স্বাধীনতা স্বরূপে উদ্ভাসিত হোক

আপডেট: March 26, 2020, 12:23 am

গোলাম কবির


স্বাধীন বিশেষণ শব্দ। এর অর্থ অবাধ, স্বচ্ছন্দ, স্ববশ, অনন্যপর। শব্দটির বিশেষ্য স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতা ভোগের সীমারেখা বাতলিয়ে দিয়েছেন যুগে যুগে বহু মনীষী। আমরা তা পড়ি, অনুসরণ করিনা। নিজেরাই সীমা লংঘন করি। এখানেও আমরা অবাধ থাকতে চাই। ফলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি যেভাবে স্বাধীনতা ভোগ করে, সাধারণের ভাগে তা প্রায় শূন্য থাকে। সবার ভোগে স্বাধীনতা সমানভাবে কার্যকর হবার অবকাশ পায় না। অথচ এই স্বাধীনতা লাভের জন্য সভ্যতার সূচনা থেকে অগণিত মানুষ প্রাণ দিয়েছে। বাংলার মানুষ যত প্রাণ দিয়েছে কবির ভাষায় তা ‘লেখা আছে অশ্রুজলে’ সেই চোখের জল মাঝে মাঝে দৃষ্টিকে ঝাপসা করে। আবার চোখের জল শুকিয়ে যায়। ক্ষরণ দেখা যায় না, শুকায়ও না। বঞ্চনার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে তীব্রতর হয়।
আমরা স্বাধীনতা লাভের অর্ধশত বছরের দ্বারপ্রান্তে। ইতোমধ্যে হাজারো স্মৃতি ম্লান হয়ে গেছে। স্বাধীনতার সুফল যাদের ভোগ করার কথা ছিলো, তাদের ভাগ্য প্রসন্ন হয়নি। সাতঘাটের পানি খাওয়ারা ভোগের পেয়ালা পূর্ণ করে পান করেছে। এমনটি হবার তো কথা ছিলো না।
বঙ্গবন্ধু মানবমুক্তিসহ জন্মভূমির স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছেন সমস্ত জীবন। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ভূখণ্ড-পতাকার ব্যবস্থা করেছেন। মুক্তির সর্বাত্মক আয়োজন করেও শেষ করে যেতে পারেন নি। আমাদের স্বাধীনতা খণ্ডিত থেকেছে দীর্ঘ সময়।
প্রলুব্ধ করে রাসআলগা স্বাধীনতার পরিণতি অনেক সময় ভয়ঙ্কর হয়। নিকট অতীতে আমরা তা দেখেছি। ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন কর্মকাণ্ড এবং চেতনা বিকাশের ধারা সর্বজনীন না হলে, তা বৃথা হয়ে যায়। স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করে স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাধীনতা নয়, পরাধীনতা অপেক্ষা গ্লানিকর। একদা আমাদের তরুণদের হাতে অস্ত্রদিয়ে ব্যক্তিসমৃদ্ধির জন্য প্রলুব্ধ করা হয়েছিলো, তা যে ‘বুমেরাং’ হয়নি, তা আমরা হলফ করে বলতে পারবো না। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য মুক্তচেতনা রুদ্ধ করতে গিয়ে স্বাধীনতার শত্রুরা এমন কিছু বিকৃত কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়েছে, যা সর্বকালের জঘন্য মানসিকতার পরিচায়ক। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা এমনি অন্ধ যে একদা ক্ষমতাবানরা নিজের সন্তানের চোখ তুলে নিতে দ্বিধা করেনি। যে মানুষটি শোষিত জনগণের মুক্তির জন্য ব্যক্তিগত সুখভোগ বিসর্জন দিলেন, তাঁকে হত্যা করেও ওদের বিকৃত মনের তৃপ্তি হয়নি। লাখো মানুষের শোকের দিনটিকে জন্মদিন ধারণ করেছে। (মহানবী (স.) এর ইন্তেকালের পর মোসাইলামা কাজ্জাব নামের এক ভণ্ড নবীর মতো) এখানেই শেষ নয়, ঢাউস কেক বানিয়ে ফুর্তির মেলা বসিয়েছে। এই স্বাধীনতাকে কোন অভিধায় অভিহিত করা যায়। এ যেন লাল কাপড় দিয়ে পুরাতন ভাঙা ইটের পাজাকে জিন্দাপিরের মাজার বানিয়ে জনগণের মগজধোলায় আর পকেট খালি করার আয়োজন।
