৬৫ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমাদের প্রত্যাশা

আপডেট: জুলাই ৬, ২০১৮, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ড. সুলতান মাহমুদ রানা


দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আজ ৬৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ ৬৫ বছরের যাত্রায় এই বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সময়ে দেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রাবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয়দফা, ’৬৯-র গণআন্দোলন, ’৭০-র সাধারণ নির্বাচন, ’৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯০-ও স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রাবির শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্র-শিক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়েছে অত্যাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে। ষাটের দশকের শেষ দিকে এই ভূখ- যখন গণ-আন্দোলনে উত্তাল তখন রাবির শিক্ষার্থীরাও স্বাধিকার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে নিজের জীবনের বিনিময়ে ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে পাকবাহিনীর গুলিতে শহিদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। তাছাড়াও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ূমসহ অনেক ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারি।
প্রায় প্রায় ৩০৪ হেক্টর (৭৫৩ একর) জুড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৫টি উচ্চতর গবেষণা ইন্সটিটিউট, ৯টি অনুষদের অধীনে ৫৭টি বিভাগে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৭টি আবাসিক হল। এর মধ্যে ছাত্রদের জন্য ১১টি, ছাত্রীদের ৫টি হল এবং গবেষকদের জন্য রয়েছে ১টি ডরমিটরি। পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে রয়েছে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য আবাসিক ভবন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় রয়েছে দেশের প্রথম জাদুঘরখ্যাত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শহিদ মিনার, রয়েছে শিল্পী নিতুন কু-ের অমর কীর্তি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাশ বাংলাদেশ’। বিশ্ববিদ্যালয় শহিদ স্মৃতি সংগ্রহশালা নামক একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী সুউচ্চ মেটালিক টাওয়ার, বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য বিদ্যার্ঘ, ড. জোহার প্রতিকৃতি ও বিজয় সাগর।
বর্তমানে তিনটি সাংবাদিক সংগঠন (রাবি প্রেস ক্লাব, রাবিসাস ও রিপোটার্স ইউনিট) এবং ২২টি সক্রিয় সাংস্কৃতিক দল রয়েছে। এছাড়াও জাতিসংঘভিত্তিক বেশ কয়েকটি ক্যারিয়ারভিত্তিক সংগঠনসহ বিভিন্ন ধরনের ডিবেটিং ফোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে রাবি ক্যারিয়ার ক্লাব শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার সম্পর্কে সচেতন বা সহায়তা করতে কাজ করে যাচ্ছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়তায় রয়েছে রাবি হায়ার স্টাডি ক্লাব। এছাড়াও বিজ্ঞানচিন্তা বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে একটি বিজ্ঞান ক্লাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতায় ‘রাবি পাঠক ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে যেটি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
প্রায় ৪ লাখ দেশি-বিদেশি বই সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও ভবনগুলোতে রয়েছে ওয়াইফাই ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা। বর্তমান উপাচার্য ড. আব্দুস সোবহান পুনরায় নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ৩৫৬ কোটি টাকার একটি বড় বাজেট শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য দেশের অগ্রসরমান যাত্রায় তাল মিেিলয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখছেন। তবে এক্ষেত্রে শুধু এককভাবে উপাচার্য কিংবা উপ-উপাচার্য নয়, সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা, বিভেদ, দলাদলি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আমাদের সবারই জানা। এসব নেতিবাচক সংস্কৃতি সাধারণত শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে। নেতিবাচক সংস্কৃতি পরিহার করা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। চলমান সকল নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বিশ^বিদ্যালয়কে রক্ষা করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশ^বিদ্যালয় মুক্তচিন্তার জায়গা। কিন্তু মুক্তচিন্তাকে রোধ করার যেসব অপপ্রয়াস আমরা ইতিপূর্বে লক্ষ করেছি তা রোধ করতে হবে। অনেকক্ষেত্রে শিক্ষকরা সামাজিক গণমাধ্যমে সত্য ঘটনা উল্লেখ করায় সদ্য বিদায়ী প্রশাসন কর্তৃক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি মামলার শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ। কারণে, অকারণে অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এসবের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার পরিবেশ অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আশা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুক্তচিন্তার পরিবেশকে যথাযথভাবে সমুন্নত রাখা যাবে।
বিভিন্ন কারণেই বর্তমান উপাচার্যের কাছে সকলের প্রত্যাশার পরিমাণ একটু বেশি। যদিও ইতোমধ্যেই নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমি দায়িত্ব পেয়েছি সেবা করার জন্য, ক্ষমতা দেখানোর জন্য নয়। অন্যায্যভাবে কাউকে চাকরিচ্যুত করতে আসিনি।’ এমনকি তিনি আরো বলেছিলেন, ‘কেউ যদি কোনো ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তবে তার ন্যায্যতা ফিরিয়ে দিতে চাই।’ তার এই ইতিবাচক এবং উদার মানসিকতা প্রকাশে মুক্তচিন্তার দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কাজেই মোটা দাগে একটি কথা বলতে চাই যে, পারস্পরিক কুৎসা রটনা কিংবা বিরোধিতামূলক ষড়যন্ত্র থেকে বিশ^বিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার বিকল্প নেই। অবশ্য বর্তমান উপাচার্যের এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়। গত ৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আয়োজনে ঈদ পুনর্মিলনি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষককে যেকোনো সমস্যা নিয়ে সরাসরি তাঁর সাথে দেখা করে কথা বলার আহ্বান জানান। এমনিক এক্ষেত্রে অন্য কোনো ব্যক্তিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। এক্ষেত্রে আমরা আশা করবো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তির এই বক্তব্যটি যেন প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবায়িত হয় এবং সকল রেষারেষি ও ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটে গুণগত শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু খ্যাতিমান প-িত, গবেষক ও জ্ঞানতাপসের ছোঁয়া রয়েছে। বহুভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ভাষা বিজ্ঞানী ড. এনামুল হক, প্রখ্যাত তাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডেভিড কফ, বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বিখ্যাত নৃ-বিজ্ঞানী পিটার বার্টচী, প্রফেসর ড. এমএ বারীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে যারা দেশ পরিচালনা করছেন তাদের অনেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এখনও রাবিতে অনেক বরেণ্য প-িত শিক্ষক রয়েছেন।
শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ, গবেষণার সুনাম, প্রভাব, অভিনবত্ব ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের ক্ষেত্রে রাবি যথেষ্ট এগিয়ে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানাবিধ প্রকল্প কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাবি নানাবিধ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের গবেষণার মান ও অভিনবত্ব সৃষ্টিতে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই বিশ^বিদ্যালয়ে নানা সম্ভাবনার সুযোগ থাকলেও সংকটও রয়েছে অনেক। মূলত শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যাই সবচেয়ে প্রকট। এখনো প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্যাম্পাসের বাইরে। এছাড়াও শ্রেণিকক্ষ ও পরিবহণ সংকটও রয়েছে প্রকট।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ৬৪ বছর অতিক্রম করে ৬৫ বছরে পা রাখলো। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী রাবি তার শৈশব, কৈশর, যৌবন পার করেছে শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, খেলাধুলা প্রতিটি ক্ষেত্রে অসামান্য সফলতা অর্জন করে। আমাদের প্রত্যাশা দিন দিন এই সফলতা অনেক গুণে বেড়ে যাবে, এগিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী। আমাদের বিশ্বাস রাবি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেএকটি উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]