৬৫% মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবই নিষ্ক্রিয়

আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০১৮, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে মোবাইল ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার। এসব ব্যাংক হিসাবের ৬৫ শতাংশই এখন নিষ্ক্রিয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সক্রিয় মোবাইল ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ৩১ হাজারে নেমে এসেছে। অথচ গত বছরের সেপ্টেম্বরেও সক্রিয় মোবাইল ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩ কোটির ওপরে।
সক্রিয় হিসাব কমার ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনকৃত টাকার পরিমাণও কমেছে। গত বছরের জুনে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে শুধু একটি ব্যাংক হিসাব চালুর বাধ্যবাধকতা চালু, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ হুন্ডি তৎপরতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপসহ লেনদেনের ওপর নানা বিধি-নিষেধের ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেয়েছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বেশ তৎপরতা চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় কমপ্লায়েন্স আসছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বণিক বার্তাকে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে ডিজিটাল হুন্ডির ব্যাপকতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। এর ফলে প্রবাসী আয়ে দেশ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতায় কয়েক মাস ধরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন কমেছে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা কমপ্লায়েন্স হচ্ছে। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত ব্যবহারকারীরাই সক্রিয় আছে, ভুঁইফোড়রা ঝরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে মোট ১৮টি ব্যাংক। তবে এর মধ্যে বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে মোবাইল ব্যাংক গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার। ওই সময় সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৩ কোটির বেশি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে মোবাইল ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার। সে হিসাবে গত পাঁচ মাসে গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে ১৯ লাখ ১৫ হাজার। কিন্তু ফেব্রুয়ারি শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সক্রিয় হিসাব সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ৩১ হাজারে নেমে এসেছে। সে হিসাবে সক্রিয় ব্যাংক হিসাব সংখ্যা কমেছে প্রায় ১ কোটি।
শুধু সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যাই নয়, এ সময়ে মোট লেনদেন থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সের অর্থ স্থানান্তর, নগদ টাকা উত্তোলন ও জমা, বেতন-ভাতা প্রদান, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারও কমেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মোট লেনদেন হয়েছে ২৮ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। তবে এ সময়ে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মতো। ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা। এ সময়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মোট এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৪।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, আগের মাসের তুলনায় ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। এ সময়ে ক্যাশ ইন ট্রানজেকশন বা নগদ টাকা জমা হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা জানুয়ারির তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কম। ক্যাশ আউট ট্রানজেকশন বা নগদ টাকা উত্তোলনও ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে ফেব্রুয়ারিতে।
ফেব্রুয়ারিতে পিটুপি ট্রানজেকশন বা ব্যক্তিগত গ্রাহক থেকে অন্য গ্রাহকের হিসাবে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৪২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ওই মাসে বেতন পরিশোধ বাবদ লেনদেন হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আগের মাস জানুয়ারিতে হয়েছিল ৪৭৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে এ সেবা কমেছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১৮৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার। জানুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নগদ আর্থিক লেনদেন হয়েছে ১৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে এসে এ লেনদেন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশের মতো। তবে ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে লেনদেন কমেছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নগদ লেনদেনে। ওই মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করা হয়েছে ৭৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আগের মাসের তুলনায় ৩০ দশমিক ৮ শতাংশের মতো লেনদেন কমেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো হিসাব থেকে টানা তিন মাস কোনো ধরনের লেনদেন না হলে তা ইন-অ্যাক্টিভ বা নিষ্ক্রিয় হিসাব বলে বিবেচিত হয়। আর তিন মাসের মধ্যে একটি লেনদেন হলেই তা সক্রিয় হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য বড় কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে হিসাব বন্ধ করে না ব্যাংক। কিন্তু সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় অপব্যবহার ঠেকাতে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে হিসাব খোলা ও পরিচালনা এবং লেনদেনে আরো বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, এখন একজন ব্যক্তি একটি সিম দিয়ে যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একটি মাত্র হিসাব চালু রাখতে পারবেন। ওই নির্দেশনার পর যাদের একাধিক হিসাব ছিল, তা বন্ধ করা হয়। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

Don`t copy text!