হাসুর বিলাইছানা

আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৮, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

মোনোয়ার হোসেন


হাসু থাকে মামার বাড়িতে। মামাতো ভাই-বোনদের সাথে স্কুলে যায় সে। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তার বাবা মা ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তার খাওয়া-দাওয়া আর পড়ালেখার জন্য মামাকে প্রতি মাসে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেন। এক বছর হলো বাবা মা বাড়িতে আসেন না। বাবা মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে হাসুর। বাবাকে ফোন দেয়। ফোনে কাঁদে। কেঁদে কেঁদে বলে, ও বাবা, তোমাদেরকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, তোমরা বাড়ি এসো।
ছেলের কান্না শুনে বাবা মা ছুটি নিয়ে বাড়ি আসছিলেন। পথে হলো রোড এক্সিডেন্ট। বাবা মা দুইজনে মারা গেলেন। কয়েকদিন পর মামী বললেন, এই উঁটকোটাকে বাসায় রেখেছ কেন? বাড়তি ঝামেলার জন্য? একে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারো না? মামা তাকে একটা হোটেলে রেখে এলেন। হাসুর কাজ হোটেলের টেবিল পরিষ্কার করা। হোটেলের পাশে একটা বড় স্যাঁতসেঁতে রুম। সেখানে রাতে হোটেলের সব কর্মচারীরা গাদাগাদি করে ঘুমোয়। হাসুও ঘুমায়। সারাদিন বেচাকেনার পর যা উচ্ছিষ্ট খাবার থাকে সবাই তা ভাগ করে খায়। রাতে খাচ্ছিল হাসু। এমন সময় দেখে পায়ের কাছে কে যেন লিকিরপিকির করছে। মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখে ছোটো এক বিলাইছানা। পা জড়িয়ে মিঁউ মিঁউ করছে। কিন্তু শোনা যাচ্ছে চিঁউ চিঁউ। হাসু বুঝল বিলাইছানা না খেয়ে না খেয়ে দূর্বল হয়ে পড়েছে। কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। সে বিলাইছানাকে কোলে তুলে নিলো। নিজের খাবার খাইয়ে দিল। পরেরদিন সকালে বিলাইছানাকে সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দিল। রোদে দাঁড়িয়ে গায়ের পানি শুকিয়ে নিলো। তারপর বলল, বিলাইছানা। বিলাইছানা বলল, মিঁউ মিঁউ। তুমি বিছানায় শুয়ে থাকো, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসব। বিলাইছানা বুঝল। সে চুপচাপ শুয়ে থাকল। রাতে হাসু নিয়ে এলো অনেক খাবার। ছোটো মাছের কাঁটা, বড়ো মাছের কাঁটা। আবার অনেক মাছ। বড়ো বাবুরা যখন মাছের কাঁটা আর উচ্ছিষ্ট খাবার টেবিলে ফেলে দিতো, হাসু টেবিল মুছে বিলাইছানার জন্য সেগুলো রেখে দিত। অনেক খাবার দেখে বিলাইছানা খুব খুশি। লেজ নাচিয়ে চুকচুক করে খায়। বিলাইছানার খাবার দেখে হাসু হাসে। কিছুদিনের মধ্যে বিলাইছানা হিষ্টপুষ্ট হয়ে গেল। গায়ে অনেক শক্তি হলো। এখন সে হাসুর পা ঘেঁষে তির তির করে দৌড়ায়। লেজ নাচিয়ে খেলা করে। বিলাইছানার কা- দেখে হাসু খলখলিয়ে হাসে। বাবা মায়ের কথা ভুলে যায়। দুখের কথা ভুলে যায়। সেদিন শুক্রবার। হাসু হোটেলে ডিউটি করছিল। তেনাকাপড় দিয়ে এ টেবিল-সে টেবিল পরিষ্কার করছিল। আর বিলাইছানা তার পা ঘেঁষে তির তির করে দৌঁড়াচ্ছিল। হোটেলে বাবার হাত ধরে নাস্তা খেতে এল ছোট্ট এক বেবি। সুন্দর বিলাইছানা দেখে সে বায়না ধরল তার এই বিলাইছানা চাই। বাবা অনেক বুঝাল। কিন্তু তার এক কথা, আমার এই বিলাইছানা চাই, চাই-ই। হোটেলের মালিক হাসুর কাছ থেকে বিলাইছানা নিয়ে তাকে দিয়ে দিল। হাসুর মন খারাপ। বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গভীর রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু হাসু ঘুমাইনি। সে জেগে আছে। আজ তার ঘুম আসছে না। বাবার কথা মনে পড়ছে। মার কথা মনে পড়ছে।
বিলাইছানার জন্য কষ্ট হচ্ছে। চোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। বাইরে এসে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল। দেখে পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বিলাইছানা। মিঁউমিঁউ করে ডাকছে।
বিলাইছানা! আমার বিলাইছানা! বিলাইছানাকে কোলে তুলে নিলো হাসু। আদর করল। চুমু খেলো। তারপর বিলাইছানার লোমশ শরীরে গাল ঠেকিয়ে আদর করল।