অং সান সু চি সমীপে

আপডেট: ডিসেম্বর ২২, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


একজন বিপ্লবী আপোষহীন নেত্রী অং সান সু চি। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব সর্বজনবিদিত। যে জন্য তাকে বার বার কারাবরণ করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে নানা পীড়ন ও নির্যাতন। তাঁর মুক্তির দাবিতে তাঁর নিজ দেশই নয়- বাংলাদেশ সহ বিশ্বের নানা দেশে পালিত হয়েছে অনেক কর্মসূচি। অবশেষে তিনি মুক্তি পেয়েছেন কারাজীবন থেকে, নির্বাচিত হয়েছেন সে দেশের সরকার প্রধান। মানুষ ভরসা পেলো আস্থাভাজন এ মানুষটির নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে নির্বিঘেœ এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সে ভরসা আজ যে শুধু মরীচিকা তার প্রমাণ সাম্প্রতিক সহিংস আচরণ নিরীহ দেশবাসীর প্রতি।
একজন রাষ্ট্র প্রধানের অন্যতম দায়িত্ব সে রাষ্ট্রের সর্ব নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করা। বিশ্ববাসীর বিশ্বাস সূ চি-র নেতৃত্বে সে দেশের জনগণ ভালো থাকবে, নিরাপদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে ভাবনা যে ভুল তা প্রমাণিতসত্য। কারণ এখন বার্মায় যে সহিংসতা, নির্মম অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ ও লুটপাট চলছে তা হচ্ছে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠে তাহলে সু-চি-র কি নিয়ন্ত্রণ নেই নিরাপত্তা বাহিনীর উপর? নাকি এ ধ্বংসযজ্ঞে তাঁর সায় আছে?
যদি ধরে নেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই তাহলে স্বেচ্ছায় তাঁকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। আর যদি তাঁর সায় থেকে থাকে তাহলে সম্পূর্ণভাবে সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। এখন তাঁর নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে-নিশ্চয়ই এটা তাঁর জন্য মোটেই কাম্য নয়। যে সু চি মানবতার মুক্তির জন্য সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন, আন্দোলন, সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় যে সূ চি জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন সেই তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন এ জিজ্ঞাসা সকলের।
তাঁর দেশের মানুষ এখন উদ্বাস্তু। দলে দলে মানুষ উখিয়া, টেকনাফ ও নাইখংছড়ি সীমানা দিয়ে দলে দলে  মানুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। বাংলাদেশ সরকার সাধ্যমতো সাহায্য করছে তাদের আশ্রয় দেবার শরণার্থীরা কক্সবাজারেও আশ্রয় নিচ্ছে ধীরে ধীরে।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য চলতি মাসের প্রথম দিকে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা নিধন শুরু করে। কী তাদের অপরাধ জানি না। তারা ওই ভূ-খ-ের অধিবাসী। সুতরাং সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার তাদের আছে। এমতাবস্থায় তাদের উপর করা বর্বরোচিত আচরণ শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয় অন্যায়ও বটে। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেখানে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে নির্বিচারে মানুষ খুন করা হচ্ছে, লুটপাট করা হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণ। এ কোন স্বৈরতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক দেশের ঘটনা নয়, ঘটনাটি ঘটছে শান্তিতে “নোবেল” পুরস্কার প্রাপ্ত নেত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং অং সান সু চির দেশে।
সু চি নিজে সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বন্দিত্ব ও নানা নিপীড়নের ভেতর দিয়ে। সেই তিনি নির্যাতনে মদদ দিচেছন তার নিরীহ জনগণকে। এটা বেমানান। যিনি তার নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে পারেন না তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার অধিকার রাখেন না। শুধু তা-ই নয় “নোবেল”-এর মত একটা পুরস্কারের অবমাননা করতে পারেন না। নোবেল তা আবার “শান্তিতে”। চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে তাঁর হুঁশিয়ারি বা সতর্কবাণী আমরা অন্ততঃ গণমাধ্যমে এখনও শুনিনি।
উদ্বাস্তু, নির্যাতিত, স্বজনহারা, সম্ভ্রমহারা অসংখ্য মানুষের দুর্দশার করুণ কাহিনী কি তিনি ওয়াকিবহাল নন? না হলে তাঁকে অনতিবিলম্বে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এ সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ। পুরো বিশ্ব মিয়ানমারের ঘটনায় হতবিহ্বল। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের ভাবান্তর নেই। যদি এমনও হয় যে এবিশেষ গোষ্ঠী তাঁর বা তাঁর কর্মকা-ের বিরোধিতা করেছে বা সরকার উৎখাতের চেষ্টা করছে তাহলেও তাদের বড়জোর আইনের আশ্রয়ে আনা যায় কিন্তু নির্বিচারে-তাদের উপর নির্যাতন করা যায় না। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সেটাই চরম-সত্যি। এ ন্যক্কারজনক ঘটনার ভেতর দিয়ে তিনি অগণতান্ত্রিক ও পৈশাচিক কর্মকা- পরিচালনা করছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন, দেশের শান্তি ও ঐক্য ব্যাহত করছেন এবং একই সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে এক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির ভেতরে ফেলছেন। তাঁর কাছে তাঁর নাগরিকরা নিরাপদ নয়। আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য তারা আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ যথাসাধ্য সাহায্য করছেন অসহায় এসব মানুষকে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আশ্রয়ের আশ্বাস দেওয়া হলেও সরকারের সামর্থেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
মাননীয়া অং সান সু চিকে তার জনগণের প্রতি সুবিচার করার আহ্বান জানাই। অবিলম্বে আপনার সামরিক বাহিনীকে নিরস্ত্র হতে আদেশ দিন। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্রতী হোন। এ অরাজকতা যদি অচিরে বন্ধ করা না যায় তাহলে পুরো দেশই আক্রান্ত হবে। তখন সেটা নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হবে।
কোন স্বৈরাচার বা স্বেচ্ছাচারকে প্রশ্রয় না দিয়ে জনস্বার্থকে বিবেচনায় আনুন, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন, জনগণের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা বন্ধ করুন। বিশ্বমাতার সন্তানদের কোলে তুলে নিয়ে আশ্রয় দিয়ে তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করুন। তবেই স্বার্থক হবে আপনার সুদীর্ঘ সংগ্রামী জীবন।