে কয়ে বাবুর জন্য সামান্য ভাত আনবো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।
স্ত্রীর এমন কথার পর মিলু করিম বেশ কিছুসময় মাথাটা দুই হাঁটুর মধ্যে রেখে চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে। এরপর সোজা গিয়ে মাটির বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখটা লুকানোয়। মিলু করিম রাতের আঁধারে ঘুমের ঘোরে কষ্ট ভুলতে চায়। এ পৃথিবীকে চিরবিদায় জানাতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু ঘড়ির কাটার ন্যায় অবিরাম ছুটে চলা সময়ের পরিক্রমায় রাত শেষে ভোর হয়। রাতের নীরবতা কাটিয়ে আবার চারিদিকের সরব প্রকৃতিতে তার ঘুম ভাঙে। চোখের পাতা খুলতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে প্রশান্তি ধরা দেয়। আরও বাঁচতে ইচ্ছে করে তার। সামনে যে তার কলিজার টুকরা একমাত্র ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেকে কাছে টেনে বুকে জড়াতেই মনের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। এরপর দেশের দুর্দিনে কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে দিন কাটতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা মিলু করিমদের।
একদিন সন্ধ্যায় মিলু করিম খালেকের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় দোকানের মধ্যে একজন সাহেব প্রবেশ করলেন। মিলু করিম লোকটার আপাদমস্তক দেখে নিলো। এক কালারের প্যান্ট শার্ট পরা। তারওপর কোর্টপরিহিত ভদ্রলোকের গলায় টাই বাঁধা। গালভরা দাঁড়ি। সুন্দর কালার করা। চোখে আবার রঙিন চশমা। এরপরও মিলু করিম তাকে দেখে চিনতে পারে। দূর গাঁয়ের কারীম মুন্সী। যুদ্ধের সময় সে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর হিসেবে কাজ করেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকায় পালিয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ সম্পদশালী হয়ে গেছে। শহরে নাকি তার নিজের একটা কারখানাও আছে। এ নিয়ে গাঁয়ের লোকে প্রথম প্রথম নানান মন্তব্য করলেও এখন আর কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।
কারীম মুন্সী মিলু করিমের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল,
– আরে মিলু করিম না। কেমন আছো?
– ভালো, আ-প-নি?
মিলু করিমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
– আমি, কারীম মুন্সী। এখন ঢাকায় থাকি। তো তোমার কী খবর?
– ভাই, ভালো নেই। গ্রামের অবস্থাও ভালো নয়। এখানে কোন কাজকর্ম নাই। ছেলেমেয়েরা না খেয়ে আছে। কী করবো কোথায় যাবো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।
– আমার কাছে একটা কাজ আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তুমি তা করবে কিনা? চাকরির সুযোগ সুবিধা ভালো পাবে।
– হ্যাঁ, আমি করবো। কিন্তু কাজটা কী?
– কাজ হচ্ছে আমার ফ্যাক্টরীতে দারোয়ানের একটি পোস্ট খালি আছে। তুমি চাইলে কালই আমার সাথে ঢাকায় যেতে পারো।
– আমি যাব। কিন্তু …।
– আবার কিন্তু কেন? ওহ! বুঝতে পেরেছি বাড়িতে কিছু দিয়ে যেতে হবে, তাই না?
– জ্বি।
এরিমধ্যে কারীম মুন্সীর নির্দেশে খালেক উপস্থিত সবার সামনে চা-নাস্তা দিয়ে দেয়। নাস্তা খাওয়ার একফাঁকে মিলু করিমের হাতে নগদ পাঁচশত টাকা দিয়ে বললেন, এইগুলো রাখ।
এরপর চা-নাস্তা খাওয়া শেষে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কারীম মুন্সী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
পরদিন মিলু করিম বৌ-বাচ্চা রেখে নতুন এক যুদ্ধে অংশ নিতে কারীম মুন্সীর সাথে ঢাকায় চলে আসে।