হেভিওয়েট মামলার উত্তাপ সুপ্রিম কোর্টে

আপডেট: জুন ১৬, ২০১৯, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


অবকাশকালীন ও পবিত্র ঈদের ছুটি শেষে আগামীকাল রোববার খুলছে সুপ্রিম কোর্ট। কাল থেকে আইনজীবী-বিচারপ্রার্থীদের পদচারণায় মুখর হবে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গন।
সর্বোচ্চ আদালত খোলার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা, রিটের শুনানিতে উত্তাপও থাকবে। এর মধ্যে বাজার থেকে ভেজাল না সরানোর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলবের শুনানি, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির প্রাক্তন মন্ত্রী সৈয়দ মো. কায়সারের আপিলের শুনান।
এছাড়া বাস দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের পরিবারের ক্ষতিপূরণের রায়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালত স্থানান্তর চ্যালেঞ্জের রিট মামলার শুনানি, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড বিষয়ে আপিলে অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত উপস্থাপন, ওয়াসার পানি নিয়ে প্রতিবেদনের ওপর শুনানির মতো বিভিন্ন হেভিওয়েট মামলা, রিটের রায় ও শুনানি হবে উচ্চ আদালতে। এ সময় সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি থাকবে সুপ্রিম কোর্টের দিকে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো হলো-
১. নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব
গত ২৩ মে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া নামি-দামি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের ৫২ পণ্য বাজার থেকে অবিলম্বে না সরানোয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করেন হাইকোর্ট। ১৬ জুন তাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। আজ এ বিষয়ে শুনানি হবে।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুলও জারি করেছেন হাইকোর্ট। আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ৯৩ পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রতিবেদন ১৬ জুনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলেছেন হাইকোর্ট।
প্রসঙ্গত, বিএসটিআই ৪০৬টি খাদ্য পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ৩১৩টির মধ্যে ৫২ পণ্য মানহীন বলে প্রতিবেদন দেয় বিএসটিআই।
গত ১২ মে হাইকোর্ট বাজার থেকে আইন অনুসারে এসব পণ্য সরিয়ে নিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ওই আদেশ বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিবেদন দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে ৫২ পণ্যের একটির প্যাকেটও জব্দ করার বিষয়টি না থাকায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত অবমাননার রুল জারি করে তাকে তলব করা হয়।
২. রাজীবের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণের রায় ২০ জুন
সড়ক দুর্ঘটনায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের মৃত্যুর ঘটনায় ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের রুলের ওপর রায় ঘোষণার জন্য ২০ জুন তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত।
গত ২৩ মে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেন।
গত বছরের ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার কাছে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারান ছাত্র রাজীব। দুই বাসের চাপায় তার ডান হাত কনুইয়ের ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরদিন ৪ এপ্রিল রাজীবের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীবের অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। ১৩ দিন চিকিৎসার পর ১৬ এপ্রিল মধ্যরাতে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজীব।পরে রাজীবের পরিবারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
৩. আজহার-কায়সারের আপিল শুনানি ১৮ জুন
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির প্রাক্তন মন্ত্রী সৈয়দ মো. কায়সারের আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৮ জুন দিন ধার্য করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। আদালত বলেছেন, ওই দিন আজহারের আপিল মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ১ নম্বরে ও কায়সারের আপিল মামলাটি কার্যতালিকায় ২ নম্বরে থাকবে।
গত ১০ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
৪. পা হারানো রাসেলের ক্ষতিপূরণের মামলা
গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় পা হারানো প্রাইভেটকার চালক রাসেল সরকারকে ক্ষতিপূরণের বাকি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ২৫ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ২৫ জুন এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।
বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ এসব মন্তব্য করেন।
এর আগে গত ৩১ মার্চ গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকার চালক রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে গ্রিন লাইন পরিবহনের করা আবেদন খারিজ করে রোববার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
গত ১২ মার্চ রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ।
গত বছর ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে কথা কাটাকাটির জেরে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচালক ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাইভেটকার চালক রাসেল সরকারের ওপর দিয়েই বাস চালিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেটকারের চালক রাসেল সরকারের (২৩) বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৫. আদালত স্থানান্তর : খালেদার রিট শুনানি নিয়মিত বেঞ্চে
বিএনপির চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার বিচারে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর আদালত স্থানান্তরে জারি করা প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিটের শুনানি হবে নিয়মিত বেঞ্চে।
গত ১১ জুন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত অবকাশকালীন হাইকোর্ট এ আদেশ দেন। এ আদেশ অনুযায়ী উচ্চ আদালত খোলার পরই এ রিট মামলার শুনানি হবে।
গত ২৬ মে বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর আদালত স্থানান্তর করা নিয়ে গত ১২ মে’র প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার ও চ্যালেঞ্জ করে চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল রিটটি দায়ের করেন।
৬. ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’ নিয়ে অ্যামিকাস কিউরিদের শুনানি
‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’ এ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ শুনানিতে ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস’ হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি মতামত তুলে ধরতে চার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন আদালত। এই চার আইনজীবী হলেন- ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিনকেও এই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেওয়া হয়। আগামী কাল সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর থেকে অ্যামিকাস কিউরিরা তাদের মতামত আপিল বিভাগে তুলে ধরবেন।
২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর একটি হত্যা মামলায় দুই আসামি আতাউর মৃধা ও আনোয়ার হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে।
এসব আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টের সে রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল আবেদন জানান।
২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাসসহ সাত দফা অভিমত দেন। এরপর আপিলের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি