BAHAMONI সাঁওতালী ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ

আপডেট: মার্চ ৩, ২০১৯, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু


২০১৯ খ্রিস্টাব্দের একুশে বইমেলায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হলো সাঁওতালী বর্ণমালায় কাব্যগ্রন্থ ইঅঐঅগঙঘও (বাহামনি)। ইতোপূর্বে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী নিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক বই-পুস্তক প্রকাশিত হলেও এটিই বাংলার ভূখ-ে প্রথম কোনো স্বীকৃত প্রকাশক থেকে সাঁওতালী বর্ণমালার বই। প্রকাশক ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ এই অসাধারণ সাহস দেখিয়েছে কর্ণধার মনজুর খান চৌধুরী। সাঁওতালী কবি সামিয়েল মার্ডীর সাঁওতাল ভাষার প্রতি আকাক্সক্ষা, ইচ্ছা ও নতুনকে উপস্থাপন করার যে প্রচেষ্টা সেটি অবশ্যই ধন্যবাদযোগ্য। বাংলা ভাষার ভীড়ে সাঁওতালী ভাষার পথযাত্রা ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করেছে। সাঁওতাল লেখক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু বলেছেন, ‘সাঁওতালী বর্ণমালায় কাব্যপুস্তক প্রকাশনা জাতির কাছে ইতিহাস হয়ে থাকবে। একুশে বইমেলার ইতিহাসেও এটি একটি উজ্জ্বলতম ঘটনা। আমি মনে করি, কবি সামিয়েল মার্ডী নতুন প্রজন্ম ও সাঁওতালী ভাষার রুদ্ধ পথের দ্বার উন্মোচন করেছেন। আমরা ভাষা প্রেমিকদেরকে আরো বেশি বেশি নিজস্ব ভাষার ব্যবহার, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও পাঠকপ্রিয়তার জন্য সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। কবিকে সাঁওতাল লেখক ফোরাম থেকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।
আদিবাসী সাঁওতালদের বর্ণমালা সম্পর্কে লোকগাঁথায় রয়েছে, ঙষ শযড়হ ফড় ঃযঁঃরমব ংড়ৎড়ংধ অর্থাৎ লেখা থেকে শ্রুতিই শ্রেষ্ঠ। আর সাঁওতালদের একটি গানে পাওয়া যায় লিপি বা অক্ষর প্রসঙ্গেÑ

Murmu thakur ko do baba

Puthi babako parhaoka

Badoli koyeda garte likhon calakkan.

