হিন্দু পারিবারিক আইনের সংস্কার অপরিহার্য

আপডেট: জুলাই ১৬, ২০১৯, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে জানাতে পেরেছি, গত ১৩ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘হিন্দু পারিবারিক আইন প্রতিরোধ কমিটি’ নাম না জানা ও জনবিচ্ছিন্ন একটি সংগঠন ড. জে. কে. পালের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলন করে। আইনজীবী ড. জে. কে. পাল উক্ত সংগঠনের আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি হিন্দু পারিবারিক আইনের বিরোধিতা করে উস্কানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছেন-যার সঙ্গে দেশের আপামর হিন্দুদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং নারী অধিকার বিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। একজন সাবেক ডিআইজি সঞ্চিত বৈড়-যিনি পুলিশের মতো একটি সেবামূলক সংগঠনের কাজ করে উচ্চতর পদে আসীন ছিলেন, তিনি অবসর জীবনে মানবসেবা ও দেশের আইনের প্রতি কী করে অনুগত থাকলেন, আজকে জনমনে সে প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে। দেশবাসী এমন পদস্থদের কাছে আশা করেন, তিনি অবসর জীবনে জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং ধর্মকর্ম নিয়ে অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করবেন। কিন্তু তার বক্তব্য পুরোটাই মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপন্থি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন, উক্ত সংগঠনের যুগ্ম সদস্য সচিব গৌতম কে. এদবর, হিন্দু মহজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, আইনজীবী নারায়ণচন্দ্র দাস, সাবেক ডিআইজি সঞ্চিত বৈড় এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ধীরেন বিশ^াসসহ আরো অনেকে। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছেন, সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক শ্যামলকুমার রায়। সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে ২৮ টি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন। এতো সংখ্যক সংগঠননের অস্তিত্ব দেশে বিদ্যমান আমাদের জানা নেই। তারা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘বিগত তিন দশক ধরে ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ ও কয়েকটি এনজিও ও সুশীল সমাজ হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে অপপ্রচার করে আসছে।’ তাদের মতে, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা বাপের সম্পত্তির মালিকানা পায় না।’ এ ধরনের বক্তব্য এ যুগে নির্ভেজাল অপরাধপ্রবণতারই সাক্ষ্য দেয় এবং এটা ডাহা মিথ্যা। ভারত ইতোমধ্যে হিন্দু নারীদের পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে আইন প্রণয়ন করেছে। ‘কতিপয় এনজিও ও নারীবাদী সংগঠনের এখতিয়ার নেই হিন্দু আইন পরিবর্তনের ডাক দেয়ার। দেশের হিন্দু নারীদেরও সম্মতি নেই এতে।’ একই সঙ্গে তারা ইসলাম ধর্মে পিতার সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার থাকলেও তা পারিবারিক কোন্দল সৃষ্টি করে, ভাই-বোনদের মধ্যে অসন্তোষ এবং মামলা হয়, সে বিষয়েও যথেষ্ট সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে কটাক্ষ করেছেন বক্তারা-যা ওয়াজ-মাহফিলে অর্ধশিক্ষিত মৌলানারা প্রতিদিন করে। তারা বলেছেন, ‘মুসলিমদের পারিবারিক আইন বানরের পিঠাভাগের মতো। আর এসব করে আমরা আইনজীবীরা নিজেদের রোজগার বাড়িয়ে চলেছি। আদালতে মুসলিমরা প্রায়ই বলে, সম্পত্তি ঠিকমতো বণ্টন হয়নি। এই অজুহাতে মুসলিম পরিবারগুলোতে ভাই-বোনে বছরের পর বছর মামলা চলে। তার বিপরীতে কয়টি হিন্দু পরিবারে ভাইয়ে-বোনে মামলা হয়?’ ওই সম্মেলনে গোবিন্দ প্রামাণিক অত্যন্ত অশোভন উক্তি করেন। তিনি বলেছেন, ‘হাইকোর্টের ফুটপাথে কতজন নারী দিনরাত শুয়ে থাকে? এরা কোন্ ধর্মের? এরা সবাই মুসলিম। এসব নারীর কি সম্পত্তি নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু এরা ভোগদখল করতে পারে না। সম্পত্তির অধিকার থাকা সত্ত্বেও এরা আজ ফুটপাথে। বাংলাদেশে কয়জন হিন্দু নারীকে এভাবে ফুটপাথে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন?’ গোবিন্দবাবু এদেশের বাসিন্দা কি না জানি না, তবে যারা ফুটপাথে ঘুমোয়, তারা ভূমিহীন এটাই সত্যি। তবে বঞ্চিত তারা একা নন, বাঙালি সমাজের ভূমি ব্যবস্থায় চরম অব্যবস্থার কারণে এমনটি হয়। অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। অনেক সময় স্ত্রী-ধন পর্যন্ত স্বামী-শ্বশুর নানা প্রলোভন দিয়ে হাতিয়ে নেন। সেটা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি কুফল। তার মানে এই নয়, কেবল মুসলিম পরিবারের নারী ফুটপাথে ঘুমোয়। এ দেশে যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী মুসলিম, তাই ফুটপাথে ঘুমোনোর সংখ্যা তারাই বেশি হবে, সেটাই স্বাভাবিক। আসলে পিতার সম্পত্তি ও সম্পদে কন্যার অধিকার ধর্মীয় বিধানে যেভাবে বণ্টন করা হয়েছে, সেটাও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবিচারেরই দৃষ্টান্ত। সমবণ্টন হওয়া আবশ্যিক। নতুবা নারী কেবল সংসারে শ্রমিক ব্যতীত কেউ নন। তাদের সমাজ-সংসারে যোগ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বনফুলের “নিমগাছ” গল্পের মতো আমাদের মা-বোন-স্ত্রীর দুঃসহ জীবন।
এই সংগঠন সম্পর্কে বাংলাদেশের কতোজন হিন্দু অবহিত জানি না। তবে আমরা যারা নিয়ত নানা ধরনের সংগঠনের তথ্য রাখি, তারা এই সংগঠনের নাম কখনো শুনিনি। অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি, আপনারা এ নামের কোনো সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত কি না কিংবা নাম জানেন কি না? সবাই একবাক্যে বলেছেন, জানি না। সবচেয়ে বড়ো কথা হিন্দু ধর্মের নানা বিধান নানা সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। যেমন সতীদাহ প্রথা ও বাল্য বিয়ে রোধ; বহু বিয়ে রোধ, বিধবা বিয়ে এবং স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন ইত্যাদি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। রামমোহন রায় বা বিদ্যাসাগর, রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন নারী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন করছেন, তখন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই রক্ষণশীলেরা বিরোধিতা করেছে। ধর্মরক্ষার নামে কুরুচিকর মন্তব্যও করেছে। এই নমস্বগণ যখন ধর্মীয় বিধান সংস্কারের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন, তখনও এই ‘হিন্দু পারিবারিক আইন প্রতিরোধ কমিটি’ মতো অনেক কমিটি এবং ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্যে ধুতি কোমরে এঁটে নানামুখী অশোভন বক্তব্য আর লেখালেখি করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, হিন্দু বিধবার পুনঃবিয়ে নাকি শাস্ত্রে লেখা নেই। সাত থেকে পনেরো-কুড়ি বছরের নারী স্বামীহারা, তাদের তো সমাজপতিদের তো শারীরিক প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রের “বিষবৃক্ষ” ও “কৃষ্ণকান্তের উইল” উপন্যাসের কুন্দ ও রোহিনী তার উল্লেখযোগ্য চরিত্র। নীতিবাগিশ বঙ্কিম তাদের বিষপানে ও গুলি করে হত্যা করেছেন। তাহলে সমাজপতি-কুলীন আর দুষ্টুদের ভোগের উপযুক্ত পাত্রী ওই বিধবারা? তাদের স্বাধীন মত নেই, নেই অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শৃঙ্খলিভাবে শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর স্বপ্ন। বিদ্যাসাগর শাস্ত্র থেকেই উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন, আচার্য-তর্কালঙ্কার-বিদ্যালঙ্কার প্রমুখদের বক্তব্য মিথ্যে প্রমাণ করা লক্ষ্যে। বঙ্কিমচন্দ্র বিষবৃক্ষ উপন্যাসে সূর্যমুখীর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়েছেন, ‘যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা করে, সে যদি প-িত হয়, তবে মূর্খ কে!’ এটা ব্যক্তি সূর্যমুখীর স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ায় সে এ ধরনের উচ্চারণ করছে। সূর্যমুখীর একক ক্ষতির আশঙ্কায় এমন কথা বলা খুব অসঙ্গত নয়, কিন্তু কন্যা তার পিতার সম্পত্তির অধিকারিণী হবে, রাষ্ট্র যদি তার পক্ষে অবস্থান নেয়, তাতে পিতা হিসেবে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বিদ্যাসাগর তর্কালঙ্কার-বিদ্যালঙ্করমানে সে কালের সমাজে যারা প-িত ও সম্মানিত ছিলেন, তাদের প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করার লক্ষ্যে বিধবা বিয়ে প্রচলনের পক্ষে শাস্ত্র থেকেই উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি ‘পরাশর সংহিতা’র অমর শ্লোক উদ্ধার করেছিলেন। সংহিতার শ্লোকে এ রকম উল্লেখ আছে,
‘নষ্টে মৃতে প্রবরজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ
পচস্বাটতসু নারীনাং পতিবন্যো বিধয়েতে।
বিদ্যাসাগরের এই শাস্ত্রানুগ তথ্যে তর্কবাগীশেরা কোনো উত্তর দিতে পারেন নি। সেকালেও মানুষের অধিকার বিরোধী কিছু অমানুষ ছিলো, যারা নিজেদের ভোগ-বিলাসিতার লক্ষ্যে নানা ধরনের মনগড়া শাস্ত্র ও বিধান হাজির করে মানুষকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। শাস্ত্রজ্ঞরা একাধিক স্ত্রী নিয়ে দিব্বি মহানন্দে কাল অতিক্রম করবে, কিন্তু সাধারণের পক্ষে তা অশাস্ত্রীয়। অপরাধ। যেমন বেদ বা নানা ধরনের সংহিতা কেবল ব্রাহ্মণই পাঠের অধিকারী ছিলো, কিন্তু ক্ষত্রিয়-বৈশ্য ও শূদ্র তা স্পর্শ করতে পারবে না। করলে শাস্ত্রের গূঢ় তত্ত্ব ও তথ্য তরা সব জানতে পারবে। তাহলে তাদের আধিপত্য ও প্রভূত্ব হুমকির মুখে পড়বে, এই ছিলো তাদের শঙ্কা। সেকালের পাঠশালায় সামনে বসার অধিকারী ছিলো ব্রাহ্মণ এবং বিত্তবান জমিদারের সন্তান। বৈশ্য-শূদ্রদের পড়ালেখা করার অধিকার ছিলো না। শূদ্রের বেদ স্পর্শ ছিলো পাপতুল্য। অর্থাৎ এই ভীতি প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে সমাজে তারা প্রভূত্ব করার অধিকারী ছিলো।
আজকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উন্নয়নের যুগে ভূঁইফোর সংগঠন পিতার সম্পত্তিতে তার মেয়ের অধিকারের বিরোধিতা অর্থ পুরুষতান্ত্রিক-ব্রহ্মণ্যবাদী শোষক শ্রেণির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক অলীক আয়োজন। এরা কখনোই মানুষের সুখ-শান্তি-সম্মান-সমৃদ্ধি আর অধিকারকে সহজে মেনে নিতে পারে না। আজকেই যদি পিতার সম্পত্তিতে মেয়ের সমঅংশীদারিত্বের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট নেয়া হয়, তাহলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সম-অধিকারের পক্ষে বেশি ভোট পড়বে। আর যারা পিতার সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিরুদ্ধে মিথ্যেচার করছেন, করছেন অন্য ধর্মাবলম্বীর বিধির বিরুদ্ধাচারণ, তারাই বরং দেশে একটা সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা সৃষ্টির চক্রান্তে লিপ্ত। বাংলাদেশের সংবিধানও তাদের বক্তব্য সমর্থন দেয় না। একেই বলে গোঁড়ামী, অসভ্যতা। এরা মধ্যযুগে বাস করছেন। সকল প্রগতিশীল ও সময়োপযোগী আয়োজনের বিরোধী ধর্মান্ধ। বাংলাদেশ সরকার হিন্দু বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের মধ্যে সম্পন্ন করার আইন করেছে। এটা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। কারণ আমাদের সমাজ ও পরিবারে নারী নানাভাবে নিগৃহীতা হন। নিগৃহীতা উৎপীড়ন সহ্য করতে না পারলে বিয়ে বিচ্ছেদ দাবি করতে পারে। সরকার হিন্দু স্বামী-স্ত্রীর তালাকের বিপরীতে বিয়ে বিচ্ছেদের আইনও করেছে। তাতে মনে হয় সংগঠনটির আপত্তি আছে। কারণ ‘মেয়ে মানুষের’ এতো স্পর্ধা থাকবে কেনো! স্বামী-তার পরিবার পীড়ন করবে, তবুও মুখ বন্ধ করে সব সহ্য করতে হবে। এটা যে অমানবিক, তা কোনো ধর্ম-শাস্ত্র দিয়ে কি রোখা যাবে। আজকে বিশ^ জুড়ে নারী-পুরুষ নিয়ত কাজ করে তাদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করছে। তারা রাষ্ট্রনায়কত্বও করছেন। তাহলে তারা কেনো স্বাধীন মত প্রকাশ এবং পিতার সম্পত্তির উত্তারাধিকারিণীসহ বিয়ে বিচ্ছেদ করার অধিকারিণী নন? তাদের মেয়ের ওপর এমন উৎপীড়ন হলে তারা কি সকরবেতন? এদের মানসিকতার কারণেই আজকে দেশময় নির্বিচারে ধর্ষণ হচ্ছে। তার বিচার সরকার সুষ্ঠুভাবে করতে পারছে না। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
মানব সভ্যতার ইতিহাসের সূচনা লগ্নে নারীই ছিলো দলনেত্রী। তারাই পুরে কমিউনের হর্তাকর্তা। সম্পদে মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং অদৃশ্য কিন্তু মহাবলবান ঈশ^র আবিষ্কারের পর থেকে একটি গোষ্ঠির দলপতি পদ ক্রমাগত পুরুষের কব্জায় চলে যায়। নারী তখন থেকেই গৃহকোণে বন্দিনী এবং পুরুষের কৃপাপ্রার্থী এক ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত হয়। তারা কেবল সন্তান উৎপাদন এবং পুরুষের যৌনকাক্সক্ষা পরিতৃপ্তির যন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বাবা মাঠ থেকে ঘেমে নেয়ে আসবে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। সময় মতো স্বামী-সন্তানদের সামনে খাদ্য পরিবেশন করার দায়িত্ব তার। তিনি ব্যস্ত শিশু সন্তানদের পরিচর্যায়, তখনি আদেশ হলো আমাকে এক গ্লাস জল দাও। ¯œানে যাবো, কাপড়-গামছা দাও। অসুখে অসুধ-পথ্য দাও। কিন্তু মা-বোন অসুস্থ হলে বাবা একদিনের জন্যে তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেন না, এক গ্লাস জলও দেন না। তাদের পাশে দাঁড়ানও না। মুখেও সহমর্মিতাও জানান না। ব্যস্ত থাক আর অসুস্থ থাক, মা স্বামী এবং উপযুক্ত ছেলের সেবা খুব কম পান। সেই মাকে যদি সম-অধিকার দেয়ার আইন করে, তাহলে কোনো হিন্দুর তো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তার ছেলের স্ত্রীও তো পিতার সম্পত্তির অংশীদার হবে। সংসার থেকে যেমন যাবে, তেমন আসবেও। এই আইনের প্রয়োগ এবং বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার দেয়ার আইন করা নারী অধিকারকেই সম্মান ও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
‘হিন্দু পারিবারিক আইন প্রতিরোধ কমিটি’ নামের ভূঁইফোড় সংগঠনটি দেশের সংবিধান পরিপন্থি কর্মকা-ে যুক্ত বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। সংবিধান রচনার ভিত্তি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। সংগঠনটি ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ সম-অধিকারের বিষয়টিকেও যুদ্ধাপরাধীদের মতো উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। তাই তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রত্যেক পিতা তার মেয়েকে ভালোবাসে, তাই তার সম্পত্তিতে কন্যার উত্তরাধিকারের বিষয়টিকে অস্বীকার করলে পিতৃত্বকেই অসম্মান ও অপমান করা হবে। হিন্দু পারিবারিক আইনের সংস্কার অনস্বীকার্য বলে আমার মনে হয়। মানবিক মূল্যবোধ এবং পিতৃত্বের দূরত্ব একটুও নেই।