১২৬৬ ভোটের মধ্যে আমি পেয়েছিলাম ৬৯০ ভোট

আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

জাস্টিন ট্রুডু


পঁয়তাল্লিশ…
নমিনেশন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছিলো কলেজ এন্ড্রিও-গ্রাসাতে, জায়গাটা ছিলো পাপিনিউ সংসদীয় এলাকার সীমানা ঘেঁষে। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে সে সম্পর্কে যদিও আমার কোনো ধারণা ছিলো না, কিন্তু আমি যখন সেই অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেছিলাম, তখন এক ধরনের প্রশান্তির ছায়ায় আমার দেহমন শান্ত হয়ে গিয়েছিলো। হয়তো এর প্রধানতম কারণ ছিলো, সেই সময় আমার চারপাশে আমি আমার সারা জীবনের ভালোবাসার মানুষদের এক ধরনের উষ্ণতার উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম। সোফির সাথে ওখানে ছিলেন আমার মা, আর আমার ভাইকে দেখলাম তার চার মাসের ছেলে পিয়েরে’কে নিয়ে এসেছে। শাসা তার নতুন পরিবার আর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজের জীবন গড়া নিয়ে তখন খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলো। এই অবস্থায় আমার প্রতি তার ভালোবাসা আর সহযোগিতা আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিলো।
শুরু থেকেই সবাই ভেবেছিলো, এই নির্বাচনী দৌড়ে আমি অন্যান্য দু’জনের থেকে অনেক পিছিয়ে থাকবো। আর সবার এই ভাবনার প্রতিফলন আমার মস্তিষ্কে কিছুটা হলেও লেগেছিলো। ফলে আমার মানসিক চাপ তেমন একটা ছিলো না। কিন্তু আমি শুরু থেকেই ভেবেছিলাম, আমি অন্য অভিজ্ঞ দু’জনের বিরুদ্ধে আমার সব সাধ্য দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবো। আমার নির্বাচনী কাজ-কর্ম ও প্রচারণায় অনেকেই মন্তব্য করেছিলো, নির্বাচনী হাওয়া বদল হলেও হতে পারে এবং এমনো হতে পারে আমাকে হারানোর জন্য ডেরস ও জিয়োর্দানো’কে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে, এমন মন্তব্য বা ধারণা আমার জন্য খুবই সুখকর ছিলো। আমি সত্যিই জিততে চেয়েছিলাম। তবে আমার এটাও মনে হয়েছিলো, আমার সব আন্তরিক চেষ্টার পর অথবা এমন বৈরী পরিস্থিতিতে আমি যদি হেরে যাই, তবে দুঃখের সাগরে নিজেকে নিমজ্জিত না করে, আমি আগামীর জন্য উঠে দাঁড়াবো।
সেই সন্ধ্যায় প্রচুর মানুষের ভীড় দেখে আমার বারবার মনে হচ্ছিলো, এমন পরিস্থিতিতে আমি আমার বাবার থেকে অনেক বেশি আলাদা। আমার বাবা কখনোই ভোটের জন্য মুদির দোকান এবং পার্কিং লটস এর আশেপাশে প্রচারের জন্য ঘুরঘুর করতেন না বা ভোটে দাঁড়ানোর মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে নেমে কখনোই এমনভাবে কোনো স্কুলের অডিটোরিয়ামে উপস্থিত থাকতেন না। তবে, এটাও স্বীকার করতে হবে, সেই সময় রাজনীতির ধারার অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো। এক সময় রাজনীতিতে অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের, সাধারণত নামকরা ব্যাংকার বা আইনজীবিকে ভোটে দাঁড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হত। তারা তাদের সারাজীবনের কর্ম দ্বারা ভোটারদের আস্থা আর বিশ্বাস অর্জন করতেন এবং তারা শুধু তাদের নিজস্ব সংসদীয় এলাকাতেই নিজ কর্ম গুনে পরিচিত থাকতেন না বরং তারা তাদের কর্মের জন্য গোটা কানাডা’তেই এক ধরনের পরিচিত লাভ করতেন। আমার বাবার ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছিলো। তিনি সব সময়ই ভাবতেন, তিনি শুধু তাঁর নিজের সংসদীয় এলাকারই প্রতিনিধিত্ব করছেন না বরং তিনি যে বিশ্বাস ও মূল্যবোধ ধারণ করেন সেটা তিনি গোটা কানাডাতেই প্রয়োগ করতে চান। তিনি একজন খুবই ভালো সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তিনি যে বিষয়গুলোর জন্য কাজ করতেন বা লড়াই চালিয়ে যেতেন, সেগুলো সারা কানাডার সাথে সাথে একই সাথে তাঁর নিজস্ব সংসদীয় এলাকা মাউন্ট রয়্যাল এর জন্য মঙ্গল বয়ে আনতো। তিনি কিন্তু কখনোই ব্যক্তিগতভাবে নিজের উদ্যোগে ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করতেন না, যেমনটি আমি পাপিনিউ’এর রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর হেঁটে হেঁটে করেছি।
