স্মার্টফোনের বাজার পড়েছে ১৮ শতাংশ

আপডেট: মে ১৪, ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশে থ্রিজির পর চালু হয়েছে ফোরজি প্রযুক্তির টেলিযোগাযোগ সেবা। নতুন এ প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুষঙ্গ স্মার্টফোন। তবে আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে থ্রিজি-ফোরজিতে ব্যবহারযোগ্য এ স্মার্টফোনের বাজার বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ পড়ে গেছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ হংকংভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি। স্মার্টফোনের বাজার নিয়ে প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার প্রকাশ করেছে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। বাংলাদেশে স্মার্টফোনের বাজার পড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ফোরজি প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক সেবা শুরু করেছে সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক। স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে ফোরজিসহায়ক কিনা, সেটি বিবেচনায় রাখছেন ক্রেতারা। এ দোদুল্যমানতা স্মার্টফোন বিক্রিতে প্রভাব ফেলছে। তবে বছরের শেষদিকে তা কেটে যাবে এবং বছর শেষে বাংলাদেশে স্মার্টফোনের বাজার ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেখা পাবে।
যদিও হ্যান্ডসেট আমদানিতে উচ্চহারে করারোপ এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরই স্মার্টফোন আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেটে সেলুলার টেলিফোন সেটের এইচআর কোড ৮৫১৭.১২.১০-এর মাধ্যমে আমদানি শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানিতে অগ্রিম আয়কর হিসেবে ৫ শতাংশ ও ১ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয় আমদানিকারকদের। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার অংশ হিসেবেই আমদানিতে এ শুল্ক বাড়িয়েছে এনবিআর।
বাংলাদেশে স্মার্টফোনের বাজারে ব্র্যান্ডভিত্তিক বাজার দখলের পরিসংখ্যানও তুলে এনেছে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর দখল এক বছর আগের একই সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বাজারটিতে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর দখল ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এর বিপরীতে কমেছে সিম্ফনি, স্যামসাংয়ের মতো ব্র্যান্ডের বাজার দখল।
তার পরও জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের স্মার্টফোন বাজারে সিম্ফনির দখল দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশ, যা গত বছর প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৩৩ শতাংশ। বাজার দখল কমলেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ব্র্যান্ডটি।
সিম্ফনি মোবাইলের হেড অব বিজনেস ইন্টেলিজেন্স মো. মাসুদ উল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের স্মার্টফোন বাজারে সিম্ফনি এখনো নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ড। পণ্য ওয়্যারহাউজে বেশিদিন মজুদ থাকলে মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সিম্ফনি তার চলার পথে পণ্যের গুণগত মান রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। এছাড়া বাজারের মৌসুমি প্রভাবেও বছরের প্রথম প্রান্তিকে চাহিদা কম ছিল। আশা করছি দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে আমাদের অবস্থা আরো ভালো হবে।
বাজারের ১৫ শতাংশ দখলে নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আরেক দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটন। গত বছর প্রথম প্রান্তিকে ওয়ালটনের দখলে ছিল দেশের স্মার্টফোন বাজারের ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ১৫ শতাংশ।
গত বছরের শেষদিকে বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল ফোন উৎপাদন কারখানা চালু করে ওয়ালটন। এরই মধ্যে নিজস্ব কারখানায় তৈরি ছয়টি স্মার্টফোন এবং একটি ফিচার ফোন বাজারে এনেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর উদয় হাকিম বলেন, দেশে তৈরি উচ্চমানের এসব মোবাইল ফোনের কাস্টমার ফিডব্যাক অনেক ভালো। ফলে এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমাদের মার্কেট শেয়ার বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে, তা হলো দেশে তৈরি ফোনগুলোর উচ্চমান ও সাশ্রয়ী দাম। একই সঙ্গে দ্রুত ও সহজলভ্য বিক্রয়োত্তর সেবা। আমাদের বিশ্বাস ছিল, দেশেই বিশ্বমানের প্রযুক্তিপণ্য তৈরি হলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, আবার মেধাবীদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, যা বিদেশী কোম্পানিগুলোর আধিপত্য হ্রাস করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে বেগবান করতে ভূমিকা রাখবে। দেশীয় ক্রেতারা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পণ্যে আস্থা রেখেছেন বলেই এখন ফ্রিজের বাজারের ৭০ শতাংশেরও বেশি ওয়ালটনের দখলে। একইভাবে সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত প্রযুক্তিপণ্য দিয়ে স্মার্টফোনের বাজারেও শিগগিরই শীর্ষে চলে যেতে পারব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড স্যামসাংয়ের বাজার দখল উল্লেখযোগ্য কমেছে। ১৫ শতাংশ থেকে কমে গত প্রান্তিকে দেশের স্মার্টফোন বাজারে স্যামসাংয়ের দখল দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। চীনা ব্র্যান্ড আইটেলও এ বাজারের ১০ শতাংশ দখলে রেখেছে। যদিও গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ বাজারের মাত্র ১ শতাংশ দখলে ছিল আইটেলের।
আইটেল মোবাইলের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ট্রানশান বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক বলেন, মূলত দামের কারণে স্মার্টফোনের আমদানি তুলনামূলক কমেছে। তবে এক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোনগুলোর ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে বেশি। বাজেটে করারোপের পর আমদানি করা হ্যান্ডসেটের দাম ৭-৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, একটা সময় স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে আধিপত্য করেছে। এ চিত্রে এখন পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বিশেষত চীনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের আগ্রাসী বিপণন এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ক্রেতারাও বড় হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারীদের ওপর আস্থা রাখছেন। স্মার্টফোন বাজারে হুয়াওয়ের দখল জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কমেছে। ২০১৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১২ শতাংশ থেকে কমে গত প্রান্তিকে হুয়াওয়ের দখল দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশ। এ বাজারের বাকি ৩৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে অন্যান্য ব্র্যান্ড।
দেশে স্মার্টফোনের বাজার কমলেও এর সহজপ্রাপ্যতা টেলিযোগাযোগ সেবার নতুন প্রযুক্তির বিস্তৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান সেলফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবীর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, উচ্চ করহারের কারণে হ্যান্ডসেট মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে সদ্য চালু হওয়া ফোরজির সম্প্রসারণে বাধা তৈরির আশঙ্কা রয়ে গেছে। দ্রুততম সময়ে ফোরজি সেবা পৌঁছে দেয়া ও প্রযুক্তিটির সুফল পেতে হ্যান্ডসেটের ওপর থেকে এ কর প্রত্যাহার করা উচিত। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