বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

আপডেট: December 7, 2019, 1:32 am

মো. তাজেমুল হক


পদ্মা নদীতে সি প্লেন থেকে নেমে নৌকায় করে রাজশাহী শহরের ঘাট অভিমূখে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ( ১৯৫৪ সাল)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
শহীদ সোহরাওয়ার্দী একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন। সারাজীবন রাজনীতি করেও তার আত্মসম্মানে এতটুকু কালির দাগ লাগতে দেননি। আত্মসম্মান রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মন্ত্রিত্বও ছেড়ে দিয়েছেন। আগেই বলেছি ১৯৪৭ সালের ১৩ই আগস্ট পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত ভাগ পাশাপাশি বাংলা ভাগ উত্তরকালে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য তার গ্রুপের লোকেরা উঠেপড়ে লাগলো। এদিকে গণভোটে সিলেট জেলা পূর্ববঙ্গে যোগ দেওয়ায় ১৭ জন এমএলএ পূর্ববঙ্গ পার্লামেন্টারি পার্টিতে যোগ দেন। তারা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিকট প্রস্তাব দেয় যে, সোহরাওয়ার্দী যদি তাদের ৩ জন মন্ত্রী ও ৩ জন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারির পদ দেয় তবেই তারা তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিবেন। নীতিবান সোহরাওয়ার্দী জবাব দিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী না হয়ে আগাম কথা দিতে পারবেন না। তখন তারা খাজা গ্রুপকে এ প্রস্তাব দিলে তারা সাথে সাথে তা লুফে নেয়। ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট পূর্ববঙ্গ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচনের দিন। যিনি নেতা নিবার্চিত হবেন তিনিই হবেন র্প্বূবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী। উল্লিখিত তারিখের আগেই খাজা গ্রুপ এমএলএদের বাড়ি বাড়ি ভোট কেনার জন্য ঘোরাঘুরি শুরু করলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। সোহরাওয়ার্দীর একজন ভক্ত এবং শুভাকাক্সিক্ষ আরপি সাহা বিষয়টি জানতে পেরে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের রাজনৈতিক সচিব মাহামুদ নুরুল হুদার সাথে কথা বলেন। মাহমুদ নুরুল হুদাকে তিনি বলেন, ‘টাকার জন্য সোহরাওয়ার্দী সাহেব যেন হেরে না যান। ভোট কিনতে টাকা যা লাগে আমি দেবো। কিন্তু দেশের স্বার্থে স্যারের পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী হওয়া খুবই প্রয়োজন।’ মাহমুদ নুরুল হুদা সোহরাওয়ার্দীর নিকট এ প্রস্তাব দিলে, তিনি জবাব দিলেন, রনদাকে বলো, টাকা দিয়ে ভোট কিনে মন্ত্রী হবার শখ সোহরাওয়ার্দীর নেই। সব শুনে রনদা প্রসাদ সাহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সোহরাওয়ার্দী সাহেব অনেক উঁচু মাপের লোক।’ ইস্পাতের মতো দৃঢ় ছিল তাঁর চরিত্র। আবার প্রয়োজনে শিশুর মতো সরল। তিনি ছিলেন, সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত এবং অসম সাহসী মানুষ। তিনি যা তার কর্তব্য মনে করতেন, তা যতই ঝুঁকিপূর্ণ হোক, নির্ভিক চিত্তে তিনি তা না করে ছাড়তেন না। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ছিল মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। এই সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় হিন্দু- মুসলমান রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। কলকাতায় সেদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ১৭ আগস্ট কোলকাতার ইংরেজি দৈনিক দি স্টেটসম্যান সেদিন খবরের শিরোানাম করেছিল “দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং”। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পুলিশ হেড কোয়ার্টারে কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব নিয়ে দক্ষ সেনানায়কের মত দাঙ্গা থামাতে পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরদিন মোল্লা জান মোহাম্মদের নেতৃত্বে মুসলমান নেতারা তার বাসায় বৈঠকে বসেন। মুসলিম নেতারা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত হন এবং বলেন, ‘আপনার হিন্দু বেয়ারা সিবুকে কাজ ছাড়িয়ে দিন এবং নাপিত জগদিসকে সেভ করার জন্য আসতে নিষেধ করুন।’ সোহরাওয়ার্দী সাহেব এ প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি যদি ওদের তাড়িয়ে দেই তাহলে আমিতো সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবো। তাহলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা কী করে আমার মুখে শোভা পাবে?’ মুসলিম নেতারা তার কথা শুনে তাজ্জব হয়ে যান। এখবর প্রকাশ পাবার পর সব মহলেই ইতিবাচক ফল ফলেছিল। এ প্রসঙ্গে আরো একটি ঘটনা উল্লেখ্য-দাঙ্গা থামানোর জন্য পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজেই কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতেন। হিন্দু এলাকায় গেলে তিনি হিন্দু নেতাদের সঙ্গে নিতেন, মুসলমান এলাকায় গেলে তিনি একাই যেতেন। একদিন মেডিকেল কলেজের পিছনে মুসলমান বসতি এলাকা থেকে ফেরার পথে কয়েকশো হিন্দু উত্তেজিত যুবক ‘বন্দে মাতরাম’ বলে তাঁর গাড়ির গতিরোধ করে। তাঁর দেহরক্ষীরা পিস্তল বের করতেই তিনি তাদের থামালেন। তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। গাড়ি থামিয়ে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী দরজা খুলে তাদের মখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তোমরা শান্ত হও। সোহরাওয়ার্দীকে মারলে কলকাতার দাঙ্গা থামবে না বরং সারা ভারতময় ছড়িয়ে পড়বে। তাতে লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ মানুষ প্রাণ হারাবে।’ এর ফলে ওই উত্তেজিত যুবকরা শান্ত হয় এবং বলে, ‘স্যার আপনি যান।’ তাঁর রাজনৈতিক সচিব তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনি জীবনের এতটা ঝুঁকি নিলেন কেন?’ জবাবে সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘দেখো, আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী, এই খুনোখুনি বন্ধ করা আমার ফরজ। এ দায়িত্ব আমার। আমি তা এড়াতে পারি না। এভাবে আমি ওদের মুখোমুখি না হলে ওরা আমাদের মেরে ফেলতো।’ পিস মিশনের বক্তৃতায় একটি কথা তিনি প্রায় বলতেন, যার যা ধর্ম সে তা পালন করবে। ধর্ম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্মের কারণে রেশারেশি ও মানবনিধন ভারত পাকিস্তান উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।’ তাঁর ৩ নম্বর ওয়ালেসলি ফার্স্ট লেনের বাড়িতে একটি আউট হাউসে কিছু ছাত্র থাকতো। তারা নিজেরা মেস করে খেত। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের লেখাপড়া ও খাওয়া দাওয়া বাবদ সমস্ত খরচ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ভাবে গরিব ছাত্র ও দুস্থ গুণী মানুষদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দানধ্যান করতেন। ব্যবসা বাণিজ্যসহ নিজের পাঁয়ে দাঁড়ানোর জন্যও তিনি অনেককে অর্থ সহায়তা দিতেন।
১৯১৯ সালে তিনি বিলাতের শিক্ষা শেষে দেশে ফেরেন। ১৯২১ সালে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তাঁর কর্ম জীবনের স্ফীতি প্রায় ৪৪ বছর। এই ৪৪ বছরের মধ্যে প্রায় ১০ বছর তিনি মন্ত্রীত্ব করেছেন। বাকি ৩৪ বছর কেটেছে তাঁর রাজনীতি ও আইন ব্যবসা করে। আইন ব্যবসায় তাঁর প্রচুর যশ ও খ্যাতি ছিল, আয়ও ছিল বিস্তর। কিন্তু মানবদরদী এই মানুষটি তাঁর আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করতেন মানব কল্যাণে। এ প্রসঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সচিব জনাব মাহমুদ নুরুল হুদা তাঁর ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’ বইতে লিখেছেন, ‘মানুষের আর্থিক সংকটে সোহরাওয়ার্দী হাই কোর্টে মামলায় সদ্য উপার্জিত অর্থের শেষ কপর্দক পর্যন্ত এক মুঠায় বিলাইয়া দিয়া পরোক্ষণেই স্বীয় চলিবার টাকার জন্য ঋণ করিতে দ্বিধা করেন নাই। বাঙ্গালী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীবৃন্দ সোহরাওয়ার্দীর উপার্জিত টাকা কিভাবে লুট করিয়াছে তাহাও দেখিয়াছি।’ গরিব-দুখী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মামলা তিনি বিনা পয়সায় লড়তেন। খুবই অভিজাত এবং বিদগ্ধ পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। বাবা স্যার জাহেদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি, মা বেগম খোজেস্তা বানু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সামিনার, সমাজসেবি এবং বিশিষ্ট কবি। তিনি নিজে অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী ছিলেন দুই বার, প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। দেশ ভাগের পর তিনি পাকিস্তানের আইন মন্ত্রী ছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন কিন্তু তাঁর নিজস্ব কোনো বাড়ি ছিলনা। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কোনো বিষয় সম্পত্তি বা ব্যাংক ব্যালেন্সও ছিলো না। তিনি ছিলেন, মানব কল্যাণে আত্মনিবেদিত একজন তাপস, রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ¦ল ধ্রুবতারা। মৃত্যুর আগে শুধু একমাত্র ছেলে রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর বিলেতে লেখাপড়ার খরচের জন্য চিন্তিত হয়েছিলেন। মহামণীষীদের জীবনের পথ মসৃণ হয় না। ভারত ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে পাকিস্তানের চর বলেছিল। তাঁর সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাকে দেশ ছাড়া করেছিলো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তাকে ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুত্তা ব’লে গালি দিয়ে ছিলো। আইয়ুব খান তাঁকে জেলে পূরেছিলো। এ সবের পিছনে কারণ ছিলো একটাই- তিনি ছিলেন অসম্ভব দেশ প্রেমিক এবং জনপ্রিয়। এরা সবাই তাকে ভয় করতেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের হোটেল ইন্টার ন্যাশনালের একটি নির্জন কক্ষে আত্মীয় পরিজনহীন অবস্থায় এই কর্মবীরের মৃত্যু হয়। পরে তাঁর লাশ ঢাকায় এনে হাইকোর্ট মাজারে শেরে বাংলার কররের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আমরা তাঁর মহান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক: অধ্যক্ষ (অব.) চক্কীর্তি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