এসব কিছু যখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেই রাতে সবার উদ্দেশ্যে আমাকে যে কথা বলতে হবে, সেটাতে আমি কোনোভাবেই আমার বাবার নাম উচ্চারণ করবো না। আমার মনে হয়েছিলো যদি কেউ কখনো মনে করেন আমি বাবার নাম ভাঙ্গিয়ে সবার কাছ থেকে সহানুভূতি প্রত্যাশা করছি, তাহলে সেটা আমার জন্য হবে খুবই কষ্টের।
কিন্তু রেইনে আমাকে একটু অন্যভাবে বিষয়টা ভাবতে বলেছিলেন। তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, বর্তমান পাপিনিউ এর একটা অংশ এক সময়ে মাউন্ট রয়েল সংসদীয় এলাকার মধ্যে ছিলো। এর মানে হচ্ছে, ওই যে এলাকা থেকে এক সময় বাবা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতেন। ফলে সেই এলাকার কিছু ভোটার এখানে উপস্থিত থাকতেই পারে এবং বাবার কাজ-কর্মের প্রতি তাদের এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ এখনো থাকবে এটাও স্বাভাবিক। আর আমি যদি ওই মানুষগুলোর প্রতি কোনো রূপ শ্রদ্ধা না জানাই, তবে সেটা হবে এক ধরনের অভদ্রতা ও অকৃতঘœতা। রেইনে এও বলেছিলেন, বাবার কথা উচ্চারণ না করে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা না জানালে, তাদের অসম্মানিত করা হবে। তিনি আমাকে আরো বলেছিলেন, আমি যদি ওই মুহূর্তে বাবার কথা না উচ্চারণ করি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমি আর কখনো তেমন সুযোগ পাব বলে মনে হয় না। অবশেষে, তার কথা শুনে এবং সে অনুযায়ী আমি সেই সন্ধ্যায় সবার সামনে বলার জন্য একটা বক্তব্য তৈরি করে ফেললাম।
আমি ইতিহাসের দিকে তাকিয়েই খুবই ছোট্ট করে এমনভাবে শুরু করেছিলাম, “১৯৬৫ সালের শরতে পার্ক-এক্স এর মানুষেরা পেশাগত শিক্ষক পিয়েরে ইলিয়ট ট্রুডো’কে প্রথম বারের মত সদস্য হিসেবে হাউস অব কমন্স এ পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে, সেই সাথে সেই সংসদীয় এলাকার সীমানারও কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু চল্লিশ বছর আগের যে কানাডায় আপনারা বাস করতেন, সেটারও একটা পরিবর্তন ঘটেছে।” আমি একটু থেমে তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম, “পিয়েরে ট্রুডো কানাডার মানুষকে যে ‘চার্টার অব রাইটস এন্ড ফ্রিডম’ উপহার দিয়েছিলেন সেটার বয়স পঁচিশ বছর পার হয়ে গেছে। মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সারা পৃথিবীতে এটা একটা উল্লেখ করার মত উদ্যোগ।” আমি সবার দিকে তাকিয়ে আবার বলা শুরু করেছিলাম, “আমরা এখন সবাই সেই চার্টারেরই ফসল ভোগ করছি, আর কানাডিয়ান হিসেবে আমরা সবাই আজ সেই চার্টারের জন্য গর্ব অনুভব করি। সেই সাথে আমি আপনাদের সবাইকে এটাও বলি, আপনারা সবাই একটু চিন্তা করুন, আমি কত বেশি ভাগ্যবান এই কারণে যে আপনাদের সেই প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো হচ্ছেন আমার বাবা।”
আমি আমার হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা থেকেই পাপিনিউ সম্পর্কে কথা চালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার বক্তৃতায় পাপিনিউ এবং এর আশেপাশের এলাকায় যারা মানুষ ও সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন, অতি শ্রদ্ধাভরে আমি সবার নাম উল্লেখ করে তাদের প্রতি আমার হৃদয়ের ভালোবাসা জানিয়েছিলাম। তারপর আমি লিবারেল পার্টির পার্লামেন্ট সদস্যের আসন থেকে কনজারভেটিভ পার্টির নীতি ও পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাদের অসংযতা সবার সামনে তুলে ধরেছিলাম। আমার এখনো মনে আছে, আমি বলেছিলাম, “কনজারভেটিভরা আমাদেরকে আমাদের সামাজিক ন্যায় বিচার থেকে আলাদা করে ফেলছে। তারা আমাদেরকে আমাদের সুন্দর পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে এবং তাদের পদক্ষেপগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে কানাডার যে ভূমিকা, সেটা থেকে তারা আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আমেরিকার নিয়ম-নীতির কাছে তারা কানাডার যে সুন্দর ভূমিকা ও নিয়ম-নীতি তা জলাঞ্জলি দিয়ে ফেলছে।
