স্বপ্ন ছুঁতে পারেনি সে

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০১৮, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

সুমন আহমেদ


বাবা মায়ের নয়ন মনি অতি আদরের বড় ছেলে মাহমুদুল। তিন ছেলে আর একমাত্র মেয়ের মধ্যে বাবা মা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন মাহমুদুলকে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে কোনোকিছুর অপূর্ণতা রাখেন’নি; মাহমুদুলের বাবা থাকতেন প্রবাসে। তার বাবা মা কোনোকিছু না চাইতেই সবকিছু দিয়েছেন। মাহমুদুলের সময় কাটতো বন্ধুদের সাথে। সারাদিন খেলাধুলা আনন্দ উল্লাসে মাতিয়ে রাখতো পুরো গ্রামটিকে। স্কুল জীবন শেষ করে ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয় কলেজে। কিছুদিন যাবার পর মাহমুদুল রাতে তার ল্যাপটপ অন করে নেট চালু করলো। হঠাৎ দেখতে পেলো সেনাবাহিনীর সার্কুলার এসেছে, সেনাবাহিনীতে লোক নেবে। মাহমুদুলের সেই ছোট্ট বেলা থেকে স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর চাকরি করবে; মাহমুদুল সেখানে এপ্লাই করে। কিছুদিন পর ইন্টারভিউ দিতে যায় কুমিল্লায়। ৩৬৪ জন সদস্য থেকে বাছাই করে মাত্র পাঁচ জন। পাঁচ জনের মধ্যে মাহমুদুল হয় প্রথম! ইন্টারভিউতে পাশ হওয়ার দিন হতে প্রায় দশ মাস পর মাহমুদুলকে ৬মাস ট্রেডিং দেওয়ার জন্য যেতে হবে চট্টগ্রামে। গণার দিন যেন ফুরিয়ে এলো দেখতে দেখতে

চলে গেল প্রায় দশটি মাস। হঠাৎ মাহমুদুলের একমাত্র বোনটির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বিয়ে দেওয়ার দুইদিন পর সবার কাছথেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় মাহমুদুল চট্টগ্রামে, ট্রেডিং দেওয়ার জন্য।
যেই মাহমুদুল মাকে ছাড়া কোনোদিন একটি রাত একা থাকেনি, সেই মাহমুদুল আজ শত প্রহর একা পার করতে চলেছে;শুধু তার স্বপ্ন পূরনের জন্য। ট্রেনিং এ যাওয়ার পর জীবন কি জিনিস মাহমুদুল বুঝতে
শিখেছে। কিছুদিন পর পর মাহমুদুলকে হসপিটালে ভর্তি করাতে হয়েছে। ট্রেডিং এত কঠিন ছিল।
তবুও মাহমুদুল কষ্টের কাছে হার মানেনি, তার স্বপ্ন পূরন করবেই।
প্রতিদিন রাতে একটু সময় পেলে ডাইরির মধ্যে লিখতো,,
কেমন আছো মা? জনি তুমি ভালো নেই, কি করে ভালো থাকবে বল তোমার এই অবুঝ পাগলটা যে আজ তোমার পাশে নেই। যেই পাগলটা তোমাকে ছাড়া একটি রাতও একা থাকেনি। আজ কত প্রহর কেটে গেল তোমার পাগলটা তোমায় ছেড়ে আজ কত দূরে। জানো মা আজ চাইলেও পারিনা একটি বার ফোন করে জান্তে,কেমন আছো মা?

মাগো না জেনে তোমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি। না বুঝে তোমার গায়ে অনেক আঘাতও করেছি।
আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। আজ আমি বুঝতে পারছি মা কি জিনিস, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি মা। তুমি কিন্তু বাবার সাথে ফোনে ঝগড়া করোনা; আপনজন ছাড়া দূরে থাকা অনেক কষ্ট,
ঝগড়া করলে বাবা অনেক কষ্ট পাবে। আমার একমাত্র আদরের বোন খাদিজা কেমন আছে? ওকে বলো ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে ও কিন্তু দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। মেজো ভাই রিমনকে বলো ঠিকমতো পড়াশোনা করতে! আর আমার ছোট্ট ভাই মাহিন কেমন আছে? ও কি আগের মতো দুষ্টামি করে? মাহিনকে কিন্তু দেখে রেখো ও যেন পানিতে না যায়। প্রায় তিনমাস পর। মার্চের দুই তারিখ রাতে মায়ের কাছে ফোন দিয়ে বলল। মাগো একটা খুশির খবর আছ,, কি খুশির খবর বাবা? মা গো সামনের ৭তারিখ আমি তোমার কোলে ফিরে আসবো, সাতদিনের ছুটিতে। এই কথা শুনার পর মা তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল, কি করিবে কোথায় যাবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা। তারপর অনেক কথা হল।
মায়ের কিছুতেই সময় কাটছেনা কখন সকাল হবে আর এই ভাবে কেটে যাবে দিন, কখন ৭তারিখ আসবে।

অনেক প্রত্যাশার পর রাত শেষে হল ভোর, ভোর হবার সাথে সাথেই মায়ের মোবাইলে কল আসে
ফোন রিসিভ করলো,, আপনি কি মাহমুদুলের মা?
হে,, আপনার মাহমুদুল আর নেই। ট্রেডিংরত অবস্থায় দৌড়াতে গিয়ে হার্ড এটাকে মারা যায়।
দশ মাস দশদিন গর্ভে রেখে, সেদিন আকাশ কাঁপানো প্রশব বেদনার হাহাকার চিৎকার কষ্ট যন্ত্রণা সয়েছে জননী শুধু মাহমুদুলের চাঁদ মুখটি দেখার জন্য। আজ কি করে নিজেকে শান্তনা দেবে জননী, খবর শুনার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। ফেসবুক চালু করলেই শত আইডিতে দেখা যায়
মাহমুদুল আর নেই, এই ধরনীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে, না, ফেরার দেশে।
মাহমুদুলের জানাজার নামাজে হাজার হাজার জনতার আগমন হয়েছিল। যেই মানুষ তার জীবনে কোনোদিন এক ফোটা চোখের পানি ফালাই নি। সেই মানুষ সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে ছিল। স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের সেবক হবে,নিজ হাতে দেশের মানুষের সেবা করবে। স্বপ্ন যেন স্বপ্নই রয়ে গেল,আর পূরণ হলনা।