অপহরণের অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৭, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আজকের সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের পেট্রোল বোমা মেরে যারা নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, তাদের নির্দয়-আদর্শহীন রাজনীতিক কর্মকা-কে মেলানো যায়? যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে, সম্প্রীতি আর সৌভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী নয়, শ্রদ্ধা করে না বাঙালির ভাষা-শিল্প ও সংস্কৃতিকে, তারা কেউ কি কখনো কোনো দেশের কবি-শিল্পী আর বুদ্ধিজীবীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে সম্মান লাভের প্রত্যাশা করতে পারে? বিএনপি-জামাত স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক জোট জনগণের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়ে যখন দেশময় বোমাবাজি করে অগণিত নিরীহ মানুষকে খুন-জখম করতে শুরু করে, তখন দেশর গণতান্ত্রিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাদের সন্ত্রাসী, বোমাবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। রাজপথে দেশবাসী তাদের প্রতিরোধে সমর্থ হয়। ১৪ দলীয় সরকারও তাদের মানবতাবিরোধী দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে সাফল্য অর্জন করে এবং জনগণকে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হয়। এই সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত কার্যক্রমকে সমর্থন জানিয়ে ফরহাদ মাজার নামে এক লেখক-সাম্প্রায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির পরামর্শক বলেছিলেন, ‘একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারাও বোমা মেরেছে, তাহলে তারাও সন্ত্রাসী’। এই চিন্তার একজন ব্যক্তি লেখালেখি করতে পারেন তার মতো করে, কিন্তু তিনি বাঙালি ও বাংলাদেশের চেতনায় বিশ্বাসী কেউ নন, এ কথা জোর দিয়ে উচ্চারণ করা যায়। দেশবাসী তা-ই বলছে। ফেসবুকেও এ ধরনের মন্তব্য সুলভ, যেদিন স্বেচ্ছায় অপহৃত হন।
দেশ বিভাগের আগে অনেক লেখক-কবি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পাকিস্তানের জয়গান গেয়ে সাহিত্য রচনা করে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তারা অনেকেই সেই জিন্নাহ্ আর পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাঙালির আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি পর তো তাঁদের অনেকে সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, সঙ্গীত রচনা করেছেন, ছবি এঁকেছেন। তখন তাঁরা জাতীয়তাবোধের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম। তাঁরা জানেন, মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চা ব্যতিত মানুষের স্বাধীনতা, মানসিক শক্তি অর্জন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় আত্মপরিচয়ের সোপান গড়া। কারো কিংবা কোনো দলের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করা আর জাতির গর্বিত অর্জনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেই অর্জনের গরীমাকে ভূ-লুণ্ঠিত, তাকে নিয়ে কট্যুক্তি করা করা দুটো স্বতন্ত্র বিষয়। ফরহাদ মাজার, … হচ্ছেন সেই লেখক-বুদ্ধিজীবী প্রজাতির সদস্য যারা একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি হত্যাকারী এবং সাড়ে চার লক্ষ মা-বোনের সম্মান-সম্ভ্রমতা লুণ্ঠনকারী তাদের সমর্থনের বুদ্ধি অনুশীলনে পারদর্শী। না হলে তারা কী করে যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক দল জামাত ও হেফাজতের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাদের দরবারে সাহিত্য প্রতিভার প্রচার করেন? অলিখিতভাবে তাদের উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করেন? মাতৃভূমি থেকে হানাদার বাহিনীকে নির্মূল ও পরাস্ত করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বোমা মারার সঙ্গে কোন্ বিবেচনায় খালেদা-নিজামীর বোমাবাজদের তুলনা করে আত্মতুষ্টি নিয়ে তাদের অপরাধ আড়াল করতে উদ্যত হন? এই কি একজন বুদ্ধিজীবী আর কবির চিন্তা-দর্শন? তাকে কবি কিংবা বুদ্ধিজীবী মানতে তাই অনেকেই অপারগ। আর একেই বলে ‘জ্ঞান পাপী’। তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার লক্ষ্য নিয়ে নিজেরাই অপহৃত হন, শেষ রক্ষা করতে না পেরে নিজেরাই আবার আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে আদালতে বলেন উল্টো কথা। বলেন, ‘সরকারকে বিব্রত করতেই কোনো স্বার্থান্বেষী মহল তাকে অপহরণ করেছিলো’। ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’ বলে প্রবাদ প্রচলিত আছে। ফরহাদ মাজারের সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়াটাও তাই সন্দেহজনক আচরণ। আত্মরক্ষার অপকৌশল।
