২০১৭-১৮ অর্থবছর ২১ শতাংশ ভ্যাট এসেছে একটি কোম্পানি থেকে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সরকারের রাজস্বের মূল উৎস এখন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট। ২০১৭-১৮ অর্থবছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট রাজস্বের ৩৭ শতাংশের বেশি এসেছে ভ্যাট থেকে। এনবিআর আহরিত এ ভ্যাট রাজস্বের ২১ শতাংশই জোগান দিয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ লিমিটেড। গত অর্থবছর এককভাবে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট দিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিটি।
২০১৭-১৮ অর্থবছর ভ্যাট বাবদ রাজস্বের প্রায় অর্ধেকই জোগান দিয়েছে বিভিন্ন খাতের ১০ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তিনটিই তামাক খাতের। এ খাতের অন্য দুই প্রতিষ্ঠান হলো ঢাকা টোব্যাকো ও আবুল খায়ের টোব্যাকো। তিন সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকও রয়েছে শীর্ষ ১০ ভ্যাট প্রদানকারীর তালিকায়। এ তালিকায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÍ পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস, হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
এনবিআর বলছে, কিছু পণ্যে উচ্চ করারোপ, তামাক ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যবসায় বিস্তৃতির ফলে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান থেকেই ভ্যাট বাবদ রাজস্বের সিংহভাগ আসছে। পাশাপাশি এসব কোম্পানির কমপ্লায়েন্স পরিপালনের কারণে শীর্ষ প্রতিষ্ঠাগুলোর রাজস্ব খাতে অবদান বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ অর্থবছরে ভ্যাট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক এসেছে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠান থেকে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের রাজস্ব চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ এনবিআরের রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৭৭ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠান। তালিকায় সবার উপরে থাকা বিএটি বাংলাদেশ লিমিটেড একাই দিয়েছে ১৬ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও সারচার্জ বাবদ সর্বশেষ অর্থবছরে এ ভ্যাট দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরও ১৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা দিয়ে শীর্ষ ভ্যাট প্রদানকারীদের তালিকায় সবার উপরে ছিল কোম্পানিটি। মূলত সিগারেট উৎপাদনের পর স্ল্যাবভেদে টার্নওভারের সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ হারে মূসকসহ প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য হওয়ায় এ বিপুল কর দিয়েছে তাদের।
বিএটি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান গোলাম মইন উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, সম্পূরক শুল্ক ও মূসক বাবদই দৈনিক ৫০ কোটি টাকা এনবিআরকে পরিশোধ করছে বিএটি। এর বাইরে করপোরেট কর, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ও উন্নয়ন সারচার্জও দিতে হয় আমাদের। বিএটি শতভাগ কমপ্লায়েন্স মেনে রাজস্ব পরিশোধ করছে। বেশি টার্নওভার ও সরকার নির্ধারিত করহারের কারণে আমাদের কোম্পানি ভ্যাট প্রদানে শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ।
সর্বশেষ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা ভ্যাট দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলা। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) থেকে কেনা পণ্যের বিপরীতেই এ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রদান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আগের অর্থবছরেও ৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভ্যাটদাতা ছিল পেট্রোবাংলা।
এর বাইরে গ্যাস বিতরণের ওপর ভ্যাট প্রদান করে শীর্ষ দশে স্থান করে নিয়েছে পেট্রোবাংলার অধীনস্থ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ড। তিতাস গ্যাস ২ হাজার ৯ কোটি টাকার ভ্যাট দিয়ে শীর্ষ তালিকার পঞ্চম স্থানে ও হবিগঞ্জ গ্যাস কোম্পানি ৬২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করে নবম স্থানে রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মো. তৌহিদ হাসনাত খান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস বিতরণের মাধ্যমে কোনো ব্যবসা করছে না। অন্য বড় কোম্পানির তুলনায় গ্যাস কোম্পানিগুলোর টার্নওভার বেশি না হলেও মূলত সম্পূরক শুল্কের কারণে এ খাতে পেট্রোবাংলা ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক বেশি রাজস্ব প্রদান করতে হয়। আইওসি থেকে নেয়া পণ্যের বিপরীতেই এ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রদান করতে হয় তাদের। পাশাপাশি বিক্রয়ের ওপর উেস কর দেয়ার কারণে শীর্ষ তালিকায় নাম আসছে গ্যাস কোম্পানিগুলোর।
গত অর্থবছর ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা পরিশোধ করে শীর্ষ তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে সদ্য কোম্পানি স্বত্ব বিক্রি হওয়া ঢাকা টোব্যাকো লিমিটেড। বর্তমানে ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকো নামে ব্যবসা শুরু করা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ভ্যাট দিয়েছিল সরকারকে। ১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করে শীর্ষ তালিকার ষষ্ঠ স্থানে তামাক খাতের আরেক কোম্পানি আবুল খায়ের টোব্যাকো লিমিটেড। যদিও আগের অর্থবছর ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা ভ্যাট দিয়ে শীর্ষ তালিকার পঞ্চম স্থানে ছিল কোম্পানিটি। নিম্ন স্ল্যাবের সিগারেটের বিক্রি কমে যাওয়ায় আবুল খায়ের টোব্যাকোর ভ্যাট পরিশোধ কমেছে বলে জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
ভ্যাট প্রদান করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অবদান রাখায় চতুর্থ স্থানে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান টেলিযোগাযোগ খাতের গ্রামীণফোন লিমিটেড। সর্বশেষ অর্থবছরে গ্রামীণফোন ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ রাজস্ব প্রদান করেছে ২ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরও ২ হাজার ২৯৭ কোটি টাকার ভ্যাট দিয়ে শীর্ষ তালিকায় চতুর্থ স্থানেই ছিল কোম্পানিটি।
অন্য খাতের কোম্পানির তুলনায় টার্নওভার বেশি হওয়ায় শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে এ খাতের আরো দুই প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড। রবি সর্বশেষ অর্থবছরে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করে সপ্তম ও বাংলালিংক ৬৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে অষ্টম স্থানে রয়েছে। যদিও এনবিআরকে দেয়া এ রাজস্বের বাইরে বিটিসিএল ও করপোরেট করসহ সেলফোন অপারেটরদের আরো রাজস্ব পরিশোধ করতে হয় বলে দাবি কোম্পানিগুলোর।
সেলফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস বাংলাদেশের (অ্যামটব) সচিব টিআই নুরুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রাহকদের রিচার্জের ওপর ১৫ শতাংশ মূসক ও ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাবদ যে কর কাটা হয়, ভ্যাটের ক্ষেত্রে শুধু তা-ই হিসাবে আসে। যদিও কোম্পানিগুলোকে মোট রেভিনিউর প্রায় ৫৩ শতাংশ বিভিন্ন খাতে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। সেরা করদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সহায়তা জোগানো হলে কর প্রদানে আগ্রহ বাড়বে বলে জানান তিনি।
তামাক, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানিগুলোর বাইরে ভ্যাট প্রদানে সর্বোচ্চ তালিকায় রয়েছে বিপিডিবি। গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে সর্বশেষ অর্থবছরে ৪২০ কোটি টাকা পরিশোধ করে দশম স্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।