যুগে যুগে মুক্তস্বাধীন সমাজগঠনের জন্য চিন্তাবিদগণ কতইনা রূপরেখা রেখে গেছেন। মানুষের চেতনা স্থির থাকার বিষয় নয়। নিত্যনতুন বাঁক বদলায়। এই প্রবাহের ধারায় কখনো এপার গড়ে আবার কখনো ওপার ভাঙে। কাজেই কালের প্রেক্ষিতে আইনের ধারায় উনিশ-বিশের চিন্তা এসে যায়। মতবাদের আচরণ চাপিয়ে দিলে স্বাধীনতা যেমন বিড়ম্বিত হয়, তেমিন সামর্থ্যরে প্রতিকূলে বোঝা চাপিয়ে দিলে স্বাধীনতার স্বাচ্ছন্দ্য যায় হারিয়ে।
ব্যক্তির গঠনমূলক পরামর্শদানের যেমন স্বাধীনতা থাকা দরকার, তেমনি প্রশংসাও করতে পারে, কিন্তু তা যেন অতিরঞ্জন না হয়। এতে ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে অবহিত হতে পারেনা। তাই জুগুপ্সাকারীকে থামানোর আগে স্তাবকের মুখ বন্ধ করা দরকার। সৃষ্টিশীল সমালোচনার স্বাধীনতা দেশ ও জাতির উন্নয়নের অনুকূলে আসতে পারে। কিন্তু তোষামোদকারী নিজের উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়। কবি সাদী চাটুকারের মুখে ছাই ছিটিয়ে দিতে বলেছিলেন, আর মনীষী শহীদুল্লাহ গঠনমূলক সমালোচনাকে হিতকারী সম্মার্জনীর মর্যাদা দিয়েছেন।
আমরা বলছিলাম, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমাদের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের অবশ্যই পেছন ফিরে দেখতে হবে, মানবমুক্তির পথে আমরা কতটুকু অগ্রসর হয়েছি। একটা সত্য সবার জানা, পারিপার্শ্বিক আনন্দঘন পরিবেশেই স্বর্গীয় সুষমা বিরাজ করে। আকাশ পাতালে স্বর্গ খুঁজতে হয়না। বাংলার নিভৃত জনপদের কবি শেখ ফজলল করিম তা বুঝেছিলেন বলে আপ্তবানী উচ্চারণ করেছিলেন, ‘প্রীতিপ্রেমের পুণ্য বাঁধনের কথা’ যেখানে স্বর্গ এসে ধরা দেবে। স্বাধীনতার কবি বঙ্গবন্ধু মুক্ত মানুষের জন্য তেমনি পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। আমরা সে লক্ষ্যে উপনীত হতে পারিনি। নিজেদের দোষারোপে কী হবে! সারাবিশ্বই এখন হানাহানিতে মত্ত। যারা গণতন্ত্র বিলিয়ে বেড়ায়, যারা স্বর্গপ্রাপ্তির পথের সন্ধান দানের ফেরি করেÑতারা মানবমুক্তির পথে কাঁটা ছড়ায়। মানুষের মিলনের ‘মহানন্দময় মুক্তির স্বাদ’ এর কথা ভাবার অবকাশ পায়না, স্বার্থের বেড়াজালে। এই ভাবনা কার্যকরের জন্য সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। আর তাতে নেতৃত্ব দিবেন মানব প্রেমিক নেতা। আমরা সেই নেতা পেয়েও হারিয়েছি, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্ধদের কুচক্রে।
স্বার্থন্বেষীরা এখন বেজায় তৎপর। এর ক্ষমতাসীন নেতাদের ঘিরে ধরেছে। এরা স্তাবকের দল- নিজের স্বার্থের বাইরে কিছু বোঝেনা। এরা নেতাকে ঈশ্বর বানাতে চায়, শুধুই নিজের আখের গোছাতে চায়। মানব সভ্যতার জন্য, মানবের কল্যাণের জন্য এরা বড়ই শত্রু। এরা নেতা ও দলকে সহসাই জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়। দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে এরা হয়তো পুরো দেশটাই খেয়ে ফেরবে। এইসব মানবরূপী দানবের কর্মকাণ্ডে মনে হবে সকল লুটপাট আর অপকর্মের যেন স্বাধীনতা পেয়েছে তারা। এদের শক্তহাতে স্বাধীনতার স্বার্থেই বর্জন করা আবশ্যক। দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়নের স্বাধীনতা যেমন হয়না, তেমনি সামর্থের প্রতিকূলে ভার চাপিয়ে দিলে স্বাধীনতার স্বাচ্ছন্দ্যময়তা হারিয়ে যায় এবং স্বরূপ মুখ লুকায়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