অধিকাংশ হাটেই টাঙানো হয়নি খাজনার তালিকা || নওগাঁয় পশুর হাটে ইচ্ছেমতো হাসিল আদায়

আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০১৭, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

এম আর রকি ,নওগাঁ


নওগাঁর পশুর হাটগুলোতে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত হাসিল (খাজনা) আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। শুধু ক্রেতার কাছ থেকে হাসিল আদায়ের নিয়ম থাকলেও বিক্রেতার কাছ থেকেও হাসিল আদায় করা হচ্ছে। প্রশাসনের নির্দেশ থাকা সত্তেও অধিকাংশ হাটেই টাঙানো হয়নি খাজনার তালিকা।
গতকাল মঙ্গলবার নওগাঁ জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নওগাঁ জেলা কমিটির পক্ষ থেকে পশুর হাটে অতিরিক্ত টোল (খাজনা) আদায় বন্ধের দাবি জানানো হয়। এতে বক্তব্য দেন সিপিবি জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাড. মহসিন রেজা, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, সদস্য মমিনুল হক স্বপন, মান্দা উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান, সদস্য সেকেন্দার আলী, আফাজ উদ্দিন মুিন্স। উপস্থিত ছিলেন জেলা যুব ইউনিয়ন ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ।
গত ২৩ আগস্ট থেকে গত সোমবার পর্যন্ত জেলার বেশ কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে জানা যায়, অধিকাংশ পশুর হাটে হাসিল আদায়-সংক্রান্ত কোনো নিয়মাবলী কিংবা তালিকা টাঙানো নেই। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই সরকার নির্ধারিত হাসিলের রেট সম্পর্কে অন্ধকারে থাকছেন। এই সুযোগে তাদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো হাসিল আদায় করছেন ইজাদারেরা। তারা জেলা প্রশাসনের নীতিমালার ধার ধারছেন না। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি গরুর জন্য ৩০০ টাকা ইজারা দেওয়ার কথা। প্রতি গরু ৪২০ টাকা থেকে ৫২০ টাকা হাসিল আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ গরু-প্রতি অতিরিক্ত ১২০ থেকে ২২০ টাকা হাসিল আদায় করা হচ্ছে। খাসি-ভেড়াপ্রতি ১৫০ টাকা হাসিল নির্ধারণ করা থাকলেও প্রতি খাসি কেনার জন্য শতকরা ১০ টাকা হারে হাসিল আদায়ের নিয়ম চালু করেছেন ইজারাদারেরা। অর্থাৎ ১০ হাজার টাকার একটি খাসি কিনলে ইজারা দিতে হবে ১ হাজার টাকা। শুধু ক্রেতার কাছ থেকে হাসিল নেওয়ার নিয়ম। কিন্তু হাটে ইজারাদারদের লোকজন বিক্রেতার কাছ থেকেও টাকা আদায় করছিলেন।
গত শুক্রবার (২৫ আগস্ট) মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে দেখা যায়, বিভিন্ন ‘ফান্ডের’ কথা বলে ক্রেতা-উভয়ের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন ইজারাদারের লোকজন।
মান্দার ভাঁরশো গ্রামের মো. লবিন ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেন। গরুর হাসিল বাবদ তার কাছ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। হাসিল আদায়ের রশিদে অনেক তথ্য ঠিকঠাক থাকলেও হাসিলের ঘরে টাকার পরিমাণ লেখা নেই। বিক্রেতা হাবিবুর রহমান জানান, হাটের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ঈদ সেলামির নামে তার কাছ থেকে ২০ টাকা আদায় করেছে।
ওই হাটে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় একটি খাসি কিনেন নওগাঁ সদর উপজেলার বলিহার গ্রামের ইয়াছিন হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি খাসিপ্রতি ১৫০ টাকা হাসিল দিতে হয়। কিন্তু ইজারাদারের লোকজন শতকরা ১০ টাকা হারে হাসিল আদায় করছেন। ৬ হাজার ৬০০ টাকায় খাসি কেনায় শতকরা ১০ টাকা হারে ৬৬০ টাকা হাসিল দিতে হলো। এটা খুবই অমানবিক।’
চৌবাড়িয়া হাটের ইজারাদার ফজলে আজিম মুঠোফোনে বলেন, হাটটি ৪২০ কোটি টাকায় ইজারা নেওয়া হয়েছে। সারাবছর তেমন পশু কেনাবেচা নেই। তাই কোরবানির সময় সরকার নির্ধারিত রেটের চেয়ে একটু বেশি খাজনা নেওয়া হচ্ছে। এরপরেও পুরো টাকা উঠবে কিনা সন্দেহ। আর হাট বুঝে পাওয়ার পরই খাজনার তালিকা টাঙানো হয়েছিল। মাস খানেক আগে সেগুলো খুলে পড়েছে। খাজনার তালিকা টাঙানোর জন্য আবারও সাইনবোর্ড বানাতে দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই সেগুলো হাটে টানিয়ে দেওয়া হবে।
চৌবাড়িয়া হাটে পশু কেনাবেচায় অতিরিক্ত টোল (খাজনা) আদায় ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি নামের একটি সংগঠন গত ৭ মে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে চৌবাড়িয়া হাটে অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধে লিখিত আবেদন জানান। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় নি।
চৌবাড়িয়া হাটের অতিরিক্ত টোল আদায় ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক সরদার ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘চৌবাড়িয়া হাটে অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধের আবেদন পেয়ে ডিসি আমাদের এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু তিন মাস পার হতে চললেও কোনো উদ্যোগ নেন নি তিনি।’
মান্দার সুতিহাট বাজারের কাছে পঞ্চমিতলা এলাকায় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই বসানো হয়েছে গরু-ছাগলের হাট। গত শনিবার ওই হাটে দিয়ে দেখা যায়, সুতিহাটের ইজারাদার মোজাফফর হোসেনের নামে সেখানে গরু-ছাগলের হাসিল আদায় করা হচ্ছে। ওই হাটে প্রতি গরুর কেনার জন্য ক্রেতার কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০ টাকা করে হাসিল আদায় করছে ইজারাদারের লোকজন।
জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যেক হাটে খাজনার তালিকা টানানোর জন্য ইউএনওদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত খাজনার চেয়ে বেশি আদায় করা হলে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপরেও কারও বিরুদ্ধে নির্ধারিত খাজনার অতিরিক্ত টাকা আদায় করার প্রমাণ পেলে তার হাটের ইজারা বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’