১৫ আগস্ট ও কিছু কথায় বঙ্গবন্ধু

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

শরীফ সাথী


স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন কোন বাঙালি নেই যে কখনো এমন সুমধুর নামটি শোনেন নি। সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে অনন্য অনবদ্য এক অবিম্মরণীয় একটি নাম, একটি আদর্শ। ১৫ই আগস্ট এলে হৃদয় মাঝে কান্নার বাঁধভাঙা ঢেউ দুচোখ বেয়ে গাল বয়ে যায়। বেদনার অব্যক্ত কথাগুলো মুখে আসে অবিরত এভাবে
ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা সিঁড়ি, ধানমন্ডির ৩২নং রোডের রক্ত¯œাত বাড়ির মেঝেতে স্বপরিবারে ঘুমিয়ে সর্বকালের অবিস্মরণীয় বেদনা কাতর বেদনা বিধুর পরিবেশ। নির্মম, বর্বরতা বিপথগামী ভন্ডের নিষ্ঠুর কলংকময় জঘন্যতম কিছু ঘাতকের ছোবল খাবল বুলেটের আঘাত কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই নিথর -নিস্তেজ দেহগুলো পড়ে আছে । দাদুদের কাছ থেকে ১৫ ই আগষ্টের এমন কথা অর্ধনমিত পতাকার কথা শুনতে শুনতে আমার চোখ ফেটে রক্তে অশ্রু ঝরতে ঝরতে বুক ভাসিয়ে চাপড়ায় আর বলি বঙ্গ পিতা তুমি চিরদিনের মত ঘুমাওনি তুমি আছো আমার ভিতর। আছো তুমি প্রতিটি বাঙালির ভিতর। আছো তুমি তর্জনী উচিয়ে বাংলার পতাকা হাতে। তুমি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি । তুমি এই বঙ্গের পিতা। এ দেশের এই সবুজ সমারহের ঢেউয়ে মিশে আছে তোমার স্মৃতি ছবি গাছে গাছে পাখিদের কন্ঠে বাজে তোমার স্মরণ ধ্বনি ঝরনা স্রোতের কলতানে খুঁজে ফিরে দেখি তোমার সমুজ্বল মুখ। জোছনার চাওয়াতে তোমার চাওয়া খুঁজে পায়। ১৫ ই আগষ্ট এই বাংলার শোকবহ দিন হারানোর দিন। কালো পতাকা বহনের দিন। বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আবোহমান ধারায় বয়ে যাও তুমি বাঙ্গালীর শিরায় শিরায় হৃদপি-ে। জেগে ওঠো পিতা, জেগে ওঠো, তোমার মুক্তিকামী স্বাধীনচেতা বাঙ্গালিরা আজ কেমন আছে? তোমার স্বপ্নময়ী ষড় ঋতুর সোনার বাংলাদেশ গ্রীষ্মের মৌ মৌ ফলের সুমিষ্ট গন্ধ, বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টির মায়াগান ছন্দ; শরতের কাশফুল ঘাসফুলে সাজানো প্রকৃতি। হেমšেত্মর নবান্ন উৎসব, শীতের শিশির ¯œাত কচি ঘাসের দৃশ্য; বসন্তের উদাত্ব যৌবনের আহ্বান আজ কেমন আছে? হয়তো তুমি দেখছো পিতা সমগ্র বাংলাকে সমগ্র বাঙ্গালির মায়াবী চক্ষু মেলে অপলকে অপলকে…।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলতে চাই দুটি কথা। বাঙালি জাতি তাকে ‘জাতির জনক’ উপাধি দিয়ে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে। কৃষক, শ্রমিক মেহনতী মানুষ, ছাত্রসমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোপা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অগাধ অকৃতিম ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেছে। বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতির অহংকার ও গর্বের জ্বলজ্বলে প্রতীক। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর তেজদৃপ্ত বজ্রভাষণ আজো শিহরিত করে তোলে সমগ্র অস্থিমজ্জা। “ রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেবো, তবুও এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম ; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” কালজয়ী এ ভাষণ শুধু বাংলার মানুষ কেন সমগ্র বিশ্বের মানুষই তাঁর লোম শিহরিত এক স্বাধীনতার যুদ্ধসংবলিত বজ্রশক্তি।
গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান আর মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তাঁর ডাক নাম খোকা। সীমান্তডাঙ্গা গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শেষ করে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রবেশিকা পাশ করেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে বিয়ে পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকায় এসে আইন বিভাগে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪০ সালে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ছাত্র সংগঠনের গুর¤œত্বপূর্ণ পদে দ্বায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিপ্লবী নেতা সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক ও শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী’র সংস্পর্শে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে আইন পড়ার সময় কর্মচারিদের ধর্মঘটে অংশগ্রহন করলে গ্রেফতার হন। আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন জেলে থাকাকালিন ১৯৪৭ সালেই। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। গুলিবর্ষন প্রতিবাদে কারাগারেও তিনি অনশন চালিয়ে যান। যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বচিত হন ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠিত হলে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক সরকারে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দমন বিভাগে মন্ত্রি হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খাঁন ত্মগমতায় এলে কোন কারন ছাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বাঙালীর মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক ‘৬ দফা’ কর্মসূচি ঘোষণা করলে সে সময়ের সরকার তাকে আগরতলা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে। মুক্তিলাভ করেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে। মুক্তিলাভের পরে এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে।
আইয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে একক বিজয় লাভ করে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান ও পাকি¯তানী নেতারা সরকার ক্ষমতা না দিয়ে সংসদের বৈঠক অনিষ্ঠকালের জন্য বন্ধ করে ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রচন্ড আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ অসহযোগ আন্দোলন ঘোষনা করেন। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়ে সেই সুপরিচিত বজ্্রধ্বনি ‘ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম…….ঘোষণা করেন। নিরিহ বাঙালীদের উপর ২৫শে মার্চ রাতে পাকি¯ত্মানী সামরিক বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার আগেই ওয়ারলেস বার্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে।
“যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা, গৌরি-যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।” পাকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ত্মগমতা গ্রহন করেন। নতুন করে দেশ গঠনের কাজ শুরু করলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতে কতিপয় বিপদগামী সামরিক অফিসারের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হন। বাংলাদেশকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালবেসে গেছেন। বাংলার মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোটি কোটি জনতার হৃদয়ে তিনি অমর অক্ষয়। হৃদয়ের স্পন্দনে তিনি মিশে আছেন মিশে থাকবেন অনন্তযুগ।