ভোর পাঁচটায় কোনো এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন পেয়ে তিনি ব্যাগে জামা-কাপড় এবং টাকা নিয়ে ওষুধ কেনার জন্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে হারিয়ে যান। সচরাচর তিনি যে সেল ফোন ব্যবহার করেন, সেটা না নিয়ে অন্য একটি ফোন পকেটে তুলে তিনি হারিয়ে যান এবং সেটা থেকে ফোনও করেন। এ ভাবে বিএনপি’র একাধিক নেতা হারিয়ে গেলে তারা আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে হরতাল পর্যন্ত আহ্বান করেছিলেন। সে হরতাল জনসমর্থন পায়নি। তবে জনমনে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে কিছুটা সাফল্য পায়। অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের এ ভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল শুভচিন্তার ফলশ্রুতি নয়। অপহৃত সেই নেতারা যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অস্তিত্ব জানান দেন, তখনই প্রমাণিত হয়, তারা অপরাধপ্রবণ। ভারতের পুলিশ তাদের ভিসা ব্যতিত ভারতে আগমনের বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ করেছেন আদালতে। তারা সেখানেই কারাগারে আছেন। কেউ পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আওয়ামী লীগ অপহরণ করলে তো ওই নেতাদের হত্যা করতে পারতো। বরং আওয়ামী লীগের কাঁধে অভিযোগ চাপিয়ে জনমত সংগ্রহই তাদের পরিকল্পনা ছিলো। ফরহাদ মাজারের ক্ষেত্রে সেটা অনেকটাই স্পষ্ট। এ পর্যন্ত যে সব তথ্য সংবাদপত্রে পরিবেশিত হয়েছে, তাতে দেখা যায়, ফরহাদ মাজার পুলিশের কোনো প্রশ্নের সদুত্তোর দিতে পারেননি। এমন কি যেদিন তিনি অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন পেয়ে ওষুধ কিনতে বের হন, সেদিন সে সময়ের পূর্বে কেউ তাকে ফোনই করেনি। ফোন ট্র্যাক করে পুলিশ এ সব তথ্য জানিয়েছে, যা সংবাদ মাধ্যমে প্রচারও করা হয়েছে। কারো ফোন পেয়ে কেউ ওষুধ কিনতে যায় না। নিজের প্রয়োজনেই যায়। অসুস্থ হলে ফোনের অপেক্ষা কেউ করে না। ওষুধ কিনতে গেলে কেউ সঙ্গে জামা-কাপড়, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা নেয় না। এ সবই পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে গিয়ে তিনি যখন বুঝতে পারেন ফেঁসে যাচ্ছেন, তখনই আরেক নাটক সাজান। বাসে কোনো অপহরণকারী কাউকে অপহরণ করে স্থানান্তরে যাতায়াত করে না। পুলিশ তাকে বাস থেকে উদ্ধার করেছে। সে নাটকেও তিনি ধরা খান। তারপর আদালতে ১০ হাজার টাকার মুচলেখা দিয়ে নিজের জিম্মায় তিনি ছাড়া পান। এ ভাবে জনমত সংগ্রহও হয় না, ভোটেও জেতা যায় না।
আমেরিকার এক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ’ দাবি করেছে, ২০১৬ সালে ৯০জন গুমের শিকার এবং ২০১৭ সালের ৫ মাসে ৪৮ জন নিখোঁজ। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, এ সবই নির্ভেজাল মিথ্যেচারিতা। ২০১১ সালে হেফাজতিদের পুলিশ যখন মতিঝিল থেকে তুলে দেয়, তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এ দেশের একটি সংস্থা, সেই সঙ্গে টিআইবি এবং এই মানবাধিকার সংস্থাটি ৩১ জনকে হত্যার অভিযোগ তুলেছিলো। নিহতের তালিকাও তারা দিয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সব মিথ্যে। যাদের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো, তারা দিব্বি জীবিত এবং নিজ কর্মক্ষেত্রে অস্তিত্বশীল। এই সংস্থা জামাত-বিএনপি’র সুরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার দাবিও তুলেছিলো। তারা কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো ফ্যাসিস্ট ও নাজির বিচারের বিরুদ্ধে এ প্রশ্ন তোলেনি। রডনি কিং নামে এক কালো মানুষকে যখন নিউইয়র্কর (?) রাজপথে পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করে কিংবা সন্ত্রাসী কায়দায় সেখানে ইশ্কুলে নিরাপরাধ শিশুদের গুলি করে হত্যা করে, তখনও এই সংস্থা কোনো প্রশ্ন তোলে না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এতো ঘটনা ইউরোপ-আমেরিকায় প্রতিদিন ঘটছে, তখনও প্রশ্ন কাউকে অভিযুক্ত করে না। অপরাধীর বিচার দাবি করে নিন্দা-ক্ষোভও জানায় না। বাংলাদেশে ২০০১-এ  নির্বাচন পর যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে জামাত-বিএনপি’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা, তখন তাদের সে নিয়ে কোনো গবেষণাপত্র দেখা যায়নি। যখনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়, তখনই এদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। এ সবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেমন ফরহাদ মাজারের অপহৃতের ঘটনা, অবিকল। এই ঘটনার সত্যাসত্য দেশবাসী জানতে চায়। সত্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃত ঘটনা দেশবাসীকে অনতিবিলম্বে জানানো হোক। তাকে কোনো দলের সন্ত্রাসী যদি অপহরণ করে, তাদেরও ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। নতুবা এ ধরনের নাটক প্রতিদিন প্রযোজিত হবে। দেশি-বিদেশি অপরাধী চক্র ওঁৎ পেতে আছে। গার্মেন্টসে বয়লার বিস্ফারিত হয়ে শ্রমিক নিহত হওয়া পর মালিক পক্ষ নিজেদের নির্দোষী প্রমাণ করতে নিহত শ্রমিকের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে। এখানে কারা প্রকৃত অপরাধী, সেটাও সরকারকেই অনুসন্ধান করে বের করতে হবে। এ ভাবে ষড়যন্ত্রকারীদের নৈরাজ্য চলতে দেয়া যায় না। দেশের উন্নয়ন, কল্যাণ এতে ব্যহত হয়। দেশবাসীর একান্ত দাবি, ফরহাদ মাজারের অপহরণের ঘটনাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। দেশবাসী সেই সত্য জানার অপেক্ষায় আছে। শুধু কথার কথা নয়, বাক্য ব্যয় নয়, কাজ করে অভিযোগকারীদের জবাব দিতে হবে। সরকারের জবাবদিহিতা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। আশা করি, সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক হবেন।