অখ- নজরুল সত্তা কি হারিয়ে যাবে

আপডেট: মে ২৫, ২০২২, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


কবি কাজি নজরুল ইসলামের পাঁচ বছরের অনুজ যথার্থ ‘পদ্মশ্রী’ পদকপ্রাপ্ত কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর অগ্রজ কবির মানস পরিক্রমায় যে তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, আমার সীমিত জানার মধ্যে সেটি সর্বসেরা। রবীন্দ্রধারা থেকে স্বতন্ত্র পথের সন্ধানী প্রেমেন্দ্রমিত্র বলেছিলেন, ‘বজ্র বিদ্যুৎ ফুল এই তিনে নজরুল।’

সত্যিকথা বলতে কী মহাবিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে আগন্তুক নজরুল বলেছিলেন: ‘আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/এই ¯্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ বিপ্লবের চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন দেখিয়ে নজরুলকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে ব্যধিগ্রস্ত মূক হয়ে জীবননাট্যের রঙ্গশালা থেকে। তবে তাঁর স্বপ্ন বিলুপ্ত হয়নি, হয়নি বাসি।

নজরুল এমন এক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন, যেখানে সাধারণভাবে জীবন ধারণ ছিলো কঠিন। অথচ তিনি বিশ শতকের দুটি দশক দাপটের সাথে মানুষের মুক্তি আর মিলনের বাণী সগৌরবে পরিবেশন করে গেছেন। শনিবারের চিঠিসহ অন্যান্য ধারেভারে পরিচিত ব্যক্তিবর্গ, নিজেদের শিক্ষা ও প্রতিভা সম্পর্কে যাঁরা উন্নসিক, তাঁরা ঈর্ষা পরায়ণ হয়ে বলা শুরু করলেন:

‘বসন্ত দিল রবি, তাই হয়েছ কবি।’ এঁরা জীবদ্দশায় বিস্মৃত হয়েছেন অনেকে কবিতা অঙ্গন থেকে। নজরুলের বজ্র বিদ্যুৎ আর ফুলের সমাহারে সমাজ হিতৈষণার নতুন ধারা প্রত্যক্ষ করে পরিজনদের বাইরে গুটি কয়েকের মধ্যে নজরুলকে ‘বসন্ত’ নাটিকা উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সকৃতজ্ঞ নজরুল হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধার্ঘ জানাতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘দেখেছিলো যারা মোর রুদ্ররূপ, অশান্ত রোদনে সেথা দেখেছিলে তুমি, হে তাপস, বহ্নিদগ্ধ মোর বুকে তাই দিয়েছিলে বসন্তের পুষ্পিত মালিকা।’ মানব নির্ভর নজরুলের কবিত্বের প্রতি মহাকাল প্রসন্ন ছিলো বলে কালান্তর ধরে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বিলুপ্ত হবেনা কদাপি, অতিভোগের লোভ সংবরণ করবে না কেউ। তাদের বিরুদ্ধে বজ্রবিদ্যুতের মতো কথামালায় ‘আঁধারে অগ্নিসেতু’ বাঁধার সাহস জোগাবেন নজরুল, তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৪২ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ)। নজরুলের তখন মননের সক্ষমতা প্রায় অবলুপ্ত।

বঙ্গবন্ধু ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে তখনকার রাজনীতির কর্ণধারদের নজরুলের প্রতি ঔদাসীন্য লক্ষ্য করেছেন। তিনি প্রতিকার করতে পারেন নি। (বাংলাদেশ সৃষ্টি করে তাঁকে বঙ্গবন্ধু সাদরে এনে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছিলেন)। সাধের পাকিস্তান হাসিল হলো সাম্প্রদায়িকতার মানববিদ্বেষী চেতনার ভিত্তিতে। তখনকার অধিকাংশ নেতা বিষয়টি আমলে আনেনি। তাছাড়া উগ্রধর্মবাদী একটি গোষ্ঠীতো নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বরদাস্ত করতো না।

