৯৫ ভাগ শিশুই নিকোটিনের বিষক্রিয়ায় ধুমপানের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ চাই

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৮, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ৯৫ ভাগ শিশুই নিকোটিনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। এই ভয়াবহ তথ্যটি উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ এবং লিডস সিটি কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য বিভাগের যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায়। রোববার দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর মিরপুরের ৬টি এবং সাভারের ৬টি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে চালানো হয় এ গবেষণা। তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ছিল ১১-১৩।
৪৭৯ শিশুর লালা সংগ্রহ করে যুক্তরাজ্যের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ৪৫৩ জনের লালাতে নিকোটিন পাওয়া গেছে। গবেষণায় ৪৩ ভাগ শিশু জানিয়েছে, তার পরিবারে কমপক্ষে একজন ধূমপান করে। আর ৮৭ ভাগ শিশুই জনপরিসরে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার।
এই পরিস্থিতি শুধু ঢাকা বা ঢাকার আশপাশের এলাকারই নয়Ñ এটি সারা বাংলাদেশরই চিত্র হবে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক যে, ধূমপায়ী শুধু নিজের ক্ষতি করছে না। বরং তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাশের জনও।
পরিসংখ্যান বলছে, ধুমপানের কারণে একটি দেশের জিডিপি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে প্রতি দশ জনের মধ্যে এক জনের মৃত্যুর কারণ ধূমপান। বাংলাদেশে বর্তমানে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটির বেশি। প্রতিবছর তামাক ব্যবহারজনিত ৮টি প্রধান রোগে ১২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এই রোগিদের মাত্র ২৫ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ধরে হিসাব করলে বছরে দেশের অর্থনীতিতে ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অন্যদিকে তামাক খাতে বছরে সরকারের আয় হয় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেট থেকেই মাদকের নেশা শুরু হয় এবং মাদকাসক্তদের ৯০ শতাংশই ধূমপায়ী।
সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ট্যোবাকো কন্ট্রোলে (এফসিটিসি) স্বাক্ষর করে ও ২০০৪ সালে অনুস্বাক্ষর করে। এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সরকার ২০০৫ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ এবং ২০০৬ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করে। এছাড়া ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ থেকে সবরকম তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের উভয় পাশে ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাধ্যতামূলকভাবে মুদ্রণ করা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী মোবাইল কোর্টে সাধারণত পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান; তামাক কোম্পানিগুলোর বেআইনি প্রচারণা, প্রণোদনা ও বিজ্ঞাপন; আঠারো বছরের নিচে কারো কাছে বা কারো দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি প্রভৃতি আইন লঙ্ঘনে জরিমানা এবং ক্ষেত্র বিশেষে কারাদ-ের বিধানও রয়েছে।
কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সর্বত্র অবাধে ধুমপানের দৃশ্য দেখে মনে হয় না যে দেশে ধুমপান নিরোধে আইন আছে। অর্থাৎ আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। ফলে নির্বিঘেœ প্রকাশ্যেই জনসমাগম স্থানে ধুমপান অব্যাহত আছে। ২০০৬ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়নের পর রাজশাহীতে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হত। কিন্তু এখন আর তেমনটি হয় না। ফলে ধুমপান ফ্রি স্টাইলে চলে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার কথা থাকলেও তা একেবারে অনিয়মিত হয়ে গেছে। ধুমপায়ীদের মোটেও ভ্রাম্যমান আদালতের সম্মুখিন হতে হয় না। প্রকাশ্যে ধুমপানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পারিচালিত হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবেÑ অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