ভাবার্থÑ মুরমু ঠাকুররা পুঁথি পড়ে
বাদোলী কঁয়েদা গাড়ে (দূর্গে) লেখন যায়।’
ছড়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রয়েছি কিন্তু কবিতা আমাদের জীবনে অপরিহার্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। গান, কবিতা, ছড়া, লোকগাঁথার মধ্যেই সাঁওতালদের জীবন লুকায়িত; আবিষ্কার, উন্মোচন কিংবা উদ্ভাসিত করতে দরকার সাহসী পদক্ষেপ, যতœশীল পরিচর্যা ও নিখুঁত ভালোবাসা। কবি সামিয়েল মার্ডী অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমার সম্মুখে আমি যা কিছুই অবলোকন করেছি, সেসব নিয়েই লেখার চেষ্টা করেছি। সমাজের চিত্রগুলোকে কবিতার ভাষায় ছন্দে ছন্দে জাতির কাছে তুলে ধরার চেষ্টা আমাকে উৎসাহিত করেছে। সাঁওতালী বর্ণমালাতে সাঁওতালী ভাষার পাশাপাশি ভাবার্থ বঙ্গানুবাদের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। যাতে করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাঠকগণও কবিতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারে।’ পেশাগতভাবে কবি একজন প্রকৌশলী। প্রকৌশলী সামিয়েল মাডি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ অক্টোবর দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার ঈশানপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মি. ভরত মার্ডি, ঈশ^রগ্রাম আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ছিলেন। মাতা- স্বর্গীয় মায়ন টুডু। চার ভাইবোনের মধ্যে কবি জেষ্ঠ সন্তান। কবি ঈশানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি নিয়ে পঞ্চম শ্রেণি এবং ঈশানপুর এস.সি. দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি’ তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে। পরবর্তীতে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে তাঁর আগ্রহ। ছোটবেলা থেকেই আদিবাসী সমাজ, ভাষা, সাহিত্য, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা শুরু। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন কল্পনা বিলাসী হৃদয়হরণ করে নেয়Ñসাঁওতালী কথামালা; শুরু হয় তার সাঁওতালী কবিতা লেখা। কবি নিজ উদ্যোগে সাঁওতালী ম্যাগাজিন ‘এভেন’ প্রকাশ করতেন। তৎকালীন ৫২ জেলার আদিবাসী গাঁওতা (১৯৪৭ আগে পরে) নিয়ে কলকাতা হতে প্রকাশিত পত্রিকা ‘হড় গেজেট’ পুনরায় চালু করেছিলেন। তাছাড়া কবির কবিতা ‘সান্তাল স্টুডেন্টস্ ইউনিয়ন’ (সাসু) কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা ‘সান্দেশ’ এবং রাজশাহী হতে ‘তাবিথা সংবাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পারিবারিক জীবনে একমাত্র কন্যা আরাধ্য অর্ন্য মার্ডি, স্ত্রী গোলাপী বাস্কে রোজিকে নিয়ে সুখের সংসার।
ইঅঐঅগঙঘও (বাহামনি)-র মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছি, ‘সাঁওতালী বর্ণমালাতে কবিতা চর্চা এবং কবিতার বই প্রকাশনা আমাকে মোহিত ও চমৎকৃত করেছে। আমি এতোই আশ্চর্য হয়েছি যে, বাংলা ভাষার ভীড়ে সাঁওতালী বর্ণমালায় সাঁওতালী কবিতাগ্রন্থের আত্মপ্রকাশ দুঃসাহসিক অভিযাত্রার সাদৃশ্য। সাঁওতালী বর্ণমালাতে নিয়মিতভাবে কবিতা যে চর্চা হতে পারে, সেটির একটি উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত এই ইঅঐঅগঙঘও (বাহামনি) কবিতা সমগ্র। বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, ধারণা কিংবা বিশ^াসগত যে দৈন্যতা রয়েছে; সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সামিয়েল মার্ডী সেটি প্রমাণে সামর্থ হয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ও মমতার বহিঃপ্রকাশে হৃদয়ের ঐশ^র্য্যতা, বিশালতা আবশ্যিক হয়ে পড়ে। সাঁওতালী ভাষার সমৃদ্ধতা, ঋদ্ধতাকে যুগোপযোগী করে কৌশলী হয়ে উপস্থাপন ভাষাকে নতুনভাবে আলিঙ্গন ও আস্বাদন করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা সাঁওতালী বর্ণমালায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত গুটি কয়েক কবিতা অজস্রবার পড়েছি; আমাদের কবিতার মধ্যে যে সাহিত্য, রসবোধ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, প্রকৃতিকে আবিষ্কার করা সত্যিই নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। বোধ করি, বাংলার ভূখ-ে এটিই প্রথম উদ্যোগ যা সাঁওতালী বর্ণমালায় কবিতার মশাল উচ্চীকৃত হয়েছে; এটির পথ ধরেই আগামীর কবিরা পথ খুঁজে পাবে। কবিতার স্বাদ বাংলা ভাষাভাষীদেরকে বিভাজনে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বঙ্গানুবাদে, সঠিক শব্দভা-ার, প্রায়োগিক দিক এবং পরিস্থিতি উপস্থাপন দূরূহ কাজ; এই চ্যালেঞ্জও আমাদেরকে পরিপূর্ণ হতে সাহায্য করেছে। এই যে উদ্যোগ, আকাক্সক্ষা, অদম্যতা আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে সাহসী করে তোলে। বিলুপ্ত ভাষা তালিকায় সাঁওতালী ভাষাও রয়েছে। ভাষার ক্রান্তিলগ্নে সাঁওতালী বর্ণমালায় কবিতা চর্চা, প্রকাশ ও পাঠকের আগ্রহ জন্মানোর দৌড়ে অবতীর্ণ হওয়া প্রশংসার দাবিদার। এছাড়াও বাংলার ভূখ-ে ভাষার বর্ণমালাকে নিয়ে যে বিতর্ক ও বিভ্রান্ত, চক্রান্ত ও চৌর্যবৃত্তি চলমান রয়েছে, এটি তাদেরকে লজ্জ্বিত করবে বৈকি!…সামিয়েল মার্ডি সময়ের কবি। এই উত্থান-পতনের মধ্যে থেকেই ফিনিস পাখির মতো বেরিয়ে এসেছেন। সাহিত্য চর্চার প্রতিকূলতা ও পারিপাশির্^কতা প্রতিভার উদ্ভাসিত হওয়াকে ঠেকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’
সাঁওতালী ভাষার সাঁওতালী বর্ণমালায় ইঅঐঅগঙঘও (বাহামনি)-এর পথচলা সুগম হোক। ইঅঐঅগঙঘও (বাহামনি) বেঁচে থাকুক অজস্র দিন, এই কামনা করি।