তাদের পদাঙ্ক অনুসারীরা এখনো করে না। তবে আড়ম্বর কম দেখায় না। সে আড়ম্বর আধামূর্খামি। তাদের বক্তব্য নজরুল যখন নির্ভীক চিত্তে ‘উন্নত মম শির’ বলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ মাথা নত করেছেন। নজরুলের কৈশোর উত্তীর্ণ হবার আগে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির সেই বিখ্যাত কবিতাটি রচিত। তাছাড়া পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন।

এই জ্ঞান পাপিরা সাধারণ সরল মানুষকে প্রতারিত করতে নজরুলকে জাতিধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের শ্রদ্ধার আসন থেকে সাম্প্রদায়িকতার চৌকাঠে বন্দি করেছে। এটা নজরুল মানসের ওপর সাম্প্রদায়িক ক্ষমতার ব্যাভিচার। কেনা জানে, অবৈধ ক্ষমতাই মানুষকে স্বৈরাচারী এবং সাম্প্রদায়িক করে তোলে।

নজরুল কবিতা অপেক্ষা গান রচনা করেছেন বেশি। কবিতা ও গানে একটা সূক্ষè পার্থক্য আছে। সব গানই কবিতা, তবে সব কবিতা গান নয়। যাইহোক নজরুলের কবিতার গ্রন্থগুলো যথাসময়ে গ্রন্থিত বলে আমাদের কাছে সে সবের অস্তিত্ব টিকে আছে। গানগুলো তেমন ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। সেই লেটোর দলে থাকার সময়ের গানগুলোর একটা বড়ো অংশ অনাদরে অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সংগীত রচনা ও সুরারোপের চরম উৎকর্ষের দিনের সৃষ্টিগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কিছু গান বিলুপ্তির পথে।

অন্নদাশঙ্কর রায় ‘ভাগ হয় নাই নজরুল’ বলে শ্লাঘা অনুভব করেছিলেন। এ সত্য মানতেই হবে নজরুলের মানব সম্পর্কিত সত্তা বিভাজিত হয়নি। তিনি মানুষ আর মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আমরা কিছু মতলববাজ নজরুল সমর্থক নিজেদের স্বার্থে তাঁকে ভাগ করেছি। এখান থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

মানুষ যেসব উপাদানে সৃষ্টি তাতে হিংসা-দ্বেষ বৈষম্যের সাথে প্রেম ভালোবাসা বিলুপ্ত হবেনা। নজরুলের বজ্রসম বাণী মানববিদ্বেষী আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ‘মোল্লা-পুরুত’ এবং তার সুবিধাভোগীদের প্রতিহত করতে এগিয়ে আসবে। সৃষ্টির মূল হলো প্রেম। নজরুলের প্রেমের কবিতা ও গানে সরাসরি আবেদন লক্ষণীয়। পাঠক নিজের ইচ্ছায় নতুন নতুন অর্থ করতে পারেনা।

আমরা নজরুলকে স্মরণ করি এবং তাঁর মানবিকতার বাণীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। দুখের বিষয় এটিও ক্ষমতানির্ভর হয়ে গেছে। আমরা ক্ষমতাকে বড়ো করে দেখি, মানবমুখী জীবন্ত প্রতিভার কদর করিনা। নজরুল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব ‘মিথের’ সমান মর্যাদা দিয়েছেন। শতবর্ষেরও আগে কবিজীবনের প্রায় সূচনালগ্নে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আসামান্য আধারে পরিবেশন করে কেবল আমিত্ব নয়, যুগযুগান্তরের মানব বিশ্বাসকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। আমরা তাঁর অবদানকে খণ্ডিত করে চলেছি।

অন্নদাশঙ্কর রায় আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, ‘ভাগ হয় নাই নজরুল’। বাস্তবে তা নেই। আমরা সকলক্ষেত্রে তাঁকে সব-বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখতে চাই অখ- হিসেবে। সাম্প্রায়িকতার দৃষ্টিতে নয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক রাজশাহী কলেজ