হিন্দু ও শিখ মিলে বানাই মসজিদ রাজনীতিতে হোক ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির অঙ্গীকার

আপডেট: মে ৪, ২০১৮, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবীতে ধর্ম-সংঘাত, হানাহানির ঘটনা বেশ পুরান। ধর্মীয় আধিপত্য ও সংঘাতের কারণে বোধ করি পৃথিবীতে সর্বাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সভ্যতা এগিয়েছে কিন্তু ধর্ম নিয়ে হানাহানি বন্ধ হয় নি। বরং তা রাজনীতির আবরণে বিভিন্ন সময় রকমের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। একবিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগেও ধর্ম-সংঘাত, সহিংসতা, বিভেদ, কুপম-কতা গভীরভাবেই দেশে দেশে মানুষের মধ্যে চাষ হচ্ছে। এই মানুষেরা যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে পড়ে কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারি হয় তখন মানবসভ্যতা বড়ই বিপণœ অবস্থার মধ্যে পড়ে। বর্তমান বিশ্বের প্রায়ই দেশেই সাম্প্রদায়িক শক্তির কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনীতি এ বিষয়টিকে ধারণও করছেÑ এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ধর্মসর্বস্ব প্রতিহিংসা, সহিংসতা কিংবা সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবন কোনোভাবেই উন্নত হয় না। অথচ এই সংঘাতের বলী হয় সাধারণ মানুষ। এর চরম শিকারে পরিণত হয় নারী ও শিশুরা। রাজনৈতিক আগ্রাসন, আধিপত্যবাদ, উন্নয়নকামী দেশের সম্পদ লুণ্ঠনই মূলত এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।
সাধারণ মানুষ যারা খুবই সাধারণ জীবন-যাপন করেন, তাদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় না। কারণ একজন দরিদ্র সে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান হোকÑ তাদের ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও আর্থ-সামাজিক অবস্থান একই রকম। জীবনযুদ্ধটাও একই রকম। এসব লোকেদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একসাথে বসবাসে কিংবা উৎসবে কোনো সমস্যা হয় না। বরং তারা একে অপররের পরিপূরক হয়। জীবনের সুৃখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। তারা সম্প্রীতি চায়, ভ্রাত্রত্ব চায়, শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। কিন্তু তাদের এই চাওয়াটুকু ছিনতাই হয়ে যায় স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা।
ধর্ম-সংঘাত যেমন শান্তিকে দূরীভুত করে, মানব সভ্যতাকে কলঙ্কিত করেÑ আবার উল্টো প্রশান্তি ও স্বস্তিদায়ক ঘটনাও আছে যা মানুষকে বেচে থাকার রসদ যোগায়। অসহিষ্ণুতার বিপরীতে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির জয়গান উচ্চারিত হয়।
দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তেমনি একটি ঘটনা সমাজ বিনির্মাণের উচ্চ স্তরকেই আহবান করে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জায়গায় আনন্দ ও ভালবাসা ছড়িয়ে দেয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্যমতে ভারতের পাঞ্জাবের মুম নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে হিন্দু ও শিখ ধর্মাবলম্বীরা চারশ ঘর মুসলিম প্রতিবেশির জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দিলেন। এক মুসলিম শ্রমিকের মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্দির কর্তৃপক্ষ মসজিদের জন্য নয়শ স্কয়ার ফিট জমি দিয়ে দিলো। আর শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা দিলেন অর্থের যোগান। শুধু তাই নয়, হিন্দু শিখ আর মুসলিম মিলে তৈরি হলো মসজিদ। সেখানে মসজিদের গা ঘেঁষে রয়েছে হিন্দুদের শিব মন্দির আর শিখদের গুরুদুয়ারা। ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে!
যারা কথায় কথায় ফতুয়া দিয়ে থাকেন তারা কী বলবেন? ওই মসজিদে নামায আদায় জায়েজ হবে কি? কিংবা যে হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায় মসজিদ তৈরিতে জমি, অর্থ ও শ্রম দান করলেন তাদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের পরিণতি কী হবে?
যাহোক, এসব বুঝে তো ধর্মান্ধরা কাজ করে না। তারা স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তাই মনুষ্যত্বের বিকাশকে তারা প্রচ- ভয় পায়। মানুষে মানুষে মিলনে তারা আতঙ্কিত হয়। তাদের কাছ থেকে মানবিক মূল্যবোধ প্রত্যাশা করা যায় না। কিন্তু যারা গণতন্ত্রের কথা, মেহনতি মানুষের উন্নয়নের কথা বলছেন সেই রাজনীতিকদের কাছ থেকেই মুম গ্রামের মত ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি রক্ষার সদিচ্ছা অবশ্যই কাম্য। যা তাদের কর্মযজ্ঞ ও অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে মানবিক সমাজ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