গত দু’মাস ধরে পাপিনিউ সংসদীয় এলাকার প্রতিটি রাস্তা এবং শপিং মল এলাকায় আমি গিয়েছি। ওই সময়ে আমি হাজার হাজার মানুষের সাথে হাত মিলিয়েছি এবং তাদের কাছ থেকে অসংখ্য গল্প শুনেছি। আমার তখন বারবারই মনে হয়েছে, এই মানুষগুলোর কাছ থেকে আমি অসংখ্য অজানা বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেছি। সেই সন্ধ্যায় ভোটাভুটিতে আমি কেমন ভোট পাবো, সেই বিষয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। আমার বারবার শুধু মনে হচ্ছিলো, সবাই এক বাক্যে বলবে, আমি ভোট পাওয়ার জন্য এলাকার মানুষের সাথে যে সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, আমি তার সবকটিই করেছি।
আমি যখন সবার উদ্দেশ্যে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন উল্লেখ করার মত কিছু একটা ঘটে গিয়েছিলো। কারণ আমি যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই দেখাছি আমার সব পরিচিত মুখ, আমি এই সব মানুষদের সাথে কথা বলার জন্য কখনো কাউকে সেন্ট লরেন্ট, সেন্ট হুবার্ট এবং ক্রিস্টোফার কলম্বো’র রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়েছি, অথবা আমি রু-এভারেট এবং এভিনিউ দ্য চাতেউব্রাইন্ড এ এদের অনেকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা চালিয়ে গেছি। তারা হাসি মাখা মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আমার কথা শুনেছিলো। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিলো, ভোট শুরুর সময় থেকেই তারা আমাকে জোর সমর্থন করে গিয়েছিলো।
সেই সন্ধ্যার প্রথম ভোটে আমি ভালোভাবেই জিতেছিলাম। ১২৬৬ ভোটের মধ্যে আমি পেয়েছিলাম ৬৯০ ভোট, মিজ ডেরস পেয়েছিলো ৩৫০ আর মি. জিওর্দানো পেয়েছিলো ২২০। যখন ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হলো, আমি প্রথমেই রেইনি’র কাছ গিয়ে তাঁকে পরম কৃতজ্ঞতায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। রেইনি’কে জড়িয়ে ধরার সময়ই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাসার দিকে আমার চোখ পড়েছিলো। দেখলাম, তার চোখ দিয়ে কান্নার ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছে। বুঝলাম, আমার জয়ে আমার ছোট ভাইয়ের আনন্দাশ্রু ঝরছে।
আমরা যখন সবাই আমার বিজয়ের আনন্দের মধ্যে ছিলাম, তখনই স্টিফেন ডিওন ফোন করে আমার বিজয়ের জন্য আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। যদিও তিনি এবং তাঁর দল এই ভোটযুদ্ধে আমাকে সমর্থন না করে ম্যারি ডেরস’কে করেছে, কিন্তু এখন তিনি আমাকে সত্যিকারের শুভেচ্ছা জানাতে কোনো কার্পণ্য করেন নি। সেই সময় তিনি আমাকে যে কণ্ঠে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন তা সত্যিই আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিলো এবং ফোনের এপার থেকে তাঁর সেই শুভেচ্ছার জন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম। সেই প্রার্থী নির্বাচনের লড়াই এর সময় আমাদের দু’জনের সম্পর্ক খুব উষ্ণও ছিলো না আবার একেবারে বৈরীও ছিলো না। স্টিফেন সব সময়ই আমার সাথে এক ধরনের শ্রদ্ধার সাথে ব্যবহার করতেন এবং সেই দেড় বছরের রাজনৈতিক উথাল পাথালের সময় থেকে আমার জয়ী হওয়া পর্যন্ত আমি খুবই সতর্কভাবে তাঁর প্রতি আমার যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে এসেছি।
(চলবে